
পারুলের মা প্রেমিকাময়ী ছিলেন একজন যোগ্য অভিনেত্রী
পারুলদেবী, ছবিঃ সংগৃহীত
ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি (Dhirendranath Ganguly) তথা ডিজি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম আমলের পরিচালক। পরবর্তীকালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে এবং পদ্মভূষণ পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী প্রেমিকাদেবী ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ির কানাইলাল ঠাকুরের দৌহিত্রের দৌহিত্রী। ধীরেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) জামাই নগেন্দ্রনাথের ছোটো ভাই। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হলেও চলচ্চিত্র মাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র তখন পৃথিবীর নতুন এক শিল্পমাধ্যম। এই মাধ্যম নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একটি অসম্পূর্ণতা তাঁর চোখে পড়ল। দেখলেন, ভদ্র-অভিজাত পরিবারের মেয়েরা চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে সাহস পায় না। ধীরেন্দ্রনাথ অনুভব করলেন, অভিজাত পরিবারের মেয়েরা চলচ্চিত্রে এলে আরও উন্নতি হবে এই শিল্পের। তাঁর এই কথা শুনে সকলে তাজ্জব হয়েছিলেন। কারণ এ এক অসম্ভব প্রস্তাব ছিল।
ধীরেন্দ্রনাথকে তামাশা করে এক বন্ধু বলেছিলেন, ধীরেন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রেমিকাদেবীই তো যোগ্য অভিনেত্রী। ধীরেন্দ্রনাথ এই কথাটার উপর গুরুত্ব দিলেন। প্রেমিকাদেবী (Premika Devi) প্রথমে ঘরে বাইরে প্রবল বিতর্কের মধ্যে পড়েন। ভয় পান। কিন্তু স্বামীর উৎসাহ আর জেদ তাঁকে সাহস জোগায়। তখন নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ (Silent Flim)। প্রেমিকাদেবী এক সত্যিকারের আধুনিক পদক্ষেপ নিলেন। সমসমায়িক চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকাগুলি তাঁকে ‘দুঃসাহসিকা’ বলে বিশেষিত করল। তাঁর অভিনীত ছবিগুলি ছিল— ‘ফ্লেমস অফ ফ্লেশ’, ‘পঞ্চশর’, ‘হিডন ট্রেজার’। সত্যিই একজন সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী ছিলেন। কিন্তু মাত্র বাইশ বছর আয়ু ছিল তাঁর। আসল নাম ছিল প্রেমিকাময়ী। অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন রমলাদেবী নামে। তাঁর দুই মেয়ে— পারুল (Parul) ও মণিকা (Monika)। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ধীরেন্দ্রনাথ দুই মেয়েকেও শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসেন। পারুল দুটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। আরব্য উপন্যাসের গল্প অবলম্বনে তৈরি ছবি ‘মরণের পরে’, ‘টাকায় কি না হয়’, ‘পঞ্চশর’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন পারুল। সেই সময় এই মা ও মেয়েদের পর পর অভিনয় করা মস্ত খবর ছিল। সেই উনিশ শতকে মেয়েদের এ বি শিখে বিবি হওয়ার মতো।
প্রেমিকাদেবী অভিনীত ছবিগুলি ছিল— ‘ফ্লেমস অফ ফ্লেশ’, ‘পঞ্চশর’, ‘হিডন ট্রেজার’। সত্যিই একজন সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী ছিলেন। কিন্তু মাত্র বাইশ বছর আয়ু ছিল তাঁর। আসল নাম ছিল প্রেমিকাময়ী। অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন রমলাদেবী নামে। তাঁর দুই মেয়ে— পারুল ও মণিকা।
রবীন্দ্রনাথের মেয়ে মীরাদেবীর (Meera Devi) উদ্যোগে ঠাকুরবাড়ির বধূ হলেন পারুল। তারপর আর অভিনয় করেননি পারুল। তবে তাঁরও আগ্রহ ছিল না তেমন। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির ছোটো মেয়ে মণিকা অভিনয় করেছিলেন। তাঁকে বলা হত বাংলা ছবির শার্লি টেম্পল। বাবার সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে, বাবার উৎসাহে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অভিনয় করার। বাবার পরিচালনায় ‘পথ ভুলে’ তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি। এরপর ‘নিমাই সন্ন্যাস’, ‘এপার ওপার’, ‘নারী’ , ‘দাবী’, ‘পাষাণদেবতা’, ‘বন্দিতা’, ‘দাসীপুত্র’ প্রভৃতি ছবিতে তাঁর নজরকাড়া অভিনয় ছিল। প্রেমিকাময়ীর ছোটো বোন মমতাময়ীর বিয়ে হয়েছিল হেমচন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে। তাঁদের সন্তান বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক দীনেন গুপ্ত (Dinen Gupta)।
পারুলের বিয়ের পর তাঁকে দেখে রবীন্দ্রনাথ খুব খুশি। পারুলের সুন্দর চোখ দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন তাঁর ছবি আঁকবেন। মীরাদেবীর আপত্তিতে আর ছবি আঁকা হয়নি। পারুলের ইচ্ছা ছিল চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। তিনি শান্তিনিকেতনে পাঠভবনের (Shantiniketan Patha Bhavan) ছাত্রাবাসের দায়িত্ব নিলেন। মীরাদেবীর সঙ্গে মালঞ্চে থাকতেন। তাঁর দুই মেয়ে প্রকৃতি ও সুকৃতি খুব ভালো গান গাইতেন। পারুল কিন্তু লেখাপড়াকেই গুরুত্ব দিতেন সবচেয়ে বেশি। শোনা যায়, সত্যজিৎ রায় যখন ‘সমাপ্তি’ ছবির জন্য অভিনেত্রী খুঁজছিলেন তখন সুকৃতিকে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারুল রাজি হননি। আশ্চর্য লাগে, পারুলের বাবা মা বোন সকলে চলচ্চিত্র জগতের মানুষ হলেও পারুল কেন নিজেকে এইভাবে সরিয়ে রাখলেন? পারুল ছিলেন সিদ্ধীন্দ্রনাথের স্ত্রী। তাঁদের যৌথ সিদ্ধান্ত ছিল চলচ্চিত্র জগৎ থেকে দূরে থাকার।
ঠাকুরবাড়ির কন্যা এবং বধূরা ছিলেন সরস্বতীর বরপুত্রী। সেই আমলে শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমই ধন্য হয়েছে তাঁদের সুচারু স্পর্শে। চলচ্চিত্রে তথাকথিত সাধারণ, ভদ্র পরিবারের মেয়েদের অবাধ যাতায়াতের অন্তরালে প্রেমিকাময়ী, মমতাময়ী, পারুল, মণিকাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না আজও।
তথ্যঋণঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
