
কল্যাণীর লেখা একটিমাত্র বইয়ের নাম — ‘মৌনরেখা’
ঠাকুরবাড়ির মেয়ে সুনয়নীকে আমরা চিনি। অবনীন্দ্রনাথের এই গুণবতী বোন নিজেও ছিলেন চিত্রশিল্পী। ছেলেমেয়ে ছিল তাঁর। বেনেপুকুরে তাঁর বাড়িতে সব মিলিয়ে প্রায় একশো জন সদস্য ছিল। সুনয়নীর বড়ো ছেলে রতনমোহনের সঙ্গে বিয়ে হয় কল্যাণীর। তাঁর বাবা ছিলেন জগদীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একমাত্র মেয়ে ছিল তাঁর বড়ো আদরের। নিজে চিত্রশিল্পী ছিলেন, মেয়েকেও উৎসাহ দিয়েছিলেন ছবি আঁকায়। কিন্তু মাত্র দশ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন এবং কল্যাণী হলেন সুনয়নীর পরিবারের অংশ। তবে শিল্পী মেয়েটি ঠিক জায়গাতেই এসেছিলেন। শ্বশুরবাড়িতে এসে কল্যাণী পেলেন আরও অনুকূল পরিবেশ। কল্যাণী এই পরিবারের অন্য বধূদের মতো ছবি আঁকা শিখতে শুরু করেন। এমন একটি দিন এল যখন কল্যাণীর আঁকা ছবি জায়গা পেল কলকাতার চিত্র প্রদর্শনীতে। শুধু তাই নয়, পুরস্কৃতও হল। তবে কল্যাণী শুধুমাত্র পারিবারিক ধারায় চিত্রশিল্পী হয়ে রইলেন না। তিনি নিজের অন্য এক পরিচিতি তৈরি করলেন। লেখিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন। বারবার ডাক পেতে লাগলেন আকাশবাণীতে। সেখানে স্বরচিত গল্প ও কবিতা পাঠ করে পাঠকের মনোরঞ্জন করতেন নিয়মিত।
অন্দরমহলে মুক্তির অবকাশ ছিল কম। এই সাহিত্য সাধনাই কল্যাণীকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দিয়েছিল। তাঁর গল্পের চরিত্ররা মনের গহন থেকে উঠে এসেছে। ‘গৌরী দান’ গল্পে রাণুর বাল্যবিবাহ কল্যাণীর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথাই বলে। বড়ো ঘর থেকে আসা সম্বন্ধ উপেক্ষা করতে না পেরে গল্পের চরিত্র রাণুর বাবা মেয়ের বাল্যবিবাহ দিয়ে দেন। মনে হয় কল্যাণীর বাবাও একই যুক্তিতে কল্যাণীর বিয়ে দিয়েছিলেন অল্পবয়সে। অথচ বড়ো ঘর পেলেও যে একটি মেয়ের মন যে নিজের ছোটোবেলার ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, অবকাশ পেলে ফাঁকা মনটা গুমরে ওঠে নিজের প্রিয় গৃহটির জন্য— একথা গল্পকথনের আড়ালে বলেই দিয়েছিলেন কল্যাণী। শ্বশুরবাড়িতে ছোট্ট মেয়ের মনকেমন করেছে ঘাগড়া পরা পুতুলের জন্য। কল্যাণী সেইসব মনখারাপের হিসেব নিকেশ শব্দ বন্দি করে রেখে দিতেন নিজের লেখায়।
শ্বশুরবাড়িতে এসে কল্যাণী পেলেন আরও অনুকূল পরিবেশ। কল্যাণী এই পরিবারের অন্য বধূদের মতো ছবি আঁকা শিখতে শুরু করেন। এমন একটি দিন এল যখন কল্যাণীর আঁকা ছবি জায়গা পেল কলকাতার চিত্র প্রদর্শনীতে। শুধু তাই নয়, পুরস্কৃতও হল। তবে কল্যাণী শুধুমাত্র পারিবারিক ধারায় চিত্রশিল্পী হয়ে রইলেন না। তিনি নিজের অন্য এক পরিচিতি তৈরি করলেন।
তাঁর লেখা থেকে ঠাকুরবাড়ির বধূসজ্জার বর্ণনা পাওয়া যায়। কপালে চন্দন লেপে ছোটো হাতির দাঁতের চিরুনি দিয়ে টেনে দেওয়া হত আর কপালে পরিয়ে দেওয়া হত ছোটো একটি টিপ। সদস্যরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লেও পারিবারিক রীতিনীতি একইভাবে পালন করত। নতুন বউকে সোনাবাঁধানো লোহা পরিয়ে দেওয়া হত শাঁখার কোলে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েরা লোহা পরতেন দুই হাতেই। একটি বাপের বাড়ির তরফে আর অন্যটি শ্বশুরবাড়ির তরফে। একইরকম দেখতে এই দুটি করে নোয়া পরার রীতি এখনও ঠাকুরবাড়ির অনেক পরিবার মান্যতা দিয়ে চলেছে। কল্যাণীর লেখা থেকে জানা যেত শ্বশুরবাড়ি থেকে ননদরা যেত বউ সাজাতে। হরেক রকম গয়নার কথাও জানা যায়— মুক্তোর সাতনরি, হিরের ঝাপটা, কান, বাউটি, বাজুবন্দ আরও কত গয়না। কল্যাণীর লেখা একটিমাত্র বইয়ের নাম — ‘মৌনরেখা’। এই বইটি তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির সদস্যরা প্রকাশ করেছিলেন। আরও অনেক অপ্রকাশিত রচনা ছিল তাঁর। সব প্রকাশিত হয়নি।
তাঁর লেখাগুলি ছিল অন্তর্জীবনের আত্মকথন। রাজনীতি, যুদ্ধ, বিগ্রহ কিছুই তাঁর লেখাকে স্পর্শ করেনি। শুধু বনেদি বাড়ি, তাদের জীবনযাত্রা আর একলা বধূর মনকেমন— এই গল্পই ঘুরে ফিরে এসেছে। আবার সেই সময়কার আধুনিকাদের কথাও লিখেছেন কল্যাণী। গানের আসর, চায়ের মজলিস সব জায়গাতেই দেখা যেত নতুন যুগের মেয়েদের। অনেকসময় তারা স্বয়ম্বরাও হতে চাইত। কিন্তু কল্যাণী তাঁর কোনো গল্পে এইসব পাত্রপাত্রীদের মিলন ঘটাননি। কারণ তাঁর মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল বাংলাদেশে মেয়েদের নিজস্ব কোনো মতামত থাকতে পারে না। কোনোসময় তাঁর নিজস্ব ঔচিত্যবোধ তৈরি হয়েছে, মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে মেয়েদের নিজস্ব মতামত থাকা আদৌ কি উচিত? সেই সময়ের টুকরো টুকরো ছবি তৈরি হয়েছে ‘মৌনরেখা’-র গল্পগুলিতে। নাটক লিখে বাড়ির সকলকে দিয়ে অভিনয় করাতেন কল্যাণী। নাটক পরিচালনাও করতেন কল্যাণী। ছোটোবেলায় কল্যাণীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কৃষ্ণভামিনী দাসের। তিনি মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কথা বলেছিলেন। এই কথাটি মন্ত্রের মতো মনে মনে উচ্চারণ করেছিলেন কল্যাণী। নিজের উপার্জিত অর্থে দরিদ্র রোগীদের জন্য স্থাপন করেছিলেন কল্যাণী এক্স রে ফান্ড। সেই সময়কার বেতার ভাষণে বলেছিলেন, মেয়েদের নিজের জন্য উপার্জনশীল হতে হবে। অর্জন করতে হবে মানসিক দৃঢ়তা। বিত্তশালী পরিবারের এই বধূটির উপার্জন না করলেও চলত। তবু কথা ও কাজে এক ছিলেন তিনি। তাঁর এই কর্মপ্রবাহ ও দৃপ্ত মানসিকতা রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার কথা মনে করায়—
‘যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটে সম্পদে—
‘সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
সহায় হতে,
পাবে তবে তুমি
চিনিতে মোরে।’
‘মৌনরেখা’-র রচয়িতা তাঁর সময়ের থেকে অনেক বেশি আধুনিক ছিলেন।
____
সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
