
এমন প্রয়াসে শিক্ষাকেন্দ্রগুলিই বা উদ্যোগী হবে না কেন
‘বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে’ কথাটা এখনও পুরোপুরি কথার কথা হয়নি। তবে, অর্থের তারতম্য ঘটেছে অনেকটাই। তাতেও বিস্ময়ের বা দুঃখের কিছু নেই, কালের ছোঁয়া তো লাগবেই। এখন আর বিদ্বান মানে ‘জ্ঞানী’ বা ‘একজন যিনি প্রভূত বিদ্যা আহরণ করেছেন কঠোর শ্রম করে’ এমন নয়। তেমন অর্থ বাতিল হয়নি, তবে ব্যাখ্যা বিস্তৃত হয়েছে। কাল তথা সময়ের বিচারে কোনও স্থানে(গ্রামস্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত) যে মানুষ কোনভাবে প্রভাব ফেলেন, ছাপ রাখেন তিনিও বিদ্বান। এমন মানুষকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সমাজ ও রাষ্ট্র নানা আয়োজন করে, নানা উপাধিতে ভূষিত করতে চায়। গণ-সম্বর্ধনা থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান সবই হয়। এভাবেই কেউ নোবেল পদক পান; কেউ ভারতরত্ন, কেউ পদ্মশ্রী, কেউ বঙ্গবিভূষণ, কেউ জাতীয় শিক্ষক, কেউ শিক্ষারত্ন ইত্যাদি হ’ন। তাদের সকলকে আমরা চিরকাল মনে রাখি এমন নয়। আবার, এমন সব পুরস্কার বা সম্মানে ভূষিত হননি এমন অনেক মানুষ স্মরণীয়, যথা টলস্টয় বা লালবাহাদুর শাস্ত্রী বা মহাত্মা গান্ধি।
এমন প্রয়াসে শিক্ষাকেন্দ্রগুলিই বা উদ্যোগী হবে না কেন? কোন ছোটবেলায় দেখেছি প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে ছাত্ররা চোখের জলে ভাসছে বা প্রিয় কাছের মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাতে আনন্দে নাচছে। আরও কয়েক কদম এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কাউকে কাউকে ডিলিট, ডিএসসি ইত্যাদি বিশেষ ডিগ্রি দিয়ে সম্মান জানায়।
এমন ডিগ্রি প্রাপকের গৌরব বৃদ্ধি করলেও সে ডিগ্রি তার কোনও কাজে লাগে না। ডিগ্রির কল্যাণে কোনও চাকরি জোটে না, আয়কর কমে না, ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে না, জনপ্রিয়তা বাড়ে কমে না।
এই রাজ্যেরই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডি লিট দিতে চায় বিগ বি কে। প্রতিবাদ কেউ করেছেন বলে শুনিনি। এর আগে অমল পালেকরকে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় এমন সম্মান জানিয়েছে। তখনও প্রতিবাদ হয়নি। কেনই বা হবে? অমিতাভ তাঁর কন্ঠস্বর ও অভিনয়গুণে আমাদের প্রিয়। নিজ ক্ষেত্রে তিনি প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিষ্ঠার কারণ যথার্থ।
আরও পড়ুন
কী পড়ি, কী শিখি
অথচ প্রশ্ন উঠল শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডি লিট দেওয়ায়। কিন্তু কেন? নিশ্চয় দেশে তাঁর চেয়ে বড় মাপের লেখক বা চিত্রকর বা জননায়ক ছিলেন বা আছেন। আমার বা আপনার পছন্দের শীর্ষে থাকতেই পারে অন্য নাম, তাতে কী অমিতাভ বা মমতার গুরুত্ব মুছে যায়? জনচিত্তে বা জনজীবনে তাঁরা যে বিপুল প্রভাব ফেলেছেন তাতো অস্বীকার করা যায় না।
সেদিন আমন্ত্রিত হয়ে বামপন্থীদের এক সভায় হাজির ছিলাম। অনেকে ছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নানা অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জানাতে, প্রতিকার চাইতে শিক্ষকরা মিলিত হয়েছিলেন। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে সত্যিই তো অনিয়ম-অবিচারের ট্রাডিশন চলেছেই। নিয়োগ, বদলি, পরীক্ষা নেওয়া ও তার ফলপ্রকাশ, প্রকাশের পর সে ফল বদলে দেওয়া ইত্যাদি সবেতেই দুর্নীতি, অব্যবস্থা, অস্বচ্ছতা যেন বেড়েই চলেছে। শিক্ষাপ্রাঙ্গণে নানা হাঙ্গামা, কোঁদলের ছায়া। শিক্ষা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক – সকলের স্বার্থে এসবের অবসান হওয়া চাই। কলঙ্কের বোঝা বাড়ছে, বিপর্যয় বুঝি আসন্ন। প্রতিকার চেয়ে শিক্ষকরা দাবি জানাবেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এগোবেন – এটাই তো স্বাভাবিক। তাঁদের উদ্যোগকে সমর্থন জানাতে গিয়েছিলাম। পেলাম – মুখ্যমন্ত্রীর সাম্মানিক ডি লিট প্রাপ্তির সমালোচনা। বোঝা গেল এই রাজ্যের বামেরা এখনও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেনি, তারা সে কাজে আগ্রহীও নয়, তাদের কাছে গুরুত্ব কেবল মসনদের বা ক্ষমতার। মুখ্যমন্ত্রীকে সাম্মানিক ডিগ্রি দিলেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাচার মেনে নেওয়া যায়, বা উল্টোটা? তা হলে কেন ফোকাস বদলে দেওয়া? এতে কি শিক্ষা বা শিক্ষাজগতের কোনও লাভ হতে পারে, নাকি মূল সমস্যাগুলোকে এভাবে চাপা দেয়া যায়? তবু, এপক্ষ বা ওপক্ষ চাপা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কেন? কার স্বার্থে?
