
চমকপ্রদ সব বিষয় ছড়িয়ে আছে মহেন্দ্রনাথ দত্তের ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা’ বইয়ের পাতায় পাতায়…
কলকাতা নিয়ে চোখে দেখা এবং শোনা কথা, সংকলন করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের অনুজ মহেন্দ্রনাথ দত্ত। বইয়ের নাম, ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা’ (প্রকাশক-লোকসেবা শিবির, www.loksevashibir.org)। সে বই শুরু হচ্ছে এই ভাবে- ‘কলিকাতা শহর এখনকার হিসাবে দুই আনা বা ছয় পয়সার শহর ছিল।’ অর্থাৎ তিনি যে সময় লিখছেন তার থেকে তাঁর বইয়ের পুরোনো কলকাতা ছিল আট ভাগ (১৬ আনায় এক টাকা ধরলে) ছোটো। কেমন ছিল সেই কলকাতা? মহেন্দ্র দত্ত তাঁর বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদে লিখছেন- ‘দিনে শকুনির উৎপাত, রাত্রে শেয়ালের উৎপাত। হাতিবাগান অরণ্য বীজবন ছিল। লোকজনের বাস ছিল না। প্রকাণ্ড মাঠ, মাঝে মাঝে ঝোপ, ডোবা, ও কাঁটানটের ঝাড়….রাস্তায় একলা গেলে জিনিসপত্র কাড়িয়া লইত। গ্রে স্ট্রিট বাহির হইবার পর সে মাঠটি টুকরা টুকরা করিয়া বিক্রয় হয় এবং লোকে খণ্ড খণ্ড করিয়া জমি খরিদ করিয়া বসতি করিতে লাগিল’।
মহেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৬৮- ১৯৫৬), ১৮৯৬ সালে ইংল্যান্ডে আইন পড়তে যান। কিন্তু আইন তিনি সেখানে পড়েননি। সেখানে তিনি ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, স্থাপত্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে লেখা-পড়া করে, বহু দেশ বিদেশ (অনেক সময়ে পায়ে হেঁটে) ঘুরে ১৯০২ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন। তিনি ৯০টি বই লিখেছিলেন বিভিন্ন বিষয়ে। তাঁকে নিয়ে খুব একটা কাজ বা চর্চা এখনও হয়নি।
পুরাতন কলকাতার শীতকাল নিয়ে মহেন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘সর্বত্র পুকুর, কানাচ ও বাগান থাকায় হাওয়া জোরে আসিত এবং ঠন্ডা বড় বেশি হইত। গোলপাতা বা খোলার ঘর- এই ছিল সাধারণের গৃহ। কোঠাবাড়ি তখন অল্প লোকের ছিল।…সেই জন্য শীত বেশি বলিয়া বোধ হইত। পাড়ার বৃদ্ধ মধু মুখুজ্জ্যের নিকট শুনিতাম যে হুগলিতে গুঁড়ি গুঁড়ি বরফ পড়িত’।
তখনও বাড়িতে চটি পরার চল হয়নি। ‘…বড় হইলে ঠনঠনের চটি পায়ে দিয়াছি।…ছোট চটি ছয় আনা বড় চটি দশ আনা মাত্র ছিল। নিমন্ত্রণ খাইবার সময়ে জামা ছিল চিনের কোট। অর্থাৎ বুকটি লম্বা চেরা, তাহাতে গোল গোল হাড়ের বোতাম কাপড় দিয়ে মোরা। কলিকাতার হাড়কাটা গলিতে এই বোতাম তৈরি হইত, এই জন্য স্থানটির নামও তাহাই হইয়াছিল’।
কলকাতায় এখন কুকুর, বিড়াল দেখা যায়। মহেন্দ্র দত্তের কথায়, ‘…মানিকতলায় তখন সব বাগান ছিল। বড়ো বড়ো গাছ থাকায় অনেক বাঁদর থাকিত এবং হনুমানও কিছু কিছু থাকিত। …..আমাদের ঠাকুর দালানে অনেক বাদুর ঝুলিত এবং কিচমিচ করিয়া সব সময়ে আওয়াজ করিত’।
পুরোনো কলকাতার লোক নাকি সব বড় বড় ছিল! মহেন্দ্র দত্তের কথায়, ‘তখনকার লোকের শরীরের আয়তন এখনকার লোক হইতে অনেক বড় ছিল। এখন মাঝে মাঝে সেই আয়তনের লোক দেখিতে পাওয়া যায়- খুব লম্বা-চওড়া, হাত লম্বা লম্বা, বলিষ্ঠ ও বুক চাটালো। আমাদের পিতা মহোদয়ের আয়তন হিসাবে নরেন্দ্রনাথ খর্বাকৃতি ছিল, এই জন্য ন’ঠাকুরদাদা গোপাল দত্ত আদর করিয়া নরেন্দ্রনাথকে ‘বেঁটে হালা’ বলিয়া ডাকিতেন’।
বরফ এবং আপেলের কলকাতা আগমন। ‘কলিকাতার লালদিঘির ধারে বরফের গুদাম ছিল। কানাডা হইতে মাল লইবার জন্য খালি জাহাজ আসিত। সেই জাহাজে ভারসাম্য রাখিবার জন্য চাপ চাপ বরফ আসিত। …ছোটকাকা কাছারি হইতে আসিবার সময়ে কখনও কখনও ঘোড়ার কম্বলে মুড়িয়া বরফ আনিতেন, সেই বরফ করাতের গুড়া দিয়া রাখিতে হইত। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। যাহারা গোঁড়া হিন্দু তাহারা খাইত না। আমাদের বাটিতে বিধবারা খাইত না। আমরা লুকাইয়া লুকাইয়া একটু আতটু খাইতাম। তাই জাতটি অত শীঘ্র যায় নাই। লোকের মুখে শোনা গেল আপেল বলিয়া একটি জিনিস আছে। তাহা সাহেবরা খায়, তাই ওদের অত বুদ্ধি, কিন্তু বহু দিন তাহার দর্শন পাই নাই। অবশেষে শোনা গেল যে বরফের ভিতরে করিয়া এক রকম ফল আসে, টাকায় তিনটি বা চারটি। একবার এক টাকায় চারটি আপেল আনিয়া আমরা সব ভাই-বোনে একটু একটু করিয়া মুখে দিলাম। পাতলা পাতলা এক চাকা করিয়া ভাগে পড়িল। কিন্তু ইহার বিশেষত্ব কী, কিছুই বুঝিতে পারিলাম না’।
বই থেকে আরও যা যা মহা মূল্যবান কথা বার্তা জানে গেল তা এরকম। তখন বাড়ির চাকরদের গোঁফ রাখতে দেওয়া হত না। বাড়ির চাকর গোঁফ নাচিয়ে কথা বলবে তা অপমানজনক মনে করা হত। তখন পাতকুয়ায় ভূত থাকত। কিন্তু সেটা আসলে গল্প। পাত কুয়ার কাছে ছোটোরা যাতে না যায়, তাই এই কথা বলা হত। বাড়িতে আসত শকুনের ঠোঁটের মুখোশ পরা বাঁশবাজিওয়ালারা। পয়সা চাইত। পয়সা না দিলে শকুনের ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে দিত। তিনি দেশ ভ্রমণে গিয়ে বুলগেরিয়া, সারবিয়া এবং রুমানিয়ায় এইধরনের বাঁশবাজি দেখেছেন। তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক ধরনের লোক আসত। তাদের বলা হত ‘ভাট’। ভাট এসে বিভিন্ন বংশের প্রশংসা করত। আর যদি ঠিক ঠাক দক্ষিণা না পেত তখন বানিয়ে বানিয়ে আজে বাজে কথা বলে নিন্দা করত। তাই ভাটদের লোকে এড়িয়ে চলত। হয়তো আমাদের সময়ে ‘ভাট বকা’ কথাটা ওখান থেকেই এসেছে।
এমনই সব চমকপ্রদ বিষয় ছড়িয়ে আছে ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা’ বইয়ের পাতায় পাতায়। বইটির রচনাকাল ১৯২৯। প্রথম প্রকাশ ১৯৭৩।
