বাঙালি অষ্টোত্তরশতনাম : ক্যারিকেচারে ১০৮ জন বাঙালিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন শুভেন্দু সরকার

চৈতন্যদেব থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বিড়লা অ্যাকাডেমিতে এই প্রদর্শনীর সাক্ষী থাকবে গোটা শহর

চৈতন্যদেব (Chaitanya Dev) থেকে সদ্য প্রয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (Sandhya Mukhopadhyay) – বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বজুড়ে বাঙালির অস্তিত্ব বারবার প্রমাণ করেছে বাঙালি যা ভাবে, তা করে দেখায় এবং স্বীকৃতিস্বরূপ তা হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। এবার একশো আটজন বাঙালি ব্যক্তিত্বের আশ্চর্য জীবনগাথা কলকাতা (Kolkata) শহরের বুকে। ক্যারিকেচারের মাধ্যমে তাঁদের ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী শুভেন্দু সরকার (Subhendu Sarkar)।

একশো আটজন বাঙালির গৌরবময় জীবনচরিত। বর্তমান সময়ে বাঙালি ও তার ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ নৈরাজ্য ফুটে উঠেছে তা কমবেশি অনেকেরই জানা। হিন্দি ভাষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এবং বাঙালিদের ক্রমশ কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে বহু বছর ধরে। তাছাড়া বাঙালিরাই বাংলার গৌরবগাথার কথা প্রায় ভুলতে বসেছে। শিল্পী শুভেন্দু সরকার অঙ্কিত ‘বাঙালি অষ্টোত্তরশতনাম’ শিরোনামের চমৎকার এই প্রদর্শনীটি উপস্থাপনা করছেন জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য। প্রসঙ্গত, ক্যারিকেচারের (Caricature) দুনিয়ায় শুভেন্দু সরকারের ওয়ার্ডটুন (Wordtoon) ইতিমধ্যেই চিত্রপ্রেমীদের কাছে অধিক পরিচিত ও সমাদৃত।

শুভেন্দু সরকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ক্যারিকেচারগুলির নেপথ্যের গল্প। তিনি জানাচ্ছেন, শিল্প-সাহিত্য-বিনোদন-খেলা-রাজনীতি প্রায় সমস্ত জগতেরই বাঙালি ব্যক্তিত্বদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কাজটি করেছেন। “তাঁদের বাছাই করাটা খুব কঠিন বিষয় ছিল আমার কাছে। কারণ প্রাতঃস্মরণীয় এত বাঙালি আছেন, কাকে ছেড়ে কাকে রাখব, তা নিয়ে বেশ ধন্দে পড়েছিলাম। তবে শুরু থেকেই কাজগুলির পাশে ছিলেন জ্যোতির্ময়বাবু। তাঁর উদ্যোগেই এই প্রদর্শনী। যেসব বাঙালিদের মানুষ বেশি চেনেন এবং যাঁদের প্রায় ভুলতে বসেছেন, আমার চোখে তাঁরা কেমন, সেটা প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।” – জানাচ্ছেন শিল্পী শুভেন্দু সরকার।

ক্যারিকেচারে নজরুল ইসলাম

ক্যারিকেচারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

যদিও তাঁর ক্যারিকেচারগুলির মধ্যে আছেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, আব্বাসউদ্দিন আহমেদ-এর মতো বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি। মানুষ হয়তো আব্বাসউদ্দিনের গান শুনেছেন, কিন্তু তিনি কেমন দেখতে জানেন না অনেকেই। শিল্পী জানাচ্ছেন, “হঠাৎ কেন বাঙালিদের নিয়ে কাজ করছি, সে প্রশ্ন রেখেছিলাম নিজের কাছেই। কারণ বাঙালি জাতি হিসেবে আমার নিজের শিকড়কে জানা খুব জরুরি। আমি কে, আমার পূর্ববর্তী বাঙালি কারা, তাঁদের কী কী কাজ এখনও স্মরণীয় হয়ে আছে – এ নিয়ে অনেকদিন ধরে পড়াশোনা করছি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু একটু করে জেনে ক্রমশ বিস্মিত হয়েছি। ছবি আঁকতে গিয়ে মনে হল, শিকড়ের গন্ধ পাওয়াটা বেশি জরুরি।”

একশো আটজন বাঙালির গৌরবময় জীবনচরিত। বর্তমান সময়ে বাঙালি ও তার ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ নৈরাজ্য ফুটে উঠেছে তা কমবেশি অনেকেরই জানা। হিন্দি ভাষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এবং বাঙালিদের ক্রমশ কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে বহু বছর ধরে। তাছাড়া বাঙালিরাই বাংলার গৌরবগাথার কথা প্রায় ভুলতে বসেছে।

বাঙালিরা যাঁদের জন্য আলোর সামনে এলেন, বিস্মৃতপ্রায় সেইসব বাঙালিদের অবদান বিরাট। রামমোহন রায় (Rammohan Roy), বিদ্যাসাগর (Vidyasagar) অথবা দ্বারকানাথ ঠাকুর (Dwarakanath Tagore) – এঁদের বিপুল কর্মকাণ্ড না জানলে বাঙালিরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়বেন। অনেক বাঙালিকে এখানে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি, একথাও উল্লেখ করেছেন শিল্পী। বাঙালি জাতির উত্থান নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ লেখা হয়েছে (বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’)। কোথাও এই জাতির গুণচর্চা হয়েছে, আবার কোথাও অলস বলে নানাভাবে তিরস্কৃত হয়েছে। যদিও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিগত প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এমন এক আধুনিক উন্নতশীল জাতি ভারতীয় সভ্যতায় খুব কমই খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রদর্শনীর আয়োজক জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “আমাদের উদ্দেশ্য একটাই, বাঙালির গৌরব যেন বাঙালিরা স্মরণ করে। তাই শিল্পী শুভেন্দু সরকার অঙ্কিত রেখাচিত্রগুলি খুব সহজেই শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সীদের মনে দাগ কাটবে এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।”

ক্যারিকেচারে রবি ঘোষ

ক্যারিকেচারে সুকুমার রায়

প্রায় সাতমাস ধরে ক্যারিকেচারগুলি নির্মাণ করছেন শিল্পী। নিছক আড্ডাচ্ছলেই ক্যারিকেচারগুলি তৈরি হয়েছে। তখনই জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য আগ্রহ প্রকাশ করেন কাজগুলি নিয়ে প্রদর্শনী করার।

আজ যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলা মাধ্যম-ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল নিয়ে তীব্র চর্চা হচ্ছে, এক অংশের মানুষ মনে করছেন বাংলা মাধ্যমে পড়ে আর কিচ্ছু হবে না, আরেক অংশের মানুষ উদাহরণ দিচ্ছেন বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা সফল বাঙালি ব্যক্তিত্বদের নাম, যাঁরা বিশ্বেও সমান সমাদৃত ও জনপ্রিয়। এমন বিষয় নিয়ে দুই অংশে ভাগ হয়ে যাওয়া বাঙালির লড়াই চিরন্তন। শিল্পী শুভেন্দু সরকারের ব্যতিক্রমী এই প্রদর্শনী বাঙালি জাতির ইতিহাস নতুন করে চেনাবে নিঃসন্দেহে।

আগামী ১২ এপ্রিল থেকে বিড়লা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে প্রদর্শিত হবে ‘বাঙালি অষ্টোত্তরশতনাম’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি। সেই সঙ্গে ১৬ এপ্রিল থাকবে বাংলা গানের একটি মনোজ্ঞ সংগীতানুষ্ঠান ‘বঙ্গে-রঙ্গেঃ রাই-কানু’; পরিবেশনায় দেবলীনা ঘোষ এবং মধুমিতা বসু। ২২ এপ্রিল বাংলার মহান একশো আটজন ব্যক্তিত্বদের জীবনগাথা গল্পচ্ছলে ছোটোদের সামনে উপস্থাপনা করবেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক শংকরলাল ভট্টাচার্য। প্রদর্শনী চলবে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

ক্যারিকেচার সৌজন্যেঃ শুভেন্দু সরকার

Developed by DXDasia