পারী দেশের মেয়ে

প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা ৪ : অলোকপর্ণা

মার প্রেমের রং নীল, একথা জেনেছিলাম ১৯৯৪ সালের এক মাঘী দুপুরে, আমি আর বাবা তখন দাঁড়িয়ে আছি গঙ্গানগরে, এয়ারপোর্টের রানওয়ে ছাড়িয়ে শেষ সীমানায় থাকা ভাঙা পাঁচিলের সামনে। আমার চার বছরের চেনা বাবা সাইকেলে চাপিয়ে আমায় এনে ফেলেছে সেখানে আর প্রতি কুড়ি মিনিটে উড়ে যাওয়া একেকটা প্লেন দেখিয়ে বলছে- এটা বাংলাদেশ যাবে, এটা ব্রিটেন, এটা সিঙ্গাপুর, এটা ভারতেরই কোথাও। সেই আমার প্রথম আকাশ দেখা।

হোটেলের ঘরে এলোচুল বিছিয়ে ঘুমিয়ে থাকা বিন্দুবিলাসিনীকে দেখে আমি জেনেছিলাম এমন নিরুদ্দেশ আমার প্রেমের রাষ্ট্রপরিচয়। এমন উদ্দেশ্যহীনতা আমার প্রেমের নাগরিকত্ব। অজ্ঞাতপরিচয়ে বোলপুরের রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোর কারণে আমার কারাবাস হয়েছিলো তিন রাত সাত দিন।

আমার প্রেমের গন্ধ ছিলো ঘাম আর ল্যাক্টোক্যালামাইনে পেঁজা রুমাল, সে রুমাল আমি ছিনিয়ে এনেছিলাম বন্ধুনীর থেকে, শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানের শেষে মেকআপ রুম হতে, আর বাড়ি ফেরার পথে সার্জিকাল মাস্কের মতো নাকে ঠেঁসে ধরে রেখেছিলাম, যাতে বাইরের বাতাসে কোনোভাবে না ঢুকে আসতে পারে ঘাম, ল্যাক্টোক্যালামাইনের সঙ্গে আমার ফুসফুসের পরকীয়ায়। সে রুমাল আমি রেখেছিলাম ছাদের ঘরে, ইঁটের টুকরোর নিচে, পলিথিনের প্যাকেটের মাঝে, যাতে চাইলেই সবার নজর এড়িয়ে সেই ঘ্রাণ সেবন করা চলে। সে রুমাল আমি ফেলে দিয়েছিলাম দশ বছর, তিন মাস, পাঁচ দিন রাখার পর। ফেলে দিয়েছিলাম রান্নাঘরের কোণায় থাকা কাচড়ার বালতিতে, তার আগে ওতে আমি মুছেছিলাম আমার ঘাম, সর্বাঙ্গ হতে, মুছেছিলাম আমার প্রথম শীর্ষসুখ।

আমার কাঁধে যার কামড় ততদিনে বসে গিয়েছিলো, আমি তারও সর্বাঙ্গ মুছে ফিকে নীল সেই রুমাল তাচ্ছিল্যভরে ছুড়ে ফেলেছিলাম ময়লার ডাব্বায়। এভাবে আমি একটি রুমাল হারিয়েছিলাম। আমার মনে আছে।

আমার গানের স্যার মরার আগে আমার মাকে দেখতে চেয়েছিলেন, একথা মাকে জানাতে ভুলে গেছি প্রেমের উন্মাদনায়। প্রেমের উন্মাদনাতে বাথরুম সারাইতে ব্যস্ত রাজমিস্ত্রী যখন প্রশ্ন করেছিলো টাইলগুলো সোজা লাগানো হল কি না, আমি সায় দিয়েছি। তারপর থেকে দুই দশক হল বাথরুমে চিৎ সাঁতার কাটছে সেরামিকের মাছেরা, অথবা তারা মরেছে ওভাবেই, যেভাবে পেট উল্টে ভেসে থাকে একোয়ারিয়ামের আসল গোল্ডফিশ। মৃত সেরামিকের মাছে ঘেরা টাইলের বাথরুমে আমি চান করেছি লিলির সঙ্গে। মৃত সেরামিকের মাছে ঘেরা টাইলের বাথরুমে আমি চান করেছি লিলিবিহীন। আমার প্রেমের ছোঁয়াচ জল, একথা আমি টের পেয়েছি রাতে ঘুমের আগে, ঘুমের ভেতর, দিনে ঘরে বা অফিসের বাথরুমে বসে একমনে কাঁদার পর।

ভোর হলে আরও আরও অনেক ট্রেন আছে, অনেক ট্রেনের অনেক বাঁশি। শুধু বুক ঠুকে রেললাইনে নেমে আসা। বারবার করে। অনবরত আত্মহত্যার মাঝে আমি জেনেছিলাম আমার প্রেমের স্বাদ কষাটে, লৌহ। ফ্রান্সদেশ থেকে আনা মদ যেন বা। বা পারী দেশের মেয়ে।

আমাকে বিন্দুবিলাসিনী জাকারিয়া স্ট্রিট নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিলো এক কড়াই ফিরনির সামনে, ফেলে দিয়েছিলো ঝুলে থাকা কাবাবফুল আর বিরিয়ানি বাতাসে। রিক্সায় আমি একা ছিলাম। রিক্সায় আমার পাশে বসা বিন্দুবিলাসিনী তার অশরীরী হাতে নিজের রুমালে আমার ঘাম মুছিয়ে দিয়েছিল, (এভাবে আমি কিছু রুমাল পেয়েছিলাম)। এরপর বিন্দুবিলাসিনী আমাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলো সাঁওতাল গাঁয়ে। সে ভেবেছিলো পথ হারিয়ে আমি হন্যে হয়ে ফিরবো খোয়াইয়ের অন্ধকার তারাময় আকাশ বেয়ে বেয়ে। ফিরে এসে, হোটেলের ঘরে এলোচুল বিছিয়ে ঘুমিয়ে থাকা বিন্দুবিলাসিনীকে দেখে আমি জেনেছিলাম এমন নিরুদ্দেশ আমার প্রেমের রাষ্ট্রপরিচয়। এমন উদ্দেশ্যহীনতা আমার প্রেমের নাগরিকত্ব। অজ্ঞাতপরিচয়ে বোলপুরের রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোর কারণে আমার কারাবাস হয়েছিলো তিন রাত সাত দিন। বিন্দুবিলাসিনী আমায় ছাড়াতে আসেনি। শুনেছিলাম সে সিংহল চলে গিয়েছে জরুরি তলবে, সেখানকার ঝিনুক সংগ্রহ কর্মশালায়। বিন্দুবিলাসিনীর সবটুকু আমায় বিমুগ্ধ করতে পেরেছিলো। আমি তার আঁচড়, তার আবডাল যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছি সেলোফেনে মুড়ে। আমার প্রেমের স্বর গোপন, একথা জেনেছিলাম দরজার ওপারে, আড়াল থেকে, বিন্দুবিলাসিনী ও বিন্দুবিলাসের সঙ্গম দেখার সময়।

আমার মা প্রাণদায়িনী। তিনি গাছের মা, পাখির মা, বালিশ তোষক, চেয়ার, এ বাড়ির চুনসুরকিরও মা। আমরা সবাই তাঁর পেট থেকে বেরিয়েছি। আমরা সকলে সহোদর। তবু পেঁপে গাছ কাটার আগে অনুমতি নেওয়ার সময় মা বাগানের মালিককে বাদ দিয়ে বাগানের পেঁপে গাছের কাছে অনুমতি চায়। পেঁপে গাছ অনুমতি দিলে তাকে কাটি আমি। তার সাদা রক্ত দেখে মা কাঁদে, মায়ের অশ্রু বর্ণহীন। জল কার অশ্রু ভাবতে ভাবতে যে ট্রেন ব্যারাকপুর হতে শিয়ালদহ যায়, আমি তার হুইসেলের প্রেমে পড়েছিলাম। হুইসেল ডাকলে কেবল এক পা বাড়িয়ে রেললাইনে উঠে দাঁড়াতে হবে। ট্রেনের সে ডাকাতিয়া বাঁশি আমায় বুঝিয়েছিলো লাস্ট ট্রেন চলে গেলেও স্টেশন ছেড়ে যেতে নেই। ভোর হলে আরও আরও অনেক ট্রেন আছে, অনেক ট্রেনের অনেক বাঁশি। শুধু বুক ঠুকে রেললাইনে নেমে আসা। বারবার করে। অনবরত আত্মহত্যার মাঝে আমি জেনেছিলাম আমার প্রেমের স্বাদ কষাটে, লৌহ। ফ্রান্সদেশ থেকে আনা মদ যেন বা। বা পারী দেশের মেয়ে। বা ফরাসি বিপ্লব।

সুজান এসেছিলোও প্যারিস থেকে। সঙ্গে এনেছিলো কালো কমলা গুটিপোকা, এক ব্যাগ তাস, যা দিয়ে ভবিষ্যৎ পড়া চলে। আর এনেছিলো আতর যার নাম সোঁদা, কিন্তু সুজানের উচ্চারণের গুণে তা সোনডা হয়ে পড়ে। সুজান আমাদের নৈশভোজে ডেকে মাংসে ঢাললো ডাল, ডালে ঢেলে দিলো মাশরুম আর মদে এক চিমটে মোম। সেই মদের আলোয় আলোকিত আমাদের নিয়ে বসে সুজান আমাদের ভবিষ্যৎ পড়ে দিচ্ছিলো। যেন মুখস্থ, যেন কেউ কোন ইতিহাসের ক্লাসে নোট দিয়েছিলো তাকে এই সম্পর্কে। আমাদের নিয়তি জানানোর পর সুজান আমার ক্লিভেজে মেশালো নীল রং, যা আমার প্রিয়, তারপর কালো কমলা গুটিপোকা ছেড়ে দিলো সুজান আমার বুকে, আঙুলে করে খাইয়ে দিলো টারকয়েজ ব্লু আর রুমাল দিয়ে কপাল থেকে মুছিয়ে দিলো কলকাতাডোরেমিফাসোলাটি, আমায় সে হাত করলো এভাবে। আর ফিসফিস করে কানে বলল আমার প্রিয় গন্ধ- সুজান। আমার প্রিয় স্বাদ- সুজান। আমার প্রিয় স্পর্শ- সুজান। আমার প্রিয় কালো কমলা গুটিপোকা এখন আমার হৃদয় কামড়ে পড়ে আছে।

____
প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা | অলোকপর্ণা | Valentine's Day | ভ্যালেন্টাইন্স ডে

Developed by DXDasia