
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৭তম পর্ব
রাত ন’টার মধ্যে একে একে প্রায় সবাইকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হল। কেউ ট্রেনে ফিরে গেলেন, কেউ গড়িয়া অভিমুখী বাসে পারি দিলেন। কিন্তু একটা কেলেংকারি বাঁধিয়ে বসলেন সমীরদা। গড়িয়া যাবেন বলে তিনি ভুলে জয়নগর-ডায়মন্ড হারবারগামী বাসে চেপে পড়লেন।
একমাত্র আমার সঙ্গে রয়েছেন কেসি বা কানাই চ্যাটার্জি। তাঁকে নিয়ে কী করব ভাবছি, তখন নজরে পড়ল পুলিনবিহারী সর্দার, আমাদের একজন সহযোদ্ধা, তাঁর ট্যারা চোখ নিয়ে এধার-ওধার কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। পুলিনের বাড়ি ছিল দক্ষিণ বারাসতে। প্রথম দিকে ‘দক্ষিণ দেশ’ ছিল তার সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি গ্রামীণ পত্রিকা। তার সঙ্গে গড়িয়ার কয়েকজনের রাজনৈতিক হৃদ্যতার পরিণতিতে ‘দক্ষিণ দেশ’ আমাদের গোষ্ঠীর পত্রিকা হয়ে ওঠে। সম্পাদক হিসেবে পুলিনেরই নাম থাকে।
আমি যখন হটনগরে উপস্থিত হই, তখন পুলিনও সেখানে রাজনৈতিক সম্পর্কে আসাযাওয়া করত। সঙ্গে থাকত তার স্ত্রী ও দুই ছেলে। বৌ-এর নাম ছিল করুণা। আমি নাম উল্টে তাকে ‘নারুক’ বলে ডাকতাম। পুলিন, তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে একদম গ্রামীণ-চরিত্র সম্পন্ন সাধারণ মানুষের মতো ঘুরত ফিরত আমাদের সঙ্গে। একটা চোখ ট্যাঁরা ছিল ওর।
পুলিন সে রাতে আমাকে ও কেসি’কে উদ্ধার করে কিছুদূরের এক গ্রামে তার আত্মীয়র বাড়িতে নিয়ে তোলে। রুটি আর গুড় দিয়ে তৈরি চা খেয়ে রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে ভোরের গড়িয়াগামী বাসে তুলে দিলাম কেসি’কে। আমি ও পুলিন জয়নগর আর মথুরাপুরের মাঝে জগাইয়ের এক আত্মীয়, সম্ভবত মামার বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। দিনটা কাটিয়ে সন্ধে নাগাদ দু’জনে বেড়িয়ে পড়ি।
পিতরকে ‘অ্যাকশান’ করার পর যে লিফলেট গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো পুলিনের ব্যাগেই থাকত। জানি না, কী করে সে সময় আমাদের দু’জনের মধ্যে দুঃসাহস ঠাঁই করে নিয়েছিল। আমারা সেদিন রাত গভীর হতেই সেই লিফলেট নিয়ে হটনগর ও তার আশেপাশের গ্রামের দুয়ারে দুয়ারে ছড়িয়ে দিই। ভোর হওয়ার আগেই সম্ভবত দক্ষিণ বারাসতে পুলিনদের মাটির বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম।
আরও পড়ুন
শাবলের এক ঘায়ে ‘খতম’ হয়ে গেল চৌকিদার
হটনগরে বিপ্লবী সংগঠন ও সংগ্রাম গড়ে তোলার ইতি ঘটে গেল সেদিনই। কলকাতার কালীঘাটে থাকত আমাদের পরিচিত এক সাংস্কৃতিক কর্মীর বোন। ওই মহিলা কমরেডের সঙ্গে দেখা হতে সে জানাল, কেসি সেবার কলকাতায় ফিরে লোকজনকে বলেছেন, সেই রাতে আমাকে দেখে নাকি তাঁর মনে হয়েছিল, আমি ভয় পেয়ে কেমন নাকি কুঁচকে গিয়েছি।
ছবি-প্রতীকী
(চলবে)
