
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৫তম পর্ব
সম্ভবত এই ঘটনার দু’দিন পরে পুলিশ পাহারায় একটা জিপে করে আমাদের কলকাতার আন্দুল রাজ রোডের গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হল। জিপ থেকে নামিয়েই ওরা আমাদের দু’চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর অনেকটা সিঁড়ি বেয়ে আমাদের দু’জনকে দু’টো ঘরে বসিয়ে রেখে গেল দু’জনের পাহারায়। তারা সম্ভবত সাদা পোশাকে পুলিশের লোক। তারপর দু’ঘরে অফিসার ধরনের পুলিশের মাধ্যমে চলল জিজ্ঞাসাবাদ। হরিপদকে কী করছে আমার জানার উপায় নেই। তেমনি হরিপদও জানে না আমার অবস্থা। আমার পা দুটোকে বেঁধে দু’হাতের ওপর একটা চেয়ারের দু’টো পায়া রেখে তার ওপরে একজন ওজনদার লোক বসেছিলেন। অফিসারটি কাঠের বা লোহার ডান্ডা দিয়ে আমার হাত-পায়ের গিটে গিটে পিটিয়ে পিটিয়ে ‘ফিজিওথেরাপি’ করছিলেন আর নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। আমাকে ‘থেরাপি’ করে তিনি আবার চলে যাচ্ছিলেন হরিপদ যেখানে ছিল সেখানে। এক সময় তার আসা বন্ধ হল। আমার হাতের ওপর চেয়ারের পা দু’খানি রেখে যিনি বসেছিলেন, তিনি অন্য সঙ্গীকে বলে উঠলেন, “ওনার কাজ কখন শেষ হবে কে জানে! আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিছু বাজার-টাজারও করা দরকার”। দ্বিতীয়জন বলে উঠলেন, “মনে হচ্ছে কাজ বোধ হয় শেষ হয়ে এল”।
চেয়ারে বসা ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। আমি হাত দু’টো নাড়বার অবস্থায় ছিলাম না তখন। এতদ্সত্ত্বেও জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনাদের বাড়ি কি খুব দূরে?” একজন বলল, ওনাকে ট্রেনে করে ফিরতে হবে। আরেকজন বললেন, কাছেই কোনো পুলিশ কোয়ার্টারে থাকেন তিনি।
(গত পর্বের পর)
আমি বললাম, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করব আপনাদের?” সাবধানি কণ্ঠস্বরে একজন বলে উঠলেন, “আপনার আবার কী কথা বলার প্রয়োজন হল? জল খাবেন কি?”
আমি বললাম, “জল একটু পেলে ভালোই হয়। তবে আমার কথাটা অন্য”।
অন্য একজন বলে উঠলেন, “যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। স্যার হয়তো এক্ষুনি এসে যাবেন।”
“সাহস দেন তো আপনাদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করি” – আমি বললাম। একজন বললেন, “যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন বলছি না।”
আমি বললাম, “আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনারা অতি সাধারণ কর্মচারী, টাকা-পয়সাওয়ালা লোক নন। আমরা যেই শ্রমিক-কৃষক-মধ্য আয়ের মানুষদের পক্ষে কথা বলি, আপনারা সে পক্ষেরই লোক। আমাদের কী ভুল আপনাদের চোখে পড়েছে একটু ছোট্ট করে বলবেন।”
এই প্রশ্নে একজন প্রায় ক্ষেপে বললেন, “আমরা আপনাদের পক্ষের এ কথাটা সত্য বলছেন আপনারা? তা হলে আমাদের ওপর এত রাগ কেন আপনাদের? কেন আপনাদের হাতে আমাদের প্রায় প্রতিদিন মরতে হচ্ছে?”
জল এল। জল খেয়ে আমি বললাম, “এ প্রশ্নটি যুদ্ধ সম্পর্কিত, সঠিকভাবে বোঝাতে গেলে যে সময় লাগবে, তা এখন পাওয়া যাবে না। তবে আপনাদের ছোট্ট কথায় বলতে পারি, কোনো মানুষকে সামনে পেলেই তাকে যদি শত্রু বলে মনে করি, সে সশস্ত্র হোক বা নিরস্ত্র হোক – আমাদের রাজনীতি কোনো রকম বিচার না করে তাকে মেরে ফেলতে শিক্ষা দেয় না। এক কথায়, ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি আমাদের রাজনীতি নয়”।
প্রশ্নকর্তা বলে উঠলেন, “ব্যাস, ব্যাস, আমাদের আর বোঝাতে হবে না আপনাদের রাজনীতি কী। আমরা ভালোভাবেই এর মধ্যে তা বুঝে নিয়েছি। স্কুল-কলেজে আগুন লাগানো, পুলিশদের মেরে বন্দুক-রাইফেল কেড়ে নেওয়া, জোতদার-জমিদার বলে আপনারা যাদেরই মনে করবেন, তাদের যখন যেখানে পাবেন হত্যা করা – এটাই তো আপনাদের রাজনীতি। আমাদের সামনে ভালোমানুষি করবেন না।”
আমি বুঝলাম, আমাদের রাজনীতির অপব্যবহারে সাধারণ মানুষের মধ্যে এরকমই ধারণা গড়ে উঠেছে। দু’চার কথা বলে এখানে আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কাছে তুলে ধরা অসম্ভব। তাই আমি বললাম, “আপনাদের কথায় হয়তো কিছুটা সত্য আছে, তবে সবটা না। কে শত্রু, কে বন্ধু – তা আমরা বিচার করি অন্যভাবে। আপনি যদি গরিব মানুষদের কেউ হন, গরিব কৃষক বা কারখানার মজুর বা মধ্য আয়ের চাকুরিজীবী মানুষ হন – আপনাকে আমরা শত্রু মনে করি না। কিন্তু যদি আপনি বড়োলোকদের কেউ হন, যদি হন জমিদার জোতদারদের কেউ, তাদের পা চাটা দালাল – তা হলে আপনাকে আমরা শত্রুপক্ষের লোক বলে ভেবে নেব। সে হিসেবে আপনারা দুইজনই, যারা নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পুলিশের কাজ করছেন, তাদের সাধারণভাবে আমরা শত্রুশ্রেণির লোক বলে বিবেচনা করি না। আপনি অন্য কোনো কাজ না পেয়ে পুলিশের কাজ করছেন হয়তো। অন্য কাজ পেলে, যাতে আপনার ও পরিবারের খাওয়া-পরা চলে যায় বলে মনে করতেন, আপনি সে চাকরিকে লুফে নিতেন”।
অন্য ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “শত্রু মনে করেন না, আবার আমাদের মারতেও ছাড়েন না – বলিহারি আপনাদের রাজনীতি”।
(চলবে…)
ছবি-প্রতীকী
