নবাবি কায়দায় ‘মহাভারত’ আঁকা হয়েছিল মুর্শিদাবাদে

রাজকীয় নবাবি সমারোহে জলরঙে লেখা হচ্ছে নতুন যুগের মহাভারত

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর অনেক কিছুকেই গিলে ফেলেছিল, বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতি, বাংলার নবাব, বাংলার সবচেয়ে জমকালো শহর মুর্শিদাবাদ, এমনকি ছবি আঁকার একটি বিশেষ শৈলীকেও বেমালুম হজম করে ফেলেছিল এই দুর্ভিক্ষ। এর আগে মুর্শিদাবাদ ছিল রঙের শহর, প্রাসাদ থেকে প্রাসাদে রঙিন স্বপ্ন উপচে পড়ত। সেই উপচে পড়া রঙের খানিকটাতেই খানদানি ছবি আঁকিয়েরা তুলি বুলিয়ে নিতেন, আর আঁচড় কাটতেন হাতে বানানো কাগজের ওপর। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সিরাজউদ্দৌলা, মিরজাফর থেকে মিরকাসিম – বাংলায় নবাবির সাথে কাঁধ ঘষাঘষি করে চলেছে রাজকীয় ছবির সমারোহ। তারপর বাংলায় যখন শুরু হল সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন, ছবির নবাবি রীতিও পালটে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে কোম্পানি রীতি। এইসব ছবিদের ইতিহাসে ডুব দিলে উঠে আসছে বাঙলার ভাঙা গড়া – বিশাল অথচ বিপন্ন মধ্যযুগ মাথা নত করছে পশ্চিমের আধুনিক বেয়নেটের তলায় – জলরঙে লেখা হচ্ছে নতুন যুগের মহাভারত।

মুঘল দরবার ছিল একটা সময় ছবি আঁকিয়েদের স্বর্গরাজ্য। সম্রাট হুমায়ুন পারস্যের জৌলুসে মুগ্ধ হয়ে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের জমায়েত করা শুরু করেন দিল্লিতে, তারপর আকবরের আমলে সে তো জমে মৌচাক। সেলিম মসনদে বসলে তো মধুতে রীতিমতো ভেসে যাচ্ছে দিল্লি আর আগ্রা। এই সম্রাটের আবার ছবির দিকেই বেশি আগ্রহ, প্রাসাদ তৈরিতে অতটা নয়। তাঁর ছেলে ওদিকে বাবার ঠিক উলটো। শাহজাহান বেশি অর্থ খরচ করেন পাথরের পর পাথর তুলে বিশাল বিশাল সৌধ বানানোর কাজে। তবুও মুঘল ছবি তখনও রমরমিয়ে চলছে, অন্তত তিনি যতদিন বেঁচেছিলেন। ঔরঙ্গজেবের শিল্প-নান্দনিকতায় কোনো আগ্রহ ছিল না, তাঁর অভিজাতদের বড়ো অংশ তখন অবশ্য শিল্পীদের খাতিরযত্ন করতেন। আর তারপরে তো মুঘল সাম্রাজ্যই ভেঙে যেতে শুরু করল, তখন দিল্লি-আগ্রাতে রসের মৌচাকে যে ঢিল পড়বে না তা কী করে হয়। মৌমাছিরা তখন ছড়িয়ে পড়ছেন দেশের আলাদা আলাদা কোণে।

মুর্শিদাবাদ ততদিনে বেশ জমে উঠেছে। এখানে দিল্লি-আগ্রা থেকেও শিল্পীদের কেউ কেউ আসর জমাচ্ছেন এসে, বাংলাতেই আরম্ভ করছেন রসের নতুন ধারাপাত। মুঘল রীতি মেনেই ছবি আঁকা শুরু হচ্ছে মুর্শিদাবাদের প্রাসাদে। আমরা দেখতে পাচ্ছি তুলির আঘাতে ফুটে উঠছে ভাগীরথীর তীরে মুর্শিদকুলি খাঁ-র দরবার। এই ছবির সাথে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে ক্লাইভের অ্যালবামে এখনও জ্বলজ্বল করছে মুর্শিদকুলির মুহররম উদ্‌যাপন আর খাজা খিজির উৎসব। দরবারি শিল্পীরা একদিকে রঙিন নকশায় বর্ণাঢ্য করে সাজাচ্ছেন গোটা উৎসবকে, তারই সাথে পরবর্তী সময়ের জন্য গোটা আয়োজনকে ধরে রাখছেন কাগজের মিনিয়েচারে।

মুর্শিদকুলি মারা যাচ্ছেন, আলিবর্দি যতদিন না মসনদে বসবেন ততদিন বাংলার রাজনীতি টালমাটাল। মুর্শিদাবাদে ছবির অবস্থাও তথৈবচ। আলিবর্দি এসে বাংলার হাল ধরছেন, একদিকে বর্গিদের আটকাচ্ছেন, অন্যদিকে সামলাচ্ছেন ব্রিটিশ আর ফরাসিদের। ছবি আঁকিয়রাও রঙ-তুলিতে নতুন করে শান দিচ্ছেন, নবাবকে নিয়েই আঁকা হচ্ছে অনেকগুলো ছবি। ইন্ডিয়া হাউসেই পাওয়া যাচ্ছে নবাবের হরিণ শিকারের মিনিয়েচার, বিপুলা প্রকৃতির মাঝখানে সঙ্গীদের নিয়ে বলিষ্ঠ নবাব, রাজকীয় গরিমা ছড়িয়ে পড়ছে আঁকিবুকির ভাঁজে ভাঁজে। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে নবাব বসে আছেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন নিয়ে, তাঁর উল্টোদিকে মুখোমুখি বসে নাতি সিরাজউদ্দৌলা।

এদিকে তখন আরেকধরনের মৌমাছির উপদ্রব বাড়ছে নবাবি বাঙলায়। আলিবর্দি ব্রিটিশ বণিকদের ওই নামেই ডাকতেন। এরা কিন্তু হুল ফোটাতেই বেশি আগ্রহী, রসের সমারোহে এরা তখনও ব্রাত্য। আলিবর্দির পর নবাব হয়ে যতদিন সিরাজ এদের হুলকে সামলে রাখতে পেরেছেন, ততদিনে আঁকা চলেছে মুর্শিদাবাদ রীতির সবথেকে সেরা ছবিগুলো। ইতিমধ্যে রাজস্থানি শৈলী এসেও নবাবি দরবারে মিশেছে। এই সময়ে আমরা দেখব ‘রাগমালা’ ছবি একের পর এক আঁকা চলছে। দেখব আগের ছবিগুলোর জ্যামিতিক শৃঙ্খলা ভেঙে যাচ্ছে, ছবি হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি অগোছালো। &দীপক, গুজরী, হিন্দোল,– গান থেকে উঠে আসছে ছবিতে। অনেক ছবিতে তরুণ নবাবকেও দেখা যাচ্ছে নায়কের বেশে। সভাসদ আর জমিদারদের জন্য ছবি আঁকছেন শিল্পীরা।

মৌমাছিরা শেষমেশ হুল ফোটালো পলাশীতে, তার পরের কথা সবারই জানা। পুতুল নবাব হচ্ছেন মিরজাফর, তাঁকে সরিয়ে কোম্পানি আনছে মিরকাশিমকে। এরপর বক্সারের যুদ্ধ, আবার মিরজাফর এবং দ্বৈত শাসন। এঁদের সময়েও দরবারি শিল্পীরা ছবি আঁকছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে জৌলুস অনেক কমে গিয়েছে। আমরা পাচ্ছি মিরজাফরের সাথে তাঁর ছেলে মিরনের ছবি, পাচ্ছি মিরকাশিমের দরবার – সবক’টা ছবিতেই ভাবের দৈন্য স্পষ্ট। নতুন উদ্ভাবনের বদলে প্রাক্‌-সিরাজদৌল্লা যুগের রীতি অনুকরণ করা হতে থাকে এই পর্যায়ে। কিন্তু আগেকার সূক্ষ্ম কারুকার্যগুলো আর ফিরে আসে না।

দ্বৈত শাসনের পর আসে মন্বন্তর, তখন থেকেই মুর্শিদাবাদ শহরের জৌলুস অস্তগামী। নতুন শাসকের প্রধান ঘাঁটি কলকাতা, বাঙলার হোমড়াচোমড়া মানুষেরা তখন থেকেই ধীরে ধীরে কলকাতামুখী। মুর্শিদাবাদের শিল্পীরা কেউ কেউ ব্রিটিশদের জন্য ছবি আঁকছেন, কেউ যাচ্ছেন লখনৌ, কেউ বা ছোটোখাটো জমিদারদের আশ্রয়ে। এরপর কলকাতাতেই শুরু হবে শিল্প-সাহিত্যের মহোৎসব – সে এখনও অনেক বাকি। সে আরেকটা নতুন যুগ, আরেকটা নতুন শতাব্দী, আরেকটা নতুন স্বপ্ন।

Developed by DXDasia