আমাদের ‘ধান্দা’ বুঝে উঠতে গ্রামবাসীদের বেশি অসুবিধে হওয়ার কথা নয়!

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৪তম পর্ব

ছাতা পড়া ও দুর্গন্ধযুক্ত বালিশটা মাথায় দিয়ে শুতে আমার কিছুতেই ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু, “পায়ে কাদা না মাখলে বিপ্লবী হওয়া যায় না” – মাওয়ের এরকম একটা কথা যেন কোথায় একটা পড়েছিলাম। অগত্যা হাতের ঘড়িটা খুলে ব্যাগে রেখে চালার একটা খুঁটিতে পোঁতা পেরেকে ব্যাগ দু’টো ঝুলিয়ে শয্যা নিলাম দু’জনে। ছেলেটা ড্যাবড্যাব করে আমাদের দেখছিল। কমলদা ফুঁ দিয়ে কেরোসিন তেলের লম্ফটা নিভিয়ে দিয়ে বেঞ্চে শয্যা নিলেন। নিমেষে সকলের চোখে ঘুম নেমে এল।

(গত পর্বের পর)

রাত্রি শেষে ঘুম ভাঙতেই মনে হল, এখানে তো মাঠেঘাটে পায়খানা সারতে হবে। সুতরাং, এক্ষুনি উঠে পড়া ভালো। হরিপদকে ঠেলে তুলতে যাব, দেখি মাটিতে শোয়া ছেলেটি সেখানে নেই। আর নেই খুঁটিতে ঝোলানো আমাদের ব্যাগদু’টোও। কমলদাকে জাগিয়ে তুলতেই তিনি হৈচৈ শুরু করে দিলেন। কঞ্চি দিয়ে তৈরি দোকানের দরজাটা একপাশে খুলে পড়ে আছে। ব্যাগদু’টি নিয়ে ছেলেটা হাওয়া!

কমলদার চেঁচামিচিতে অনেক লোক জুটে গেল। এধার ওধার খোঁজাখুঁজি চলতে লাগল। আমাদের ‘মালপত্তর’ ব্যাগটা যে হাওয়া হয়ে যায়নি, তার জন্য সান্ত্বনা দিল কয়েকজন। আমাদের অবস্থা তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। টাকা পয়সা যা কিছু সব ওই ব্যাগ দু’টোয় ছিল। আর সবচেয়ে ভয়ের, আমাদের ছোরা এবং বইপত্র ওই ব্যাগেই রাখা ছিল। আমাদের ‘ধান্দা’ কী তা বুঝে উঠতে বেশি অসুবিধে হওয়ার কথা নয় গ্রামের লোকজনদের। কী যে হবে এবার! 

কমলদা ফিরে এসে জানাল, ভোরের নৌকোয় একটা জোয়ান ছেলেকে চাপতে দেখেছে একজন দোকানদার। বোঝা গেল, ছেলেটা আমাদের ‘কলিক পেন’ তৈরি করে নিজে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। 

অতঃপর কিংকর্তব্য! আমরা দোকানে মালপত্র সাজিয়ে বসলাম। এখান থেকে ফাঁকে গলে পালিয়ে যাব, তার কোনো উপায় নেই। একে তো একটা পয়সাও নেই সঙ্গে। তার ওপরে রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না। সুতরাং, মুখভার করে দোকান সাজিয়ে বসা ছাড়া আর উপায় কী!

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলা জমে উঠল। ‘দৈব ওষুধ’ নেবার জন্য হুড়োহুড়ি। তেলেভাজা পাঁপড়ের ম ম গন্ধ। ভেঁপু বাঁশি, বেলুন নিয়ে বাচ্চাদের ছোটাছুটি। বাঁশের ঝুড়ি, কাঠের পিঁড়ে লোকের হাতে হাতে। কমলদার চায়ের দোকানে ভিড় বাড়তে লাগল। সেই সকাল থেকে দোকানের সামনে কয়েকটি লোক তাস খেলা শুরু করেছিল। কিন্তু তাদের আর খেলা শেষ হয় না। এক দল যায় তো আরেকদল এসে বসে। আর যারাই আসে তারাই আমাদের কী কী চুরি গেছে তা জিজ্ঞাসা করে। এধরনের ঘটনা এখানকার মেলায় কখনো ঘটেনি বলে সান্ত্বনা দেয়। আমরা মুখ ব্যাজার করে রাখি। আর যা লোকে খোঁজে অথচ আমাদের সঙ্গে নেই, তার লিস্ট তৈরি করি।

ধীরে ধীরে মেলায় সন্ধে নেমে আসে। সংকীর্তনের সুর ভেসে আসে। মেলা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য লোকজনের ঠেলাঠেলি। আমাদের দোকানে কিন্তু তখনও ভিড়। বেঞ্চি দখল করে বসে আছে সাত-আটজন। এছাড়াও গোটা আট-দশজন লোক ভিড় করে কী যেন বলাবলি করছে। কমলদার গরম জলের ডেস্কিতে জলের টগবগ শব্দ, কাঁচের গ্লাস ধোওয়ার ঠুনঠুন ব্যস্ততা। এমন সময়…

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia