
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৩তম পর্ব
ক্যানিং থেকে বহু লোক ওঠে নৌকোয়। সাতজেলিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ নদীপথের স্থানে স্থানে নৌকো ভেড়ে। লোকজন মালপত্র নিয়ে ওঠানামা করে। নদীর পার মাটি দিয়ে উঁচু করা। জল তার অনেক নিচে। নৌকো থেকে দু’পারের গ্রাম প্রায় দেখাই যায় না। ভেড়ির ওপর দিয়ে লোকজন, ভ্যানরিক্সা চলাচল করতে দেখি। বয়স্ক নারী ও কুমারী মেয়েরা জাল বা কাপড়ের ফাঁদ তৈরি করে চিংড়ি মাছের ‘মীন’ ধরে। মা-দিদিরা জল ঝেড়ে ‘মীন’ তুললে ছোটো ছেলেমেয়েরা মাটি বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে জলের কিনারায় নেমে আসে। পাত্র বাড়িয়ে দেয়। তারপর একটা বড়ো হাঁড়িতে ‘মীন’গুলো রেখে আবার কখন নামতে হবে, তার অপেক্ষায় থাকে। মাঝে মাঝে খড়ের চাল ও মাটির দেওয়ালের ঘরবাড়ি একবার দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। নৌকোটা আমাদের বেশ বড়ো। অনেক যাত্রী। তাদের খিদে মেটানোর জন্য কয়েকজন ঘুগনি মুড়ি চানাচুর বিক্রি করছিলেন। দাঁড়ে বসা মাঝি সুর সাধছিলেন মাঝে মাঝে।
(গত পর্বের পর)
অবশেষে বিকেলে আমাদের নৌকো সাতজেলিয়ায় এসে পৌঁছুলো। কিছুটা হেঁটে আমরা গেলাম কমলদার বাড়িতে। একটা চৌকি ও লম্বা বেঞ্চি রয়েছে দোকানে। মাটির একটা বড়ো উনুন গোবরলেপা সুন্দরী হয়ে আগামীকালের জন্য যেন প্রস্তুত হয়ে আছে। কেউ কেউ যাতায়াতের পথে কমলদার সঙ্গে কুশলবার্তা বিনিময় করলেন। আমাদের পরিচয় নিলেন।
আগেরবার যখন এসেছিলাম, তখন গ্রামের এপ্রান্তে কমলদার দোকান ছাড়া অন্য কোনো দোকানপত্র নজরে পড়েনি। এবার দেখলাম গ্রামীর রাস্তার দু’পাশে প্লাস্টিক ত্রিপলের চাঁদোয়া টাঙানো অনেক দোকান ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ এখনও খুঁটিগাঁড়ায় ব্যস্ত। যে দৈব ওষুধদানকে কেন্দ্র করে এই মেলা, সেই স্থানটিকে কলাগাছ পুঁতে, কলাগাছের খোল কেটে নানা কারুকার্য করে সাজানো হয়েছে। ভিড় সামলাতে রাস্তার মাঝখান থেকে ঐ দৈব স্থান পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে যাওয়া ও ফেরার রাস্তা দু’ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
কমলদা এর মধ্যে বাড়ি গিয়ে আমাদের জন্য দু’বাটি মুড়ি হাতে করে নিয়ে এলেন। আমরা মুড়ি খেয়ে দোকনটাকে কমলদার নির্দেশমতো গোছগাছ করে নিলাম। পসরা কোথায় সাজাব সেটা ঠিক করে কাছেরই একটা টিউবওয়েল থেকে আমরা হাত-পা ধুয়ে এলাম। আমরা এখানে কমলার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আমার নাম ঠিক হল রবিন দাস। আমার বন্ধুর নাম হরিপদ দাস। আমরা দু’জনে কলকাতার বেহালা অঞ্চলে একটা কারখানায় কাজ করতাম। কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বৃত্তি নিয়ে আমরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াই। কমলদার উৎসাহে দু’জনার এই মেলায় আসা।
এখানে আসার সময়ে আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম দু’টো বড়ো চটের ব্যাগ – যাতে ছিল আমাদের দোকানদারির মালপত্র। আর দু’জনারই কাঁধে ছিল দু’টো ঝোলাব্যাগ। যাতে আমাদের কাপড়জামা, দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা ছিল। আমার ব্যাগে একটা ডায়রি, যার মধ্যে লেখা আছে আমার রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তা, কয়েকটি কবিতা। আর ছিল কিছু মার্কসবাদী পুস্তিকা, একটি ইংরেজিতে লেখা রাজনৈতিক উপন্যাস এবং দু’জনারই কোমরে সুকৌশলে লুকোনো ছিল একটি করে ছোরা। আমরা যে সশস্ত্র বিপ্লবের রূপকার! তাই কেউই আমরা ‘নিরস্ত্র’ অবস্থায় থাকতাম না।
রাতে কমলদা আমাদের জন্য বাড়ি থেকে ভাত আর ডিমের ঝোল নিয়ে এল দু’টি থালা করে। তিনি বাড়ি থেকে খেয়েই এসেছেন। আমাদের বললেন, আগামীকাল ভোরে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাবেন এবং সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। সকালের চা-মুড়ি কমলদার বাড়িতেই জুটবে।
চারদিকের বাঁশ ঠোকাঠুকির শব্দ ও লোকজনের চিৎকার চেঁচামিচি রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এল। আমরা খাওয়া শেষ করে মন্ত্রণা করছি, রাতে চৌকিতে তিনজন কে কী করে শোব। এই সময়ে চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়স্ক একটা ছেলে দোকানে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করলে, “তোমাদের দোকানে রাতের মতো একটু শুতে দেবে গো?”। কমলদা এগিয়ে গিয়ে তাকে বোঝালেন, “আমাদের ওই চৌকি ও বেঞ্চি ছাড়া শুতে দেবার আর জায়গা নেই। সুতরাং তুমি অন্য জায়গা দেখ”। কোথায় গেলে ঠাঁই মিলতে পারে, তা নিয়ে কথা বলতে বলতে কমলদা ছেলেটার সঙ্গে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা দু’জন ঠিক করলাম, ঝোলা দু’টোকে বালিশ করে ওই ছোট্ট চৌকিতে দু’জনে কোনো রকমে রাতটা কাটিয়ে দেব। কমলদা শোবেন ওই বেঞ্চিটায়।
আরও পড়ুন
মণি নদীর তটও ভেঙে গেল…
কমলদা মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এলেন, ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়েই। বগলে তিনটে তেলচিটচিটে বালিশ। এদিকে আমারা যে যার ব্যাগ কাপড়জামা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে সেট করে নিয়েছিলাম। কমলদা বললে, “না! কোথাও ওর জন্য একটু জায়গার বন্দোবস্ত করতে পারলাম না। ও আমাদের এখানেই শোবে, মাটিতে গামছা পেতে”। আমাদের দু’জনকে দু’টো বালিশ দিয়ে ও নিজের জন্য একটা বালিশ বেঞ্চে সেট করে বললেন, “ব্যাগদু’টো এ জায়গায় ঝুলিয়ে রেখে বালিশ মাথায় দিয়ে শোও দু’জনায়”। ছেলেটা কমলদার বেঞ্চের পাশে মাটিতে গামছা পেতে দিব্যি শুয়ে পড়ল। ওর নাকি অনেক দিন ধরে পেটে ‘কলিকের পেন’ কিছুতে ছাড়ছে না। এখানকার দৈব ওষুধে যদি কিছু হিল্লে হয়, তার জন্য আসা।
ছাতা পড়া ও দুর্গন্ধযুক্ত বালিশটা মাথায় দিয়ে শুতে আমার কিছুতেই ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু, “পায়ে কাদা না মাখলে বিপ্লবী হওয়া যায় না” – মাওয়ের এরকম একটা কথা যেন কোথায় একটা পড়েছিলাম। অগত্যা হাতের ঘড়িটা খুলে ব্যাগে রেখে চালার একটা খুঁটিতে পোঁতা পেরেকে ব্যাগ দু’টো ঝুলিয়ে শয্যা নিলাম দু’জনে। ছেলেটা ড্যাবড্যাব করে আমাদের দেখছিল। কমলদা ফুঁ দিয়ে কেরোসিন তেলের লম্ফটা নিভিয়ে দিয়ে বেঞ্চে শয্যা নিলেন। নিমেষে সকলের চোখে ঘুম নেমে এল।
(চলবে)
