মণি নদীর তীরে গ্রাম – ‘মণির তট’

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৮তম পর্ব

এরপর আমার পক্ষে আর হটনগরে থাকা সম্ভব হয়নি। এ-গ্রাম সে-গ্রাম ঘুরে ফিরে দিন কাটাই। তারপর একদিন সমীরদা আমাকে মণির তটে নিয়ে গেলেন। 

রায়দিঘি যাবার পথে বিষ্ণুপুর থেকে সাত-আট মাইল দূরে কেষ্টপুর বাজার। সেখান থেকে আবার মাইল ছ-সাতেক হেঁটে গেলে রুগ্ন-শীর্ণ মণি নদী। নদী পার হয়ে ওপারে গেলে উঁচু ভূমিতে গ্রাম মণির তট। সেই গ্রামের এক প্রান্তে বসবাসকারী ইরান নামের একটি ছেলের সঙ্গে সমীরদার আলাপ ছিল। এবার ঠিক হল, আমি ইরানদের বাড়িতে থেকেই ওই এলাকায় আমার বিপ্লবী কাজকর্ম গড়ে তুলব। ওরা গরিব দিনমজুর কৃষক। বুড়ো বাবা-মা আছে। আর আছে ছোটোভাই, বড়দা ও মেজদা। আলাদা সংসার দু’জনের। ইরান তার বৌ আর কচি কচি ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপ-মায়ের সঙ্গে থাকে। বাবা-মা থাকেন একটি উঁচু দাওয়াওয়ালা মাটির ঘরে। ইরানের ঘর ছোট্ট, বাঁশের বেড়া দেওয়া। বাড়ির বাইরে ধানখেত ও রাস্তার পাশে একটি তিনদিক খোলা একচালা ঘর। ঘরের মেঝে আর রাস্তার উচ্চতার মধ্যে ফারাক প্রায় কিছুই নেই। সেই ঘরে আমার ঠাঁই হল। 

আমার পরিচয় দেওয়া হল ইরানের মাসতুতো ভাই বলে। নাম সোনা আলি। কলকাতার বেহালায় একটা কারখানায় নাকি আমি কাজ করতাম। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানের মাসি তার বোনের গ্রামে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে খেতমজুরি করে দু’পয়সা ঘরে আনার জন্য। 

সেই গ্রামে, সেই ঘরে প্রথম রাতের কথা আজও আমার মনে আছে। চারদিকে জল আর মাথা উঁচু করা সবুজ ধানগাছ। গায়ে কাদা শুকিয়ে মিশকালো হয়ে পড়া ইরানের উদোম ছেলেপুলে আর ছোটো ভাইবোনেরা আমার সঙ্গে ছেঁড়া চাটাইয়ের ওপর এসে শুয়ে পড়ে। শুতে না শুতেই হাত-পা ছড়িয়ে ঘুম। এদিকে আমার তো কিছুতেই ঘুম আসে না। অনবরত নানা ধরনের পোকা-মাকড় আমার ওপর অভিযান চালাচ্ছে। আকাশে উঁকি মারছে মেঘে ঢাকা চাঁদ। ব্যাং-এর ডাক আর ঝিঁঝি পোকাদের আর্তনাদ। দূরে কোথায় শেয়াল ডেকে উঠল। আমার চোখে ঘুম আসে না। এধার ওধার খালি ছটফট করি। 

কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল বাড়ির কথা, মা ও দাদা-বৌদির কথা, ভাইপো ভাইঝিদের কথা। পার্ক সার্কাসে যে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ইউনিয়নের অফিসে আমি অফিস সেক্রেটারির কাজ করতাম – সেই অফিস, ভাঙাচোরা টাইপ মেশিন এবং ইউনিয়নের প্রধান বয়স্ক সেক্রেটারি সুরেশ গাঙ্গুলির কথা। মনে হচ্ছিল, এভাবে সবকিছু ছেড়ে আমার চলে আসাটা একেবারে ঠিক হয়নি। ইচ্ছে হচ্ছিল এখনই বাড়ি ফিরে যাই। 

এই অবস্থায় আমার মনে হঠাৎ ভেসে উঠল মাও সেতুং-এর একটা আহ্বানবাণী। অসংখ্য কমরেড আমাদের এই বিপ্লবের জন্য ইতিমধ্যে জীবনদান করেছেন। আর আমার এমন কী স্বার্থ আছে, যা আমি ত্যাগ করতে পারছি না, আমাকে ক্রমাগত পিছু টানছে? মুহূর্তে আমার মনের একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেল। নিজের প্রতি কেমন একটা ধিক্কার জন্মাল। আমি ঠিক করে ফেললাম, যত কষ্টই হোক না কেন, আমি বিপ্লবের ক্ষেত্র ছেড়ে কোথাও আর ফিরে যাব না। 

(চলবে)

Developed by DXDasia