প্রকৃতি পাঠও একপ্রকার পড়া। সে পড়া থেকেও অনেক কিছু শিখি

শেখার নাকি কোনও বয়স নাই। শেখা তো অনেক রকম। দেখে শেখা, ঠেকে শেখা, পড়ে শেখা। যতদিন বাঁচা, ততদিন শেখা। আর পড়া? শেখার আগ্রহ থাকলে পড়ারও কোনও বয়স নাই।

তবু, কী পড়ি, কী শিখি এই নিয়ে ভাবতে বসে দেখি উত্তরটা খুঁজতে আরও একটা প্রশ্ন বিবেচনায় আনতে হয়। তা হল – কেন পড়ি?

পড়া যদি অক্ষর আর সংখ্যা চেনার জন্য হয়, সে একেবারে প্রাথমিক শেখা, নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য শেখা। দলিল দস্তাবেজ থেকে বিজ্ঞাপন পাঠ এসবের জন্য অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজন তো আছেই। তবে, প্রাথমিক শিক্ষা সব প্রয়োজন (যথা রুজি-রোজগারের প্রয়োজন) মেটাতে না পারলে, অনেক ক্ষেত্রেই পারে না, আমরা প্রথাগত মাধ্যমিক শিক্ষা ও আরও উচ্চতর শিক্ষার জন্যও বা কারিগরি শিক্ষার জন্য পড়াশুনা করি।

জীবন ধারণের জন্য রুজি-রোজগারের গুরুত্ব অস্বীকার করে কে? খাদ্য-বস্ত্র- আশ্রয়ের নিশ্চয়তা তো চাইই। কিন্তু মানুষ তো আমরা। তাই, কেবল জীবনধারণ নয়, যাপনের জন্যও আমরা ছটফট করি। তারই জন্য আড্ডা থেকে মেলা, খেলা, ভ্রমণ, বিনোদন এসবই চাই মানব জীবনে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নম্বর সে চাহিদা মেটাতে পারে না। সে যে অন্য ক্ষুধা – মনের ক্ষুধা। সে চাহিদা পূরণে, তাকে তীক্ষ্ণ ও পরিশীলিত করে তুলতে চাই পড়াশুনো।

পড়াশুনোর জন্য চাই অভ্যাস। নিছক অভ্যাসে কেউ কেউ ঠোঙাও পড়েন। খবরের কাগজ পড়াও একটা অভ্যাসের বিষয়। ঠোঙা-খবরের কাগজ থেকে কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ আমাদের টানে মনের ক্ষুধা মেটাতে।

মনের ক্ষুধা মেটাতে যে পড়াশুনো তার তো সিলেবাস নেই, সময়সীমা নেই। এমনকি তার জন্য নেই শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হয়। প্রায় সমস্ত শিক্ষিত মানুষ আদতে স্বশিক্ষিত।

নিজেকে তৈরি করব কেমন করে? এর পূর্ণ উত্তরও কারও জানা নেই। আংশিক উত্তর হয়তো জানি। জানি নিজেকে তৈরি করার নানা মশলা আছে। যেমন প্রভাব। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির প্রভাব, পারিবারিক প্রভাব, রাজনৈতিক ঘটনাসমূহের প্রভাব মনটা তৈরি করে দেয়। এর জন্য কেবল বই পড়া যথেষ্ট নয়। ‘চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি’। আমার মা বলতেন – লেখাপড়া করে দুইজন, বই আর মন।

এখন বুঝি পড়ার জন্য, শেখার জন্য কেবল বই যথেষ্ট নয়।

যেমন প্রকৃতি পাঠও একপ্রকার পড়া। সে পড়া থেকেও অনেক কিছু শিখি। বছরখানেক আগে লাদাখ বেড়াতে গিয়ে(সেখানে গাছপালা প্রায় নেই) ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনতে হল। প্রতিটির দাম পড়ল প্রায় চারশ টাকা। একটা সিলিন্ডার থেকে মিনিট কুড়ি অক্সিজেন নেওয়া যায়। তাহলে সারদিনের অক্সিজেনের প্রয়োজন মেটাতে যদি এমন সিলিন্ডার কিনতে হয় – কত খরচ পড়ে? আমরা কিছুই খরচ করি না, গাছই আমাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার। তাহলে গাছে বাঁচানোর একটা দায় তো থাকে – এটাই শিক্ষা।

পড়ার উদ্যোগ ব্যক্তিগত হলেও তার উৎস হতেই পারে সমষ্টি। ব্যক্তির ধ্যানধারণার সাথে সমষ্টির ধ্যানধারণা মেলাতে বা নাকচ করতে, স্তর বা পর্যায়ান্তরে যেতে চাই নিরন্তর পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, অনুশীলন। তার জন্যও চাই পড়াশুনা। একজন বিপ্লবী, তার নাম মার্ক্স বা রবীন্দ্রনাথ বা গান্ধী যাই হোক, বললেন বা কিছু করলেন, অমনি আমার-আপনার আকাশ রঙ বদলাল – এমন তো হয় না। তাঁরা পড়াশুনা করেছেন, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করেছেন, অনুশীলন করেছেন, চর্চা করেছেন – তাঁরা হাত বাড়িয়েছেন। আমরা যাঁরা সে হাত ধরতে চাই তাদেরও পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, অনুশীলন করতে হয়। তাই তো কেউ মার্ক্স বা রবীন্দ্রনাথ বা গান্ধির পথ অনুসরণ করতে চান, কেউ অন্য কোনও পথে হাঁটেন, কেউ এসবের বাইরে অন্য কোনও মতের সন্ধানে ফেরেন।

সব পথ বা সব মতই যে সুন্দর বা মঙ্গলময় এমন নাও হতে পারে, তাই আলো চাই। সে আলো জ্বালাতে চাই সুশিক্ষা। সুশিক্ষার সংজ্ঞা হয় না, পূর্বনির্ধারিত পথনির্দেশ থাকে না। পড়তে হয় কেবল এটুকু বলা যায় – কী পড়তে হয় কেউ বলে দিতে পারে না, বলে দিলেও হয় না। কেবল এটুকু বলতে পারি যে, আলপনা দিতে চাই নিকোন উঠোন।

কী শিখব তা জেনে বুঝে নিলে পড়ার অভিমুখ ঠিক করা যায় যেমন, তেমন বাছবিচার না করে পড়ে গেলেও কিছু না কিছু শেখা হয়। সে তো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নম্বর তোলার পরীক্ষা নয়, প্রথম দ্বিতীয় হবার পরীক্ষা নয়, চাকুরি পাবার পরীক্ষা নয়, টিক দেওয়ার মাল্টিপল চয়েস-এর জন্য নয়।

কোনও শেখাই বৃথা যাবার নয়, কোনও শেখাই কুশিক্ষা নয়, অশিক্ষা তো নয়ই। এই স্থান বা এই সময়ের বিচার চূড়ান্ত ভাবার কোনও কারণ নেই। যা পড়ছি, যা শিখছি তা অন্য কোনখানে অন্য কোনদিন আলো জ্বালাতে সাহায্য করবে, করবেই এই ভরসা রেখে পড়া চালিয়ে যেতে হবে। ঝাড়াই-বাছাই সেরে (এই ঝাড়াই-বাছাই তথা যাচাই-এর কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ – যা পড়ি বা যা দেখি তাই সত্য এমন নাও হতে পারে) তা থেকে নিজে কিছু শিখব, অন্যকে কিছু শেখাব – তবে না গড়াবে সভ্যতার রথ!

১৯-১২-২০১৭তে গোপালপুর-বাগুইআটি মেলায় প্রদত্ত ভাষণের লিখিত সংশোধিত রূপ)

Developed by DXDasia