পুরোনো কেল্লার স্মৃতি আগলাচ্ছে দেড়শো বছরের বুড়ো জিপিও

সিরাজের আক্রমণে ধ্বংস কেল্লাই আজকের জিপিও

“অবশেষে প্রায় বারো মাস আঠারো দিন পরে আমি কলকাতা শহরে এসে পৌঁছেছি। কলকাতা আমার কাছে কল্পনার শহর, কত দীর্ঘশ্বাস যে ফেলেছি এই শহরের কথা মনে করে তার ঠিক নেই। আমার কত কামনা-বাসনা, কত ভয়-ভাবনা, ভবিষ্যতের কত আশা-আকাঙ্ক্ষা, কত বিলাস-ব্যসনের স্বপ্ন যে গড়ে উঠেছে এই মহানগরীকে কেন্দ্র করে, তা তোমাদের বুঝিয়ে বলতে পারব না।”

১৭৮০ সালে কলকাতায় এসে এমনই উচ্ছ্বসিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন মিসেস এলিজা ফে। সুদূর ইংল্যান্ডে তাঁর পরিবার-পরিজনের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন কলকাতাকে ঘিরে তাঁর মুগ্ধতার কথা। চব্বিশটি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন এই শহরে। আর সেই সময়ে লেখা তাঁর অনেকগুলি চিঠি কলকাতা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ শৈশবস্মৃতি তো বটেই। 

হ্যাঁ,  চিঠির কথাই বলতে চাইছি আসলে। চিঠি থেকে শুরু করে চিঠি রাখার নকশা-করা কাঠের বাক্স– পুরোনো কলকাতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত। চিঠির অপেক্ষায় দিন-কাটানোর গোটা ব্যাপারটিই আজ ঢের অতীত। চিঠি বলতে আসে রেজিস্ট্রি করা অফিসিয়াল নোটিস। আর হ্যাঁ, কিছু পার্সেল। চিঠি নেই, তবু জেনারেল পোস্ট অফিসটি রয়ে গেছে ডালহৌসি চত্বর আলো করে। আর শুধু রয়েই যায়নি, নয়-নয় করে কাটিয়ে দিয়েছে দেড়শোটি বছর। গতবছর (২০১৮) নভেম্বরে দেড়শো অতিক্রম করে গেছে এই বিশাল বাড়িটি।

অবশ্য কলকাতার ডাক-ব্যবস্থার বয়স কিন্তু আরো অনেক বেশি। এলিজা ফে-র চিঠি যাতায়াত করত সেই প্রথম যুগের ডাকে। তার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। সময়কাল ১৭৭৪। প্রথম পোস্টমাস্টার জেনারেল ছিলেন মিঃ রেডফার্ন। ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিটের কোথাও একটা ছিল সেই ডাকঘর। পরে তা উঠে আসে চার্চ লেন ও হেস্টিংস স্ট্রিটের মাঝামাঝি। সেখানেই নাকি এখন ‘ব্যারিস্টার আর সলিসিটরদের চেম্বার…’ (টেম্পল চেম্বার যেখানে, সেখানেই কি?)পুরোনো ডাকঘরের বাড়িটিতে নাকি কিছুকাল থেকেছিলেন এলিজা ফে।

ডাক-ব্যবস্থা জুড়ে আছে কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গেও। নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে পুজোর সময় রুপোর তবক এসেছিল জার্মানি থেকে, ডাকযোগে। সেই থেকেই নাম হল- ডাকের সাজ।

হুগলী নদীর তীরে চিঠি-বোঝাই জাহাজ নোঙর করলেই নাকি বিউগল বেজে উঠত। অবশেষে এল আজকের জেনারেল পোস্ট অফিস। এর কাছেই রাজভবন, এজি বেঙ্গল, রাইটার্স, সেন্ট জোন্স চার্চ, ইস্টার্ন রেলওয়ের অফিস। আর অবশ্যই পাশ দিয়ে বইছে হুগলী নদী। আগে অবশ্য সে নদী ছিল আরো কাছে। জিপিও-র পুরোনো হাতে-আঁকা ছবিগুলিতে দেখা যায়, পিছন থেকে উঁকি দিচ্ছে জাহাজের মাস্তুল। আজ সে দৃশ্য কল্পনা। 

জিপিও-র নকশা করেছিলেন মিস্টার ওয়াল্টার বি গ্রেনভিল। আর নির্মাণে হাত লাগিয়েছিল ম্যাকিনটস বার্ন। খরচ পড়েছিল নাকি প্রায় ছ-লক্ষ টাকা। বাড়িটি দোতলা সমান। থামগুলি করিন্থিয়ান নকশার। মাথার ওপর বিশাল একটা গম্বুজ। দক্ষিণ দিকটি অর্ধচন্দ্রাকার। ভেতর দিকে পাক-খাওয়া সিঁড়ি। এই ভরা গ্রীষ্মে জিপিও-র মতো আরামদায়ক কিছু হয় না। পুরোনো রানারদের স্মৃতিতে অন্দরে রয়েছে একটি রানার মূর্তি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতাটির রানারের আদল মেনে।

তবে জিপিও-এর একটা অন্য ইতিহাসও আছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে যাওয়া-আসা করেন, ব্যস্ততায় ঠাসা থাকে এর চারপাশ। এতে সেই ইতিহাসটি খানিক চাপা পড়ে গেছে আজ। যদিও তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন লর্ড কার্জন। আর তাই জিপিও-র দেহ জুড়ে খোদাই করেছিলেন সেই ইতিহাস। জিপিও আসলে পুরোনো কেল্লার সীমানা। ১৭৫৬ সালে সিরাজদ্দৌল্লা আক্রমণ করেছিলেন কলকাতা। সেদিন মারাঠাডিচের পাহারা পেরিয়েছিলেন অনায়াসেই। পেরিন্সপয়েন্টে আটকানোরও চেষ্টা হয়। কিন্তু সবই বিফল। কেল্লা ঘিরে ফেলেছিল নবাবের সেনা। ১৪৬ জন ইংরেজকে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল হলওয়েল। ইংরেজের দর্পচূর্ণ করে সিরাজ কলকাতার নাম রেখেছিলেন আলিনগর। 

লর্ড কার্জন অনুমান করেছিলেন আগেই যে, পুরোনো কেল্লার গল্প মুছে যাবে অচিরেই। মুছে যাবে অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি। তাই ১৯০০ সালে, মার্বল পাথরের গায়ে লিখে রেখেছিলেন কেল্লার সীমা। কেল্লার দক্ষিণ সীমা ছিল আমাদের আজকের জিপিও। তারই উত্তরদিক থেকে আক্রমণ ঘটেছিল সিরাজের। ফেয়ারলি প্লেসের মাঝামাঝি ছিল কেল্লার ঘাট। জেনারেল পোস্ট অফিসের ভিতর নাকি আজও বেশ কিছু খিলান পুরোনো কেল্লার চিহ্ন বহন করছে। যদিও আজ প্রায় তিনশো বছর পর তাদের চিনে নেওয়া বেশ কঠিন।

১৮৬৮-এ পুরোনো কেল্লার অবশেষ সরাতেই নাকি বেশ সমস্যা হয়েছিল। সিরাজের স্পর্ধা কম নয়। অত মজবুত ভিতে ঘা মেরেছিল কষিয়ে। 

সে যাই হোক। আমদের প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাওয়া কলকাতায় আজও যে ১৮৬৮-এর বাড়িটি বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে, তা ভাবতে ভালোই লাগে। আর হাতে সময় থাকলে জিপিও-র থামে হেলান দিয়ে দিব্বি ঝিমোতে ঝিমোতে কল্পনা করা যেতে পারে ওই কাছেই বিউগল বাজিয়ে হুঁশিয়ার করছে ইংরেজ সেনা। অদূরেই সিরাজের সৈন্যের গর্জন…

তথ্যসাহায্য: ‘কলকাতা’- শ্রীপান্থ
‘এক যে ছিল কলকাতা’ – পূর্ণেন্দু পত্রী
‘কলকাতা একাল ও সেকাল’- রথীন মিত্র

ছবি:https://upload.wikimedia.org/wikipedia/
commons/9/90/
General_Post_Office%2C_Kolkata.jpg

Post Tags
Developed by DXDasia