কলকাতা বইমেলায় আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইউক্রেনের স্টল : এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন

বইমেলা আক্ষরিক অর্থেই আন্তর্জাতিক

লকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে পথচলা শুরু হয়েছিল বইমেলার। ১৯৭৬ সালে মোহরকুঞ্জে প্রথমবারের জন্য আয়োজিত হয়েছিল কলকাতা বইমেলা। তখনও আন্তর্জাতিক তকমা মেলেনি। ১৯৮৩ সালে কলকাতা বইমেলার মুকুটে যোগ হয় ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা। ১৯৯৪ সালে প্রথম ‘ফোকাল থিম কান্ট্রি’র রেওয়াজ শুরু হয়। সে’বছর ‘থিম কান্ট্রি’ ছিল জিম্বাবয়ে। আজ কলকাতা বইমেলায় যেন বিশ্ব এসে মিশেছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা দেশের শিল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটে মেলায় আসা লেখক, পাঠক, বইপ্রেমীদের। এই পরিচিতির মঞ্চ হল কলকাতা বইমেলা।

থিম কান্ট্রি যে দেশ হয়, সে দেশের লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা আসেন। তাঁরা এই সময়টা কলকাতাতে থাকেন। মেলায় আসেন। মেলায় আসা পাঠক, লেখক, বইপ্রেমী মানুষ এবং আম জনতা কার্যত নাগালের মধ্যে পান তাঁদের। থিম কান্ট্রির মণ্ডপে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়, থাকে ওয়ার্কশপের আয়োজন।

মোহরকুঞ্জে শুরু হওয়া সে দিনের সেই ছোট্ট বইমেলা আজ সকল অর্থে মহীরূহে পরিণত হয়েছে। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার ৪৯তম সংস্করণে প্রায় ২১টি দেশ অংশগ্রহণ করেছে। এবারের ফোকাল থিম কান্ট্রি মেসি-মারাদোনার দেশ আর্জেন্টিনা। ভারতে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো কাউসিনো এবং সে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক গুস্তাবো কানসোব্রে মেলা উদ্বোধনের দিন উপস্থিত ছিলেন। এবছর কলকাতা বইমেলায় প্রথমবারের জন্য অংশগ্রহণ করেছে ইউক্রেন। এছাড়াও রয়েছে রাশিয়া, জার্মানি, ইউকে, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পেরু, চিন, নেপাল-সহ লাতিন আমেরিকার একগুচ্ছ দেশ। বসন্তের কলকাতায় বইমেলা যেন দরবেশের আলখাল্লা। নানা রঙের কাপড়ের টুকরোর সমাহারে যেমন রেঙে ওঠে দরবেশের বেশ, তেমনই নানান দেশের সম্মিলিত উপস্থিতিতে সেজে ওঠে বইমেলার ক্যানভাস। বই, সাহিত্য, সাহিত্যিক, মানুষের মন সেখানে রেঙে ওঠে।

৪৯তম কলকাতা বইমেলার ‘ফরেন কমপ্লেক্স’-এ নীল, সাদা রঙে সেজে উঠেছে থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনার মণ্ডপ। ভিতরের প্রতিটি দেওয়াল সাজানো হয়েছে স্থিরচিত্রে, তার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। ছবিগুলিতে ধরা দিয়েছে আর্জেন্টিনার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি। বইমেলার মোট নটি গেটের মধ্যে দুটি গেট আর্জেন্টিনার প্রাচীন স্থাপত্যের আদলে গড়া হয়েছে। যে দেশ, যে বছর থিম কান্ট্রি হয়, সেবার এভাবেই সংশ্লিষ্ট দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে তুলে ধরে কলকাতা বইমেলা। এটিই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মূল মাধ্যম। পাশাপাশি থিম কান্ট্রি যে দেশ হয়, সে দেশের লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা আসেন। তাঁরা এই সময়টা কলকাতাতে থাকেন। মেলায় আসেন। মেলায় আসা পাঠক, লেখক, বইপ্রেমী মানুষ এবং আম জনতা কার্যত নাগালের মধ্যে পান তাঁদের। থিম কান্ট্রির মণ্ডপে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়, থাকে ওয়ার্কশপের আয়োজন। সেখানে অংশগ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের লেখক, সাহিত্যিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ মেলে। ভিন দেশের সাহিত্য কোন পথে বাঁক নিচ্ছে, কী ভাবছে, তা জানা সহজ হয় উঠতি তরুণ লেখক থেকে শুরু করে নবীন-প্রবীণ, সকলের জন্য। বিভিন্ন দেশের মানুষ সঙ্গে এহেন সরাসরি ভাব আদানপ্রদানের মাধ্যম হয়ে ওঠাই কলকাতা বইমেলাকে অনন্য করে তুলেছে।

এই আদানপ্রদানই বইমেলার আন্তর্জাতিকতার মূল ভিত্তি। বাংলায় থাকা কোনও এক তরুণ হয়তো সারা বছর বাংলা বা ইংরেজি ভাষার বই পড়ছে। অনুবাদ সাহিত্য পড়ছে। মেলায় এসে সে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা বা আফ্রিকার মতো দেশের সাহিত্যের স্বাদ পাচ্ছে সরাসরি। আবার পেরু, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানির লেখক, সাহিত্যিকেরা বাংলার পাঠক সমাজের মুখোমুখি হচ্ছেন। জানছেন প্রাচ্যের অন্যতম পীঠস্থানকে। তখন সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের বেড়াজাল পেরিয়ে ঘটছে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, সাক্ষী থাকছে বইমেলার পড়ন্ত বিকেল, বইমেলার ধুলো, নতুন বইয়ের গন্ধ। ফি বছর এ মেলবন্ধনের সূতিকাগার হয়ে ধরা দেয় বইমেলার ‘ফরেন কমপ্লেক্স’। আন্তর্জাতিকতার এই পরিসর দিনে দিনে বাড়ছে। ছাপিয়ে যাচ্ছে পূর্ববর্তী বছরকে। পৌঁছে যাচ্ছে চূড়ান্ত পর্যায়ে!

‘‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’’ — রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণের সার্থক বাস্তবায়ন ঘটছে করুণাময়ীর মেলাপ্রাঙ্গণে। মেলার আদত উদ্দেশ্য হল মানুষে মানুষে মিলন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি; বইমেলা দুটোই পূরণ করছে পাশাপাশি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের এক বৃহৎ ‘ক্যানভাস’। তিন বছর ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা ইউক্রেন-রাশিয়াও একসঙ্গে হাজির হয় এই বইমেলায়! এখানেই এশিয়ার বৃহত্তম ‘ওপেন এয়ার’ বইমেলার সার্থকতা।

পেরু, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানির লেখক, সাহিত্যিকেরা বাংলার পাঠক সমাজের মুখোমুখি হচ্ছেন। জানছেন প্রাচ্যের অন্যতম পীঠস্থানকে। তখন সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের বেড়াজাল পেরিয়ে ঘটছে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, সাক্ষী থাকছে বইমেলার পড়ন্ত বিকেল, বইমেলার ধুলো, নতুন বইয়ের গন্ধ।

অচিরে বহু দেশীয় সংস্কৃতির পীঠস্থান হয়ে উঠেছে মেলাপ্রাঙ্গণ। ভিন দেশের মানুষ আসছেন তাদের বইপত্র, সাহিত্য নিয়ে। এ দেশের মানুষ, বাংলার মানুষ সেগুলি দেখার, জানার সুযোগ পাচ্ছেন। পরদেশিরাও বাংলাকে জানছেন, বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতির স্বাদ নিয়ে যাচ্ছেন নিজের নিজের দেশে। বিশ্বের সঙ্গে বাংলা ও ভারতের মেলবন্ধনে সেতুর ভূমিকায় বইমেলার থেকে যাওয়া আজও এ শহরের গৌরব, কলকাতা বইমেলার বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার মূল সোপান।
 

Developed by DXDasia