
তাঁকে বলা হয় ‘ভারতীয় বায়ুসেনার জনক’
প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় বিমানচালকের নাম ইন্দ্রলাল রায়। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া একমাত্র ভারতীয় বিমানচালক। জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের নজির রেখেছিলেন তিনি। সেই ইন্দ্রলালেরই ভাগ্নে সুব্রত মুখোপাধ্যায়, স্বাধীন ভারতের এয়ার ফোর্সের প্রথম ‘চিফ অফ দি এয়ার স্টাফ’।
অবশ্য সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পরিবারে রয়েছেন আরও অনেক তারকা। বাবা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন জাঁদরেল আইসিএস, মা চারুলতা নারীশিক্ষা ও নারী অধিকারের জন্য লড়াই করতেন। পিতামহ নিবারণ চন্দ্র ব্রাহ্ম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারে অবদান রেখেছিলেন। মাতামহ ড. প্রসন্নকুমার রায় কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। মাতামহী সরলা রায় শিক্ষাবিদ, দিদি রেণুকা রায় প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী।
ভারত ও ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালে ইংল্যান্ডের বায়ুসেনায় পরীক্ষার মাধ্যমে ৬ জন ভারতীয় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সুব্রত। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ বায়ুসেনার অধীনে গড়ে ওঠে ভারতীয় বায়ুসেনা। এই ৬ জন ভারতীয় তাতে যোগ দিয়েছিলেন। সুব্রত পান বিমানচালকের দায়িত্ব। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীতে তিনি ক্রমেই এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৩৯ সালে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পুখতুনরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সেই বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কৃতিত্ব দেখিয়ে সুব্রত মুখোপাধ্যায় ইংরেজ সরকারের থেকে বিশেষ পদক লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন বায়ুসেনার সবথেকে প্রবীণ ভারতীয় বৈমানিক। ভারতীয় বিমানচালক হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রয়্যাল এয়ার ফোর্স স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন সুব্রত। যুদ্ধে দুর্ধর্ষ অবদানের জন্য ‘অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল তাঁকে।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হল। স্বাধীন ভারতের প্রথম তিন জন বায়ুসেনা প্রধান ছিলেন ব্রিটিশ। ভারতীয় বায়ুসেনাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে এঁদের সহায়কের ভূমিকা নিয়েছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ১৯৫২ সালে এই ব্যাপারে আরও প্রশিক্ষণ নিতে ইংল্যান্ডে যান তিনি, ফিরে আসেন ১৯৫৪-তে। সেই বছরের ১ এপ্রিল এয়ার মার্শাল হিসেবে ভারতীয় বায়ুসেনার কমান্ডার ইন চিফের দায়িত্ব নিলেন তিনি। তখন ৪৩ বছর বয়স তাঁর। ১৯৫৫ সালে নতুন আইনের বলে সেই পদের নাম গেল পাল্টে। সুব্রত মুখোপাধ্যায় হলেন ভারতের প্রথম চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ। এখনও এটি ভারতীয় বায়ুসেনার সবথেকে উঁচু পদ। ১৯৬০ সালে জাপানের টোকিওতে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময়ে মাংসের টুকরো হঠাৎ তাঁর গলায় আটকে যায়। শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় ভারতীয় বায়ুসেনার জনক। এয়ার মার্শাল অ্যাস্পি ইঞ্জিনিয়ার তাঁকে এই নামে অভিহিত করেছিলেন।
