
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৮তম পর্ব
মাস্টারমশাই প্রায় ধমকে ওদের চিৎকার চ্যাঁচামিচি বন্ধ করতে বাধ্য করলেন। তাঁর বাড়ি সম্ভবত স্কুলবাড়ির পেছনেই। তাঁর আদেশে একজন দু’টি থালায় পান্তা ভাত এবং আখের গুড় নিয়ে এল। আমাদের হাতমুখ ধুয়ে পান্তা খেয়ে নিতে অনুরোধ করলেন মাস্টারমশাই। আমাদের পরিচয়, আমাদের উদ্দেশ্য ইত্যাদি জানতে চেষ্টা করলেন। খেতে খেতে আমি কখনও বাংলা, কখনও ইংরেজি ভাষায় তার কথার জবাব দিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে সংস্কৃত শ্লোকও শোনালাম, যেখানে বলা হয়েছে, যে রাজা প্রজার দেখভাল করতে পারে না, তাকে কুকুরের মতো পিটিয়ে মারার অধিকার আছে প্রজাদের। কথাগুলো চারপাশের লোকজনেরও কানে যাচ্ছিল। তারা বলাবলি করতে লাগল, “এরা সব শিক্ষিত ছেলে, অনেক কিছু জানে”। তাদের অনেকের চোখেই কেমন শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব লক্ষ করলাম। একজন তো প্রশ্ন করে বসলেন, “আপনার তো বলছেন আপনারা নকশাল নয়, আবার বলছেন…”
(গত পর্বের পর)
আমি তাদের প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়েই ‘নকশাল’ কথাটা কোথা থেকে এল, নকশালবাড়ি কোথায়, কখন থেকে একদল লোককে নকশালপন্থী বলা শুরু হল, ছোট্ট ছোট্ট করে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলাম। তারপর যখন নকশালবাড়িতে কৃষকদের ওপর যুক্তফ্রন্ট সরকারের গুলি চালাবার ঘটনা সবিস্তারে তাদের শোনালাম। শোনালাম কী করে বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ ১১ জন কৃষক রমণীকে গুলি করে হত্যা করেছে, পুলিশের গুলি কীভাবে মায়ের পিঠে থাকা বাচ্চাকে এঁফোড়ফোড় করে দিয়েছে। সেই ইতিহাস বলার সময়য়ে লোক একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে শুনছিল।
একজন বলল, “কিছুদিন আগে নকশালরা গোসাবাতে একজনকে খুন করেছে। সেই থেকে একটা আতংক সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে গিয়েছে। লোকে আপনাদের বিশ্বাস করতে চায় না”। আমি ওদের বোঝাতে চেষ্টা করলাম, বিপ্লবী যুদ্ধে কেন রক্তপাত হতে বাধ্য – “কিন্তু আপনারা মাও সেতুং-এর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, নিরস্ত্র শত্রুকে কোনোদিন কমিউনিস্টরা হত্যা করে না। নিরস্ত্র লোককে মেরে বড়োলোকদের এই সমাজটাকে বদলে দেওয়া যায় না। আমরাও বিপ্লবী রাজনীতি প্রচার করে বেড়াই। কিন্তু অহেতুক মানুষকে মারা আমাদের পথ নয়”।
অবিরত আমাকে বলে যেতে হচ্ছিল। থামার সুযোগ এল, যখন এক চৌকিদার এসে হাজির হলেন। লিকপিকে চেহারার ওই চৌকিদারকে প্রকৃত অর্থেই তালপাতার সেপাই বলা চলে। তার থেকে জানা গেল, গোসাবা থেকে এক নৌকা পুলিশ-সহ থানার বড়োবাবু রওনা দিয়েছেন। এই এলেন বলে। আমি তখন উপস্থিত জনতাকে সুকান্তের কবিতা “শোনরে মালিক, শোন রে মজুতদার’ আবৃত্তি করে শোনাতে ব্যস্ত।
যে মাতব্বররা আমাদের নৌকা বিচার পর্বের নায়ক ছিলেন, তাদের মধ্যে আমরা যাকে বন্দুক হাতে তড়পাতে দেখেছিলাম, তাকে দেখতে পেলাম ভিড়ের ফাঁকে। কেন এখনও পুলিশ এল না, তার জন্য তিনি চৌকিদারকে ধমকাতে শুরু করে দিয়েছেন। তার জিজ্ঞাসা, “এরপর নকশালরা এসে যদি গ্রাম আক্রমণ করে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়, তারপর পুলিশ আসবে আগুন নেভাতে?” তারপর চৌকিদার আর গ্রামের হোমরা-চোমরাদের কয়েকজন কী আলোচনা করল, জানি না। চৌকিদার এসে আমাদের দু’জনের কোমরে দড়ি বেঁধে তাঁর সঙ্গে যাওয়ার হুকুম দিলেন। স্কুলবাড়ির থেকে আমরা পথে পথে নামলাম। আমাদের পেছন পেছন বিপুল জনতার ‘মিছিল’। সামনেই ছিল স্কুলের ছাত্রদের একটি হোস্টেল। সেই হোস্টেলের ছেলেরা বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে ‘মিছিল’-এ এসে যোগ দিল। আমি তখন চলতে চলতে আবৃত্তি করে চলেছি, “জেগে ওঠো ছাত্র, জাগো যুব জনতা। তোমরাই নিয়ে যাবে মুক্তির বারতা”। সে মিছিল এসে থামল মাটির তৈরি একটা দোতলা বাড়ির উল্টোদিকে দু’টো লম্বা গাছের নিচে। সরু গাছ দুটোর একটার সঙ্গে আমাকে বেঁধে দেওয়া হল, অন্যটার সঙ্গে হরিপদকে। আমাদের ঘিরে গ্রামের লোকজন।
এখনো জনতার থেকে অনবরত অনুরোধ আসছে বক্তব্য রাখার, কবিতা শোনাবার। আমিও রাজনৈতিক প্রচারের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত – যার যত কবিতা মুখস্ত ছিল, একে একে আবৃত্তি করে গেলাম। সব বলতে বলতে যখন থামার ক্লান্তি অনুভব করলাম, ধুতি ও গেঞ্জি পরা একজন মধ্যবয়স্ক লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “জল খাবেন একটু?” আমি তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে চারপাশের লোকজন বলে উঠল, “উনি আমাদের গ্রামপ্রধান গো”। সামনের ওই মাটির দোতলা বাড়িটা তো ওনারই। জানলাম, উনি স্কুল মাস্টার। আবার ওই দোতলা বাড়ির বাইরের দিকে একচালা মাটির বারান্দায় একটা বিশাল তালাবন্ধ কাঠের বাক্স সম্বল পোস্ট আপিসের তিনি পোস্ট মাস্টারও।
(চলবে)
ছবি – প্রতীকী
