গুন্ডারা ইরানের বাড়ি আক্রমণ করল আমার খোঁজে

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৯তম পর্ব

ইরানের পরিবারের সঙ্গে তারপর থেকে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠল। ওই ভাঙা ঘরের ভিটেতে ছেঁড়া চাটাইয়ের ওপর শোয়া। কাঁচা লঙ্কার তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া এবং রাতে ভাঙা ভুট্টা সেদ্ধ ভাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। নতুন মানুষ হয়ে উঠলাম আমি। 

সুন্দরবন অঞ্চল তখন এসইউসি, সিপিএম এবং আরএসপি-র রাজনৈতিক বিচরণক্ষেত্র। আমি মণির তট যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এসইউসি ও সিপিএমের সংঘর্ষে এক সিপিএম কর্মী নিহত হন। ইরান আমাকে সেই নিহত ব্যক্তির বাড়ি নিয়ে যায়। তাঁর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আমার পরিচিতি গড়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক রেষারেষির যা অবস্থা, ঠিক হয়, দিনের বেলা আমি কোথাও ঘোরাঘুরি করব না। 

প্রতিদিন সন্ধেবেলা ইরান এখানে সেখানে বৈঠকের বন্দোবস্ত করে। আমি তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা করি রাত পর্যন্ত। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হল অন্যত্র। ওই সব গ্রামের দিকের লোকেরা যে যাকে ভোট দেয়, সে নিজের পরিচয় দেয় সেই পার্টির লোক হিসেবে। সুতরাং তারা প্রত্যেকেই কেউ এসইউসি, কেউ সিপিএম বা কেউ আরএসপির লোক। স্বাভাবিকভাবেই আমি তাদের সঙ্গে কী আলোচনা করি, তা নেতৃত্বের কানে পৌঁছে যেতে বেশি সময় লাগে না। 

আমি সারাদিন ওদের বাড়ির লাগোয়া একটি ছোট্ট খড়ের চালাওয়ালা ঘরে শুয়ে শুয়ে বই পড়ে দিন কাটাই। ইরানের একটি ছোটো বোন আমার দরজা পাহারা দেয় আর ছাগল চড়ায়। একদিন ইরান বলে, একটু দূরের একটা গ্রামে তার যোগাযোগ হয়েছে। কয়েকজন যুবক আমার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়। তারা ঠিক বিকেলেই অন্য কোনো জায়গায় চলে যাবে। তাই সকালেই যেতে হবে তাদের কাছে। অগত্যা দিনের বেলাই আমাকে রাজনৈতিক অভিযানে বেরোতে হয়। 

ইরানের সঙ্গে সেই গ্রামে গিয়ে দেখি, যাদের সঙ্গে আলোচনার কথা, তাদের একজন আত্মীয় মারা গিয়েছে। তারা সকলেই কবর দিতে গিয়েছে। ইরানও থেকে যায় ওখানে। আমাকে বলে, “যে পথে আমরা এসেছি, সেপথে তুমি বাড়ি ফিরে যাও সোনাদা। আমি একটু পরে যাব”। আমি আবার পিছনের দিকে হেঁটে অবশেষে ছাগলচরানি ছোট্ট বোনের পাহারায় ফিরে আসি।

একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে যাচ্ছি, এমন সময়ে বেড়ার দরজা ঠেলে হুরমুর করে এসে ঘরে ঢুকল ইরানের মা। আমাকে দু’হাত ধরে টেনে বাড়ির পেছনের ধানখেতের দিকে পাগলের মতন নিয়ে গেলেন। একটা ছোট্ট ডোঙার ওপর চট বিছিয়ে আমাকে সেটার ওপর শুয়ে পড়ার কড়া নির্দেশ দিলেন। তার ছোটো ছেলেকে বললেন, “এক্ষুনি ধানখেতের ভেতর দিয়ে ওকে নিয়ে কোথাও চলে যা। এসইউসির গুন্ডারা ওর খোঁজে আমাদের বাড়ি আক্রমণ করতে আসছে”। আমি ডোঙার ওপর শুয়ে পড়ি। ধানগাছের পাতারা আমার গায়ের ওপর সুড়সুড়ি দিয়ে সরে যায়। তার ফাঁক দিয়ে আমি মাঝেমাঝে আকাশ দেখতে পাই আর শুনতে পাই অনেক মানুষের চিৎকার। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia