
বঙ্গদর্শন আয়োজিত বইমেলায় বইপড়া : ১
আর কিছুদিন পড়েই ৪৮তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা শুরু হবে। নতুন নতুন বইয়ের প্রকাশ সংবাদ আসতে শুরু করেছে বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে। সম্প্রতি হাতে এল বিদুর থেকে প্রকাশিত তনুশ্রী বাগের কাব্যগ্রন্থ : সুদীর্ঘ নীরবে আছি। প্রচ্ছদ করেছেন সুপ্রসন্ন কুণ্ডু। যেকোনো বইয়ের প্রচ্ছদই বইটির অন্তর্নিহিত ভাষ্যকে পাঠক সমীপে দৃশ্যগত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সুপ্রসন্নর করা প্রচ্ছদটি এই কাব্যগ্রন্থের ভেতরে প্রবাহিত ভাবধারাটির যথার্থ মূল্যায়ন করেছে।
এই মুহূর্তে বাংলা কবিতায় যে স্বরগুলির তাদের কাব্য নির্মাণ ও ভাষাপ্রয়োগের নিপুণতা দিয়ে চেনা যায় তনুশ্রী বাগ তাদের মধ্যে অন্যতম। যাপনের আঞ্চলিক প্রকৃতি পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে তার কাব্যভাষা। লৌকিক কথকতার গুণ সম্বলিত তার এই নিভৃত চলাচল। মৃদু এক উচ্চারণ, অশ্রুত নয় বরং অন্তর্ভেদী, উচ্চকিত নয়, মায়ামৃগ যেন – যেন নিবেদন ভারে ঝুঁকে পড়া ফুলডাল একখানি। আত্মোপলব্ধির এই নিচু স্বর, সাধুভাষার অমোঘ শব্দপ্রয়োগ তনুশ্রীর কবিতাকে নিজস্ব এক অবয়ব দিয়েছে। শিরোনামহীন কবিতাগুলো মূলত এক সমগ্রের দিকে চলমান যাত্রা। কেউ কারো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যেখানে পাঠক চলতে চলতে আবিষ্কার করবে নির্মাণাধীন কাব্যগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ শরীর। পরস্পর কবিতা সজ্জাতেও সুনিবিড় যত্নের ছাপ স্পষ্ট।
আসা যাক দু-একটা কবিতা শরীরে। দ্বিতীয় কবিতাটিতে কবি লিখছেন –
ট্রেনে উঠে ফোন আসে, যেদিকে দুচোখ যায়।
……………………………………………..
……………………………………………..
এতই কি না-ধ্বণি? এতোই কি বাঁশরীপ্রতাপ?
সন্দেহবশত এসেছি নিকটে, পরাভূত অভাবী সৈনিক।
উপরিউক্ত পংক্তিটি নির্দেশ করছে ভালোবাসা প্রাপ্তিতে ব্যর্থ এক মানুষের প্রচেষ্টাকে। যা আবহমান কালের এক খণ্ডিত চিত্র মাত্র। যদিও সুমহান ভালোবাসা ব্যতীত এই লঘু জীবনে কী আর থাকে প্রাপ্তির! তাই পুনঃ আয়োজন তাকে আহ্বান করার। গ্রহণযোগ্য কি না সন্দেহপ্রবণ – সেই অভাব বোধ লিখিত হয়েছে নিবেদন হেতু দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে।
আরেকটি কবিতায় ঢুকি –
যেন বৃষ্টি পড়ে, প্রাচীন গ্রীষ্মের গায়ে বৃষ্টি পড়ে, তোমাকে সেভাবে চিনি জল।
প্রখর দারুণ অতি দীর্ঘ দ্বগ্ধ দিনের শরীরে বৃষ্টির আগমন যেমন দাবদাহ থেকে পরিত্রাণ নিয়ে আসে – তেমনি এক তৃপ্তির অনুভূতি পাঠককে ভেজায়। কিন্তু এই জল কে? জল কি কেবলমাত্র জল এখানে, আড়ালের প্রেমিক নয় কোনো? পাঠক বুঝে নেবে। তেরো নম্বর কবিতায় কবি লিখছেন –
জানি তরুখেলা সাঙ্গ হলে একা একা
পড়ে থাকে রোদ। দেহের গভীরে নয়
ভেসে ওঠা তেলের মতন স্পর্শহীন
হয়ে কিছুটা থেকে যাওয়া তার।
রোদ ও বৃক্ষের এই স্পর্শ খেলা কেবল রোদ ও বৃক্ষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় – তা বিদগ্ধ পাঠক মাত্রেই অনুভব করবেন। রূপকের অন্তঃরালে সম্পর্ক জড়িত রয়েছে। বিচ্ছেদের পূর্বাপর জড়িত এই খেলাচ্ছলে। স্পর্শ আর স্পর্শহীনতার মাঝের এই সূক্ষ্ম রেখাটি ছিন্ন সম্পর্কের আবহমান স্মৃতিভার বয়ে নিয়ে চলেছে।
এই মুহূর্তে বাংলা কবিতায় যে স্বরগুলির তাদের কাব্য নির্মাণ ও ভাষাপ্রয়োগের নিপুণতা দিয়ে চেনা যায় তনুশ্রী বাগ তাদের মধ্যে অন্যতম। যাপনের আঞ্চলিক প্রকৃতি পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে তার কাব্যভাষা।
শূন্যের উপলব্ধি যখন কবিকে ভাবিয়ে তোলে, তখন খোঁজ জন্ম নেয়। প্রশ্ন জন্ম নেয় এক সুদূরের প্রতি। প্রশ্নকর্তা ও উত্তরপ্রদানকারী তখন এক ও অভিন্ন। এভাবেই আত্মদর্শনের মুখোমুখি হয়ে কবি লেখেন-
শূন্য এতই মুখর তবে? এতই তরঙ্গ তবে জলে? নিরাকার।
মূর্খবোধে। অতল রহিল পড়ে বারিধারা, আজিকার বিপন্ন প্রস্তাবে।
এই কাব্যগ্রন্থের বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো – সাধু ভাষার প্রয়োগ, শব্দবন্ধের নির্মাণ ও ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত এক অনুচ্চ স্বর যা পাঠককে উচ্ছসিত করবে। বহুব্যবহারদীর্ণ সাধারণ শব্দকেও প্রয়োগের মাধুর্যে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন কবি। শব্দবন্ধের কাব্যগুণ সম্বলিত মুনসিয়ানা তারিফযোগ্য। নতুন শব্দার্থ নির্মাণের প্রচেষ্টা অবশ্যই ভাবতে বাধ্য করবে পাঠককে। কিছু কিছু দৃশ্যপট নির্মাণের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যায় দু-একটি কবিতা শরীরে। এড়ানো গেলে ভালো হতো। যদিও সমগ্র কাব্যগ্রন্থের প্রেক্ষিতে না দেখে কেবলমাত্র কবিতাটির অঙ্গসজ্জা হিসাবে যদি দেখি – তবে এই প্রয়োগ সফল।
একটি বই হাতে তুলে নিয়ে পাঠক মূলত বোধ, অনুভব ও নিজস্বতার এক স্ফুলিঙ্গ খোঁজে যা তার চিন্তা ও মননকে আক্রান্ত করবে। পাঠক ভেদে অবশ্য তা বদলে যেতে পারে। সেদিক থেকে তনুশ্রী বাগের এই কাব্যগ্রন্থটি – তার ভাষা প্রয়োগ, ভাষা নির্মাণের নিরীক্ষা ও আত্মবোধের এক অপূর্ব নিদর্শন হয়ে বাংলা সাহিত্যের অজস্র রত্নের পাশে নিজেকে স্হাপন করতে সক্ষম হয়েছে বলে আমার মনে হয়। সবশেষে রইলো একটি কবিতা –
আয়ু ফুটে কুঁড়ি হল ফুল। বন্দরে বন্দরে আদিম সুবাস। হাওয়া বলে, রঙিন নগরী, ওই দেখা যায় দেবীমুখ, আনন্দনিনাদ। যাবে? ফেরাই নৌকাখানি? একটি বাস্তুসাপ পাতার মর্মরে দোলে। ঘুরে ঘুরে ঘটের তলায়, জলস্রোতে, দিগন্তে নাগচক্র ওড়ায়। বলে, এসেছে সে, এইবার চক্ষুকে পদ্ম করে তোলো!
…সংসার জরাময়, আলো তবু আছে তার ধরা। পুষ্পশাখে মধুমাছি খেলা করে, আহারের দিবানিশি আয়োজন। মানবের ঘরদুয়ার, বাসনা, অশ্রুধারা… কে জানে? জানে কেবা? ধরায় উছলি ওঠে মাতৃধারা, দেবতা প্রসন্নে যান।
_____
সুদীর্ঘ নীরবে আছি/ কবি: তনুশ্রী বাগ/ প্রকাশক: বিদুর/ বইটি পাওয়া যাবে কলকাতায় বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে
