
উত্তরপ্রদেশের ‘মুকুটহীন রানি’ বলা হত ঠাকুরবাড়ির এই মেয়েকে
একটি আশ্চর্য পরিবারের গল্প বলছি। পুরোনো কলকাতা শহরের বুকে একটি পরিবার কত যে প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ জন্ম দিয়েছে, বেহিসাবি মন কেমন করে তার সম্পূর্ণ হদিশ পাবে! ঠাকুরবাড়ির সদস্যদের স্বাতন্ত্র্য প্রতিনিয়ত নজর কেড়েছে সকলের। শুধু বাংলায় নয়, ভারতবর্ষের যেকোনো প্রান্তে ঠাকুরপরিবার কীর্তি স্থাপন করেছে অনায়াসে। ঠাকুরবাড়ির এমন এক মেয়ের কথা বলব, উত্তরপ্রদেশে যাঁকে বলা হত ‘মুকুটহীন রানি’। ব্রিটিশ শাসক নত হয়েছিল তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপের কাছে। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোমেয়ে সুদক্ষিণার জন্য বিশিষ্ট হোক আজকের কথকতা!
সুদক্ষিণার আরেক নাম ছিল পূর্ণিমা। জন্মের পর বাবার ছায়া মাথার উপর ছিল না। দাদা দিদিদের সাহচর্যে বড়ো হচ্ছিলেন পূর্ণিমা তথা সুদক্ষিণা। একটু বড়ো হওয়ার পরেই তাঁর রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। আশ্চর্য এক সৌন্দর্য! পরিবারের মধ্যে তখন বেশ জল্পনা, এ মেয়ে তো রাজরানীর মতো রূপ নিয়ে এসেছে। এই লক্ষ্যেই পাত্রের অন্বেষণ চলল। সত্যিই রাজরানী হলেন। পাত্র উত্তরপ্রদেশের হরদৈ জেলার জমিদার, পণ্ডিত জ্বালাপ্রসাদ পাণ্ডে। তিনি পারিবারিক দিক থেকে জমিদার হলেও একজন আই সি এস অফিসারও ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির সুন্দরী মেয়ে সুদক্ষিণার যথার্থ দোসর। সুদক্ষিণাও শুধু সুন্দরী ছিলেন না, বিদূষীও ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত সাবলীল। রান্নাতেও ছিলেন খুব পটু। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য মেয়েদের মতো ‘পুণ্য’ পত্রিকায় তিনিও লিখেছিলেন। তবে রান্নার লক্ষ্ণৌ প্রণালী নিয়ে। রান্নাকে শিল্প মনে করেই লিখেছিলেন। স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে অত্যন্ত সুখী ছিলেন। জমিদারি পরিচালনা, ঘোড়ায় চড়া, বন্দুক ছোঁড়া, ইংরেজি ভাষাচর্চা — সবটাই স্বামীর সঙ্গেই আয়ত্ত করেছিলেন। জীবন চলছিল নির্দিষ্ট ছন্দে। এখন মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রণ যাঁর হাতে, সেই নিয়তি বলে যদি কিছু থাকে, তাঁকে বোঝা দায়! কখন যে ঠিক কী কারণে জীবনের ছন্দ এলোমেলো হয়ে যাবে কেউ জানে না। তখন আবার সবটা শুরু করতে হয়। নতুন ভঙ্গিতে, বুকের ভিতর ধিকিধিকি জ্বলবে যন্ত্রণার আগুন আর সেই আগুনে জ্বলতে পুড়তে ফিনিক্স পাখির মতো যে নতুন জীবন জেগে উঠবে, তা অন্যরকম, আগের জীবনের ছাঁচ ফেলে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়া! একটা জীবনচক্র পরিপূর্ণ হলে তবেই উপলব্ধি করা যায় ঠিক কেন পৃথিবীতে আসা। এই কেন-র সমাধান হলেই বোঝা যায়, পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আসল তাৎপর্য। মানুষকে যে আদতে একলাই চলতে হয়, এইটি বুঝতে অসংখ্য মৃত্যুও কম পড়ে। অনেকটা এমনই হয়েছিল সুদক্ষিণার জীবনে। মাত্র সাতাশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে, বিরাট বৈভবের মধ্যে একলা হয়ে পড়েন তিনি। যেন রহস্যময় সৌরজগতে একলা চাঁদের আলো। সেইসময়ের এক বিধবা, নিঃসন্তান , সুন্দরী যুবতী! ভেবেই নেওয়া হয়েছিল, পণ্ডিত জ্বালাপ্রসাদ পাণ্ডের জমিদারির অবশেষটুকুও থাকবে না। অথচ, গল্পটা ঠিক উল্টো হল। ঠাকুরবাড়ির এই মেয়েটি কলম ধরলেন না সেইভাবে। কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে, হাতে বন্দুক নিয়ে জমিদারি এলাকা পরিদর্শন করে বেড়াতেন। অচিরেই তিনি নিজে হয়ে উঠলেন হরদৈ জেলার জমিদার। কাউকেই পরোয়া করতেন না সুদক্ষিণা। আসলে জীবন তাঁকে বেপরোয়া হতেই শিখিয়েছে। নিজে মাথা তুলে দাঁড়াবেন, দরিদ্র প্রজাদের বল-ভরসা হবেন বলেই ছেলেবেলায় পিতা এবং যৌবনে স্বামীর ছায়া সরে যাবে। তাঁর যন্ত্রণা আর কান্না দায়িত্ববোধের কঠিন অনুভূতির আড়ালে এমন চাপা পড়েছিল, সুদক্ষিণা নিজেও হয়তো তার হদিশ পায় নি কখনও। সুদক্ষিণার জীবনে জ্বালাপ্রসাদ পাণ্ডের অবদান অনেক। নরম কোমল একটি মেয়ের প্রজাপালক হয়ে ওঠার এই কীর্তির অন্তরালে প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকাই তাঁর জীবনের একটি অন্যতম কাজ ছিল। সেই আমলে এ বড়ো কম কথা নয়।
সুদক্ষিণার কীর্তির কথা বাংলাদেশে সুপরিচিত ছিল না। অথচ সুদূর উত্তরপ্রদেশে ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে ঠিক চিত্রাঙ্গদার মতো স্নেহবলে মাতা ও বাহুবলে পিতা হয়ে উঠলেন। কম রোমাঞ্চকর কাহিনি তা নয়। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁদের বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে, এমনটাই ভেবেছিলেন সকলে। বিশেষ করে ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু সকলের ধারণা মিথ্যে প্রমাণ করে বীরাঙ্গনার মতো ব্যক্তিত্ব নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন রানি সুদক্ষিণা। ঘোড়ায় চড়ে প্রজাদের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনতে যেতেন। বিচার করতেন শক্ত হাতে। তাঁর আমলকে সকলে বলত, রামরাজত্ব! বেশ কয়েকজন তেজস্বী ডাকাতকে নিয়ে রক্ষীবাহিনী তৈরি করেছিলেন তিনি। ইংরেজ সরকার রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছিল। উত্তরপ্রদেশে তাঁকে ‘মুকুটহীন রানি’ বলা হত। ইংরেজ সরকার তাঁকে তিনবার ‘মহারানি’ খেতাব দিতে চেয়েছিল। তিনবারই পূর্ণিমা তা প্রত্যাখ্যান করেন। এক তরুণ ইংরেজের আন্তরিক প্রণয়কেও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ঠাকুরবাড়ির এই মেয়েটি। ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ বইতে চিত্রা দেব এমন কথা লিখেছেন। আসলে বিরাট কর্মযজ্ঞের ঋত্বিক হতেই এসেছিলেন সুদক্ষিণা। তাই সংসারের ঘেরাটোপ তাঁর জন্য ছিল না। সত্যের সঙ্গে কখনও আপোষ করেননি। অসহযোগ আন্দোলনে ইংরেজদের ভারত ছাড়ার প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজি ভাষা প্রত্যাখানের প্রস্তাবকে নয়। বিদ্যার প্রতি অমোঘ টান থেকেই ভাষাকে সম্মান জানাতে পেরেছিলেন সুদক্ষিণা। উত্তরপ্রদেশের অনগ্রসর মেয়েদের জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছিলেন। পূর্ণিমা নামে ‘দ্য ইন্ডিয়ান ভিলেজ গার্ল’ নামে একটি অর্কেস্ট্রায় সুরও দিয়েছিলেন। কঠিন ব্যক্তিত্ব এবং আড়ালে লুকিয়ে রাখা কোমল মন— এই দুইটিই ছিল সুদক্ষিণার সম্পদ। এখনও হয়তো উত্তরপ্রদেশের বুধাওন, হরদৈ জেলার অতীত স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন রানি সুদক্ষিণা, ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে!
তথ্যসূত্র
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
