পি সি সরকার জুনিয়র : বিশ্বমঞ্চে একাই ভারতীয় জাদুবিদ্যার জয়পতাকা উড়িয়েছেন

ভারতীয় জাদুবিদ্যার কিংবদন্তি

খন জাদুসম্রাট পি সি সরকার (প্রতুল চন্দ্র সরকার)-কে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে হইচই। ভারতীয় ইন্দ্রজাল প্রদর্শনীর ঐতিহ্যকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরেছেন পৃথিবীর ১১৭টি দেশের মানুষের কাছে গিয়ে। যা এক বিরল ভারতীয় মঞ্চশিল্পীর দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালে জাপানের আশাহিকাওয়া শহরে ছিল তাঁর শেষতম ম্যাজিক-প্রদর্শনী। শো শেষ হলেই হঠাৎ দেহত্যাগ করেন সিনিয়র পি সি সরকার। সে সময় জাপানে তাঁর ৬৫টা ইন্দ্রজাল শোয়ের বায়না ছিল, কিন্তু তিনি মাত্র ৫টা শো করতে পেরেছিলেন। দ্রুত জাপানে পৌঁছান প্রদীপ চন্দ্র সরকার। সে সময়ে তিনিই ‘পি সি সরকার জুনিয়র’ নাম নিয়ে জাপানের মঞ্চে বাকি থাকা ৬০টি শো সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে বাবার সহযোগী হয়ে প্রথম জাপান সফরে গিয়েছিলেন। তখন কী আর জানতেন, কয়েক বছরের মধ্যেই এই গুরুদায়িত্ব তাঁকে নিতে হবে! ১৯৭২ সালে বিয়ের পর টানা পাঁচ মাস জাপানেই ছিলেন, সেখান থেকেই চলে যান সাউথ কোরিয়া, হংকং এবং সিঙ্গাপুর। প্রায় অর্ধশতবার জাপান যাত্রার বেশিরভাগ সময় ইন্দ্রজাল প্রদর্শনীর জন্যই সময় দিয়েছেন, ১৯৯৪ সালে শেষবার জাপানে শো করেন।

ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামে শো শেষ করে রাতে শহরের রাস্তায় নিজেই পোস্টার মারার সময়ে আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। তেত্রিশ পাউণ্ড জরিমানাও দিয়েছিলেন। তারপরও থার্সটনের দুটো শো-ই হাউসফুল হয়েছিল।

জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র, তাঁর ‘ইন্দ্রজাল’ প্রদর্শনী নিয়ে ঘুরেছেন পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। একজন ভারতীয় শিল্পীর এমন বিশ্বভ্রমণের নজির দুর্লভ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জুলাই পূর্ববঙ্গের টাঙ্গাইলের আশকপুর গ্রামে জন্ম। শৈশবেই কলকাতায় চলে এসে সেখানেই বড়ো হওয়া। ১৯৬১ সালে শিলিগুড়ি রেলওয়ে ইন্সটিটিউট হলে বন্ধু শিবকুমার গুহকে সঙ্গে নিয়ে বড়ো মঞ্চে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী শুরু। জাদুসম্রাট পি সি সরকারের মধ্যমপুত্র হয়েও, বাবার কাছে হাতে কলমে কখনই তাঁর ম্যাজিক শেখা হয়নি। কিন্তু তিনি সব ম্যাজিক শিখেছেন তাঁর বাবার কাছেই, লুকিয়ে। 

১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ইংল্যান্ড যাত্রা করেন, সেসময় ওখানে প্রবল ভারত বিরোধিতা চলছিল। সাংবাদিক সম্মেলনেই ম্যাজিক দেখানো ও লন্ডনের রাস্তায় চোখবেঁধে সাইকেল চালিয়ে চমকে দিয়েছিলেন দুনিয়াকে। পৃথিবীর সেরা শো হয় লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডের রয়্যালটি থিয়েটারে।  চলেছিল টানা একমাস। পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র এই দুই বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় শিল্পীই কেবলমাত্র এখানে তাঁদের মঞ্চ মাতিয়েছিলেন। নটিংহ্যাম, লিভারপুল, প্রেসটন, সাউথপোর্ট, বামিংহোম, নটিংহ্যামশায়ারে সব হাউসফুল শো করে গিয়েছিলেন হল্যান্ড, বেলজিয়াম, পশ্চিম জার্মানি, স্পেনে। লিভারপুল, নটিংহ্যামে শোয়ের সময় নটিংহ্যাম চিলড্রেন্স হসপিটাল ও রয়্যাল লিভারপুল চিলড্রেন হসপিটালে বাচ্চাদের বিশেষভাবে মনোরঞ্জন করেন। আবার লন্ডনে মানসিক অবসাদগ্রস্ত মানুষদের জন্য একাধিক বিনামূল্যেও শো করেছেন। লন্ডন বিবিসি চ্যানেলে তাঁর ম্যাজিক শো রেকর্ড করে সম্প্রচারিত হয়েছে। ওদেশের বিখ্যাত মিউজিক কম্পোজার উইলিয়াম কোনার, তাঁর শো দেখে গান বেঁধেছিলেন- “সোরকার দ্য লিভিং লেজেন্ড…”। 
( https://soundcloud.com/beachfreaksrecords/beachfreaksrecords-store-preview-sorcar-the-living-legend-45-by-magician-sorcar-junior )

এই ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামে শো শেষ করে রাতে শহরের রাস্তায় নিজেই পোস্টার মারার সময়ে আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। তেত্রিশ পাউণ্ড জরিমানাও দিয়েছিলেন। তারপরও থার্সটনের দুটো শো-ই হাউসফুল হয়েছিল। 

১৯৭৫ সালে জার্মানির হ্যাসেল্ট শহরে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনে যান। ১৯৭৬ সালে স্পেনে গিয়ে দিনের পর দিন হাউসফুল ইন্দ্রজাল শো করেছেন। এই স্পেনেই ‘ডন আরটুরিও কার্টসিয়া’-তে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনীর জন্য ১৬ শিটের পোস্টার বানানো হয়েছিল, টাঙ্গাইল শাড়ি দিয়ে। রাস্তায় বেরোলেই স্পেনের জনগণ বলতেন “ওয়াটার অফ ইণ্ডিয়া কখনো ফুরায় না…”। তাঁর ১৫০ রজনী অগ্রিম বুকও হয়েছিল। এদেশে বিশালাকার মঞ্চে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনীর জন্য ইংল্যান্ড থেকে অতিরিক্ত শিল্পী ভাড়া করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদেশের সরকার তাঁকে ‘অস্কার অফ স্পেন’ সম্মানে সম্মানিত করেন। এখানেই উদ্যোক্তারা তাঁকে সিংহছানা উপহার দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। প্যারিসের ভান শহরে পি সি সরকার জুনিয়রকে জনসম্বর্ধনায় ভরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরব আমিরশাহীতে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনের জন্য গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোন প্রেক্ষাগৃহ ছিলনা তাই আরবের ধনকুবের উদ্যোক্তারা খেলার স্টেডিয়ামকেই মঞ্চে রূপান্তর করেন শুধু তাঁর শোয়ের জন্য। আমেরিকার ম্যানহার্টন সেন্টার, ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন, শিকাগোর রয়্যাল থিয়েটার, কলম্বাস, ফিনিক্স, সানহোসে, নিউইয়র্ক এসব শহরেই হয়েছে ইন্দ্রজাল শো। সেদেশের লসএঞ্জেলসে ‘ইন্টারন্যাশানাল ব্রাদারহুড অফ ম্যাজিশিয়ান’ এবং ‘ইন্টারন্যাশানাল ম্যাজিশিয়ান সোসাইটি’ ও শিকাগো শহরে ‘বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার শিকাগো’-র পক্ষ থেকে পেয়েছেন বিশেষ সম্মান। 

এদেশে বিশালাকার মঞ্চে ইন্দ্রজাল প্রদর্শনীর জন্য ইংল্যান্ড থেকে অতিরিক্ত শিল্পী ভাড়া করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে দেশের সরকার তাঁকে ‘অস্কার অফ স্পেন’ সম্মানে সম্মানিত করেন। এখানেই উদ্যোক্তারা তাঁকে সিংহছানা উপহার দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন।

১৯৭৪ সাল নাগাদ তিনি প্রথম মুম্বাই থেকে জাহাজে মোম্বাসা পৌঁছে, আফ্রিকাতে শোয়ের যাবতীয় রূপরেখা স্থির করেন। সেখানে স্থানীয় এজেন্ট ছিলেন কামাল সাভাস্কি। এখানে প্রথম নাইরোবি সিটিহলে শো হয়। রাত তিনটে নাগাদ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় পোস্টার মারতে যেতেন প্রদীপ সরকার নিজেই। প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের বুকিং নিয়ে শো শুরু করলেও, জনগণের দাবীতে আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছিল। এসময়ে কেনিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াট্টার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিল তাঁর। মোম্বাসা, কিসুমু, নাকুরু, এলডোরেট এসব শহরে সর্বত্র হাউসফুল শো করেন। কেনিয়ার পর তানজানিয়া, জাম্বিয়া এসব জায়গায় দারুণ শো করেছিলেন। তানাজানিয়ার দার-এস-সালাম, টাঙ্গা, মোশি, আরুশাহ, আইরিঙ্গা প্রভৃতি শহরে সফলভাবে তিনি শো করেন। জাম্বিয়া দেশের ইভ্লিন হন অডিটোরিয়ামে তিনি ইন্দ্রজাল প্রদর্শন শুরু করেন। সেদেশে তিনিই প্রথম কোন জাদুকর, যিনি মঞ্চে জাদু প্রদর্শন করেছেন। এই দেশের লুসাকা, এণ্ডোলা, মুফুলিরা, চিঙ্গোলা, লুয়ান্সায়া, কিটুই, কাবুই, লিভিংস্টোন এসব শহরে দিনের পর দিন ম্যাজিক দেখিয়েছেন। আফ্রিকায় অর্থ উপার্জন করে, সেখানেই দুটো মাইক্রোবাস, একটা বিশাল ট্রাক ও একটা ভোক্সওয়াগান ভ্যান কিনেছিলেন আর এজেন্ট কামালের কাছে ভারতীয় মুদ্রায় সাত লক্ষ টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন। আফ্রিকার সফরের শেষ পর্যায়ে শো করেছেন জাম্বিয়া আর মোজাম্বিকের মাঝখানের ছোট্ট একটা দেশ মালাভিতে। সেদেশের ব্লাণ্টায়ার শহরেও প্রতিদিন তিনটে শো করেছিলেন। এখানে তাঁর ম্যাজিক দেখানোর জন্য তেমন বিশেষ কোন প্রেক্ষাগৃহ ছিল না, তাই অ্যাপোলো ভিস্তারামা নামের একটি সিনেমা হলকে ভাড়া নিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এখানে তাঁর দেখানো টেলিপ্যাথির খেলা জনপ্রিয় হওয়ায় সেদেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী মোয়ালো এনগুমাও উদ্বিগ্ন হয়ে জাদুকর সরকারকে সজাগ করে দেন যে তাঁদের প্রেসিডেন্ট বান্দা ভীষণ অখুশি, তাঁকে ভারতীয় গুপ্তচর হিসাবে সন্দেহ করা হয়। এসময়ে আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকেও ইন্দ্রজাল প্রদর্শনের ডাক এলেও তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। ওমানে তাঁর ম্যাজিক শো দেখে, ওমানের রাজার ভাই এসে তাঁকে রাজবাড়ির অতিথি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিজি, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়া, ব্রুনেই, ফিলিপিন্স, সাউথ কোরিয়া এসব দেশে একাধিকবার নিজের ম্যাজিক শো প্রদর্শন করেছেন তিনি। প্রতিবেশী দেশ নেপাল, মায়ানমার, বাংলাদেশে ও তাঁর ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী সফল হয়েছে দিনের পর দিন। সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য শো করেছেন জাপানের হামামাৎসু শহরে, ফিলিপিনসের সেবু শহরে।

১৯৮৭ সাল উজবেকিস্থানে বহুদিন ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী করেছেন। এরপরেই মস্কো শহরের লেনিনি স্পোর্টস প্যালেসের প্রতিদিনের শো ছিল হাউসফুল। প্রতিদিন প্রায় আট হাজার মানুষের মনোরঞ্জন করেন তিনি। তাঁর শোতে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার তাঁর জন্য বিশেষ বিমানযাত্রার ব্যবস্থা করেন, যাতে তিনি দ্রুত ও নিরিবিচ্ছিন্ন ভাবে সভিয়েতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজেই পৌঁছে ইন্দ্রজাল প্রদর্শন করতে পারেন। এদেশের আস্কাবাদ শহরে শো দেখার পর পি সি সরকার জুনিয়রকে একটি দীর্ঘকায় আফ্রিকান পাইথন উপহার দেওয়া হয়।

জাপান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, কেনিয়া, ওমান, আরব আমিরশাহী ছাড়াও পৃথিবীর আরও অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্টজনেদের পরমবন্ধু হয়েছিলেন তিনি। নিজের ভুবনমাতানো হাসি, আন্তরিক ব্যাবহার, প্রখর বুদ্ধিমত্তায় সহজেই আপন হয়েছেন অগণিত মানুষের। আজও ভারতীয় জাদুবিদ্যার চর্চা ও উন্নতির জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যায় করে চলেছেন তিনি। নিরলস শিল্প সাধনার জীবন্ত কিংবদন্তী সাধক। আশি ছুঁইয়েও বিরল গুণের বিশ্বপথিক ভারতীয় আজও প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীল কাজেই মগ্ন। এমন জীবন্ত কিংবদন্তি আজও সাধারণ জীবনযাপনে অনন্য সাধারণ শিল্প সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, আর নিজের বয়স নিয়ে আনন্দে মেতে আছেন।
 

Developed by DXDasia