নৌকাডুবির যন্ত্রণাই জন্ম দিল কলকাতার এই ক্লাবের

‘ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’। ভারতে এমন প্রতিষ্ঠান সে-ই প্রথম…

নদীতে-নদীতে-ছয়লাপ বাংলাদেশে নদীর চেয়ে দাপুটে আর কীই বা আছে! এদেশের কবিতায় ছড়ায় গানে নদীর কথা তাই আসে ঘুরেফিরে। শুধু নদী না, আসে নৌকাডুবির কথাও। তারই চোটে কী ফ্যাসাদেই না পড়েছিল চাঁদসদাগর। আর ‘দেবতার গ্রাস’ তো এ-অঞ্চলের নিত্যকার ঘটনা। ভাগ্য আরো খারাপ হলে বাস্তবেও সইতে হতে পারে 'নৌকাডুবি'র দুর্ভোগ।  

তাই অনেক চেষ্টাচরিত্র করে গত শতাব্দীতে উপায় একটা ঠাহর হল। তৈরি করা হল ‘ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি’। নৌকাডুবি আটকানো সম্ভব না-হলেও প্রাণ বাঁচানো যদি সম্ভব হয়– এই চেষ্টাতে ১৯২২ সালের পয়লা অগাস্ট এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। যা দক্ষিণ কলকাতার অ্যান্ডারসন ক্লাবের সঙ্গে সংযুক্তভাবে আজও মানুষকে রক্ষা করে চলেছে।

তবে, এই প্রয়াসের পিছনেও ছিল এক ভয়ঙ্কর নৌকাডুবি ও প্রাণহানির যন্ত্রণা। ১৯২১ -এর অগাস্ট মাসে প্রায় শতাধিক যাত্রী-বোঝাই একটি নৌকোকে গ্রাস করে হুগলি নদী। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল তরুণ। এই বিপুল প্রাণহানি খুবই বিচলিত করেছিল শহর কলকাতার সংবেদী মানুষজনকে। তারা ঠিক করে, নদীর হাত থেকে কীভাবে প্রাণ বাঁচানো যায় তার কৌশলচর্চা শুরু করতেই হবে। নদীমাতৃক প্রদেশে প্রত্যেকেরই সাঁতার জানা আশু-কর্তব্য। আর অবশ্যই এক বা একাধিক দলেরও প্রয়োজন, যারা ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধার করবে। 

১৯২১-এর ২৬ অগাস্ট কলেজ স্কোয়ারে আয়োজিত হয় একটি অনুষ্ঠান। সেখানে আলোচনার পাশাপাশি ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধারের কৌশলও দেখানো হয়। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সেদিন উপস্থিত ছিলেন বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন। তারপর আরও নানান পর্যালোচনার পরে ১৯২২-এ ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি  জন্ম নেয়। গোটা ভারতে এমন প্রতিষ্ঠান সে-ই প্রথম। 

এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরির মূলে কাজ করে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের 'রয়াল লাইফ সেভিং সোসাইটি’ ও ‘রয়াল হিউমেন লাইফ সেভিং সোসাইটি’ নামক সংস্থাদুটির ভাবনা। সাধারণের উপকারের জন্য তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানো ও শরীরচর্চার মাধ্যমে একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক বোধ নির্মাণ করা — এটাই ছিল আই এল এস এস- এর উদ্দেশ্য।

১৯২৬-এ রয়াল লাইফ সেভিং সোসাইটির স্বীকৃতিও পায় সে। স্বাধীনতার পরে অবশ্য সে সম্পর্কে ইতি ঘটে। স্যার জন অ্যান্ডারসন উদ্বোধন করেছিলেন আই এল এস এস-এর ক্লাব হাউজ। তাঁর সম্মানে নাম হয়েছিল অ্যান্ডারসন ক্লাব। সেটা ১৯৩৭ সাল।

বিশ শতকের গোড়া থেকেই শরীরচর্চার বিষয়টি বাঙালির মগজে ঢুঁ মারতে থাকে। শুধু ঘাড় গুঁজে লেখাপড়া করলে জাতির মুক্তি নেই। শারীরিকভাবে তাকে সবল থাকতে হবে। অনুশীলন সমিতি তো বটেই, জায়গায় জায়গায় সে’সময় গজিয়ে উঠেছিল ব্যায়ামের আখড়া। ‘আই এল এস এস’-ও বারবার ঘোষণা করেছে একটি বিজ্ঞানসম্মত শরীরচর্চার কথা। তাতেই আসবে চেতনার মুক্তি।

স্বাধীনতার পরেও সেই ধারা বজায় রেখে চলেছে অ্যান্ডারসন ক্লাব। রবীন্দ্রসরোবরকে ঘিরে চলে এই ক্লাবের সাঁতার-চর্চা। ওয়াটারপোলো খেলা। গোটা ভারতবর্ষেই ধুঁকতে বসেছে ওয়াটারপোলো। যেকটি প্রতিষ্ঠান এখনও তা জারি রেখেছে, তারমধ্যে একটি অ্যান্ডারসন। বজায় রেখেছে ওয়াটার ব্যালের চর্চাও। তাসের দেশ, শ্যামা, আলিবাবা ও চল্লিশ চোর– ও আরো অনেক গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য হয়েছে এখানে। জলকে মঞ্চ হিসেবে কল্পনা করে সাঁতারের মাধ্যমে এই অপূর্ব উপস্থাপনা একসময় মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের।

আই এল এস এস-এর টিম এখনো কাজ করে চলেছে নানানভাবে। কুম্ভ মেলা, গঙ্গাসাগর মেলায় রেসকিউ টিম হিসেবে দেখা যায় তাদের। বন্যার সময়ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে তারা। ইন্ডিয়ান আর্মির প্যারামিলিটারি ফোর্সও ট্রেইনিং নেয় আই এল এস এস-এ।

শরীরচর্চা যাতে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জন্ম দেয় — সেই চেষ্টায় আজও বহাল এই প্রতিষ্ঠান। তাই সাঁতার শেখানো, ওয়াটার পোলো খেলার পাশাপাশি ক্লাবের অন্দরে চলে ক্রিকেট, টেবিল টেনিস। নাটকের, নাচগানের মহড়া। আর চালানো হয় ‘এডুকেশন প্লাস’ নামের একটি ভোকেশনাল স্কুল। নিখরচায় সেখানে শেখানো হয়ে থাকে পড়াশোনা, খেলাধুলো, সাঁতার।

তবে, এতসব কিছুর পাশাপাশি নিন্দুকেরা কেবলই মনে করিয়ে দেয় ‘কোনি’ উপন্যাসের কথা। সেখানে ক্লাবে-ক্লাবে রেষারেষি দলাদলি যে মিথ্যে নয়, আর তাতে যে বাংলার সাঁতার বেশ গেড়োয় ফেঁসেছে একথা অস্বীকার করার জো নেই। শোনা যায়, ওয়াটার-পোলো খেলাও প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। ক্লাবের ক্রমশ ঝাঁ-চকচকে হয়ে ওঠার জেরেই নাকি মার খাচ্ছে খেলাধুলো, শরীরচর্চার সর্বাঙ্গীণ অনুশীলন।

কলকাতা শহরে পুরোনো সাঁতারের ক্লাবগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকগুলি নতুন ক্লাবের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বারবারই মনে হয়, জীবনচর্যার সঙ্গে সাঁতারকে জুড়ে নেওয়ার যে দায় পুরোনোর ছিল, নতুনের তা নেই। অন্যদিকে পুরোনোরাও খানিক গা-ছাড়া দিয়েছে। অথচ খালবিল, নদীতে ভরা বাংলাদেশে সাঁতারই হয়ে উঠতে পারত শরীরগঠনের অন্যতম মাধ্যম। কীভাবে যেন এসব কিছুকে ছাপিয়ে জিম হয়ে গেল মোক্ষলাভের উপায়। 

তবে ‘আশায় মরে চাষা'র মতো করে, আমরাও তাকিয়ে থাকি প্রাচীন লাইফ সেভিং সোসাইটির দিকে। জড়তা কাটিয়ে নিশ্চয়ই সে কলকাতার পুরোনো জলযাপনকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। বড়োসড় কোনো 'নৌকাডুবি' ঘটার আগেই।

ছবি – প্রদ্যুৎ চৌধুরী

Post Tags
Developed by DXDasia