
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭১তম পর্ব
তিনি দু’হাত আমাদের দু’জনের কাঁধে রেখে বললেন, “ভবিষ্যতে যদি কোনোদিন এদিকে আসেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা করবেন”। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মাস্টারমশাইয়ের মূল বাড়ির দরজায় তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা আত্মীয়দের বিদায় দেবার মতো করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। পুলিশ অফিসার বললেন, “চলুন, অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, তার উপর নৌকো কখন মিলবে তা-ই বা কে জানে!”
(গত পর্বের পর)
মনে মনে “সাতজেলিয়া, তোমাকে বিদায়” বলে যাত্রা শুরু করল আমাদের ‘মিছিল’। অপেক্ষামান গ্রামবাসীদের কেউ কেউ হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানালেন। আমরা যে “চলেছি, চলেছি, গেয়ে জীবনের গান, আমরা দুই জোয়ান দুনিয়াটা বদলাতে চলেছি। চলেছি, চলেছি, চলেছি…”
অতঃপর ফেরিঘাটে এসে পৌঁছনো। ঘাটে নৌকো নেই, গোসাবা গেছে, ফিরে আসতে অন্তত মিনিট কুড়ি লাগবে। আমাদের ঘিরে লোকজনের ভিড়। অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, “কী, চা চলবে নাকি?” এবং আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না করেই চায়ের দোকানের মালিককে চায়ের অর্ডার দিয়ে দিলেন। হরিপদর সাথে আমার হাতের হাতকড়া বাঁধা। দু’হাত তুলে উপস্থিত জনতাকে বলে উঠলাম, “বন্ধুগণ, আমাদের দেখে আপনারা ভাবছেন তো, আমরা চোর না ডাকাত? না, আমরা দু’টোর কোনোটাই নই। তবে আপনারা নন, দেশের জোতদার, জমিদার, কল-কারখানার মালিকরা আমাদের চোর-ডাকাত বলে গ্রেপ্তার করে। খুনের অপবাদ দিয়ে আমাদের খুন করে, আমাদের ধরে ধরে জেলে পুরে দেয়…”।
আরও পড়ুন
পুলিশরা এবার পাহারা দেবেন আমাদের
অফিসার আমাকে বলে উঠলেন, “নিন মশাই, চা খান। আপনি দেখছি আমার চাকরির বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন”। আমাদের একজনের বাঁ হাত আর অন্য জনের ডান হাতের সঙ্গে হাতকড়ার বাঁধন ছিল। মুক্ত হাতগুলো আমরা বাড়িয়ে দিলাম চায়ের ছোটো কাচের গ্লাসগুলির দিকে। দূরে নৌকো ফিরে আসার আভাস দেখে আমাদের বাহিনী, অন্যান্য যাত্রীরা ঘাটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
অবশেষে নৌকো ছাড়ল। ফেরিঘাটে দাঁড়ানো লোকজনদের হাত নাড়তে দেখলাম আমাদের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আমরা নৌকোর এমন জায়গায় বসেছিলাম, সেখান থেকে হাত তুলে তাঁদের অভিবাদনের প্রত্যুত্তর দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা গোসাবা থানায় এসে ঢুকলাম। অফিসার কাগজপত্র নিয়ে থানার বড়োবাবুর ঘরে ঢুকে গেলেন। পুলিশ আমাদের হাতকড়া খুলে লক-আপে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেল।
হাতকড়ার লোহার ঘষায় দু’জনেরই হাতে চামড়ার নুন-ছাল উঠে জ্বালা করছিল। লক-আপের সঙ্গেই বাথরুম দেখতে পেয়ে আমরা হাত পা ধুয়ে নিলাম। দু’জনেরই মাথায় এবার এক চিন্তা – এখানে কোন নাটক শুরু হবে কে জানে!
আরও পড়ুন
পুলিশরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিলেন আমাদের ওপর
সাধারণত আমাদের পেলে থানার পুলিশেরা যেভাবে হাতের সুখ করে নেয়, এখানে কিন্তু সে সব কিছু হল না। সন্ধে পর্যন্ত আমাদের দু’জনকে আলাদা আলাদা ডেকে নিয়ে প্রশ্নোত্তর পালা চলল। এর মধ্যে আরও দু’জন আসামিকে ঠেলে ঢোকানো হল আমাদের গারদ ঘরে। জানলাম, গরু চুরির অপরাধে পুলিশ তাদের ধরেছে। আমরা কিন্তু ওদের পেয়ে আনন্দিতই হলাম। যা হোক, কথা বলার মতো লোক তো পাওয়া গেল!
দ্বিতীয় ক্ষেপে হরিপদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়ার পর আমি খালি ভাবছি, পুলিশ কী করছে, হরিপদ পুলিশকে কী বলছে কে জানে! একবার তো মনে হল, হরিপদ ব্যথায় চিৎকার করছে। আমি আর সহ্য করতে না পেরে গারদের কোলাপসেবল গেট ধরে শব্দ করে ঝাঁকুনি দিতে লাগলাম। একজন সাব ইনস্পেকটর ছুটে এলেন সেই শব্দ শুনে। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করায় আমি তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করলাম, আমার বন্ধুকে কেন আপনারা এভাবে মারছেন?” ওই সাব ইনস্পেকটর খোঁজ নিয়ে এসে বললেন, “ধুর মশাই, আপনার বন্ধুকে দেখলাম, বড়োবাবুর পাশে চেয়ারে বসে সিগারেট খেতে খেতে কথাবার্তা বলছেন”। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হরিপদ ফিরলে আমার ডাক পড়ল। এভাবে সন্ধে পর্যন্ত আমাদের তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ চলেছিল। না, কেউ আমাদের গায়ে হাত দেয়নি। আমাদেরও একই কথা একঘেয়েভাবে বলে চলা।
(চলবে…)
