গান গাওয়া মামাকে ভাগনি দেখছে আর যেন হেসে গড়িয়ে পড়ছে

হাতে কলমে শিখছি ধান রোওয়া

খগেনদা ওরফে সমীরদা পরদিন ভোরে উঠেই আবার কলকাতা চলে গেল। সমীরদা ‘দক্ষিণদেশ’ গোষ্ঠীর নেতৃত্বের একজন। দায়-দায়িত্বও অনেক। কিন্তু, আমার সমীরদাকে জিজ্ঞেস করা হল না, আমি কবে আমাদের ‘ঘাঁটি’ অঞ্চলে যাব, আমাকে কতদিন থাকতে হবে এখানে, আমাকে এখানে কী কাজ করতে হবে এখন – এমন অনেক কিছুই।

যা হোক, সকালে চা গিলে মাঠে চললাম ওস্তাদের সঙ্গে। জমিতে কাদা করা হয়ে গিয়েছে। এক কোণে আলের ওপর জড়ো করা আছে বীজধানের চারা। সেখান থেকে দু’তিনটে বীজধানের চারা গুচ্ছ করে হাতে নিয়ে এরই মধ্যে উপুড় হয়ে ধানগাছ রোওয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে কয়েকজন কৃষক। ওস্তাদ ধানখেতে এক পা জলে আমাকে নিয়ে নেমে পড়ল। গুচ্ছ বীজ চারা কী করে ধরতে হয়, কী করে জলে হাত ডুবিয়ে মাটির ভেতর রুয়ে দিতে হয় লাইন করে, শিখিয়ে দিয়ে কাজ শুরু করে দিল। অন্য একজন চাষি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ কাকে নিয়ে এলি রে ওস্তাদ?” ওস্তাদ বললে, “আমার মাসির ছেলে গো। কলকাতার কাছেপিঠে থাকে। ভাত খায়, জানে না, কী করে ধান হয়, ধান থেকে কী করে চাল হয়। তা আমি বললুম, চ’ আমাদের গাঁয়ের বাড়িতে। ক’দিন থাক। আমি তোকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে দেব। গত পরশু রাতে এসেছে। আজ মাঠে কাজে লাগবার সময় ওকে সাথে নিয়ে এলাম। হাতে কলমে শিখুক একটু!”

কর্মরত আরেকজন কৃষক তাকে জিজ্ঞাসা করল, “তা তুমি তোমার কাজে হাওড়া আর যাচ্ছ না?”

ওস্তাদ জানাল, “কোনো অর্ডার না থাকায় কারখানা আজ এক হপ্তা হয়ে গেল বন্ধ হয়ে রয়েচে গো কাকা। তাই মাঠে কাজ করে রোজগারের ধান্দায় দেশ-বাড়িতে চলে এলাম। আরে বুঝলে না কাকা, আমাদের তো মাত্র দু’টো লেদ মেশিন। মালিককে নিয়ে আমরা চার জন ওই মেশিন দিয়ে অর্ডার অনুযায়ী মাল তৈরি করে সাপ্লাই দিই। মালিক নিজেও কাজ করেন, আবার, অর্ডার সংগ্রহে, টাকা আদায়েও বের হয়ে যান আমাদের কাঁধে দায়িত্ব চাপিয়ে”।

আমি ধান রুয়ে চলেছি। কোমর টনটন করছে। একবার কোমর টান করতে উঠে দাঁড়ালাম। চেয়ে দেখলাম, ওস্তাদ ও অন্যান্যদের রোওয়া কী সুন্দর লাইন লাগিয়ে হচ্ছে, আর আমার রোওয়া কেমন যেন ছন্নছাড়া! ওস্তাদ আমার হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, “ ও সব ঠিক হয়ে যাবে সনাতনদা। আজ তো প্রথম দিন। তারপর লোকে দেখবে, ধান রোওয়ায় তুমি এক্কেবারে ‘আর্টিস’ হয়ে গ্যাছ”।

আমি লজ্জা পেয়েছি বুঝে ওস্তাদ আমাকে আলে বসে একটু বিশ্রাম নিতে বলে নিজে আবার রোওয়া শুরু করল। একটু দূরে আরেক খণ্ড জমিতে একজন কিসানি ধান রুইছিল। ওখান থেকেই ও চেঁচিয়ে বলে উঠল, “একটা গান ধর গো ওস্তাদ মামা, সেই গানটা, ‘বড়ো লোকের বেটি লো…’”

ওস্তাদ হেসে চিৎকার করে বলল, “তোর দেখি বড়ো লোকের বেটি হওয়ার খুব শখ যমুনা!” তারপরই উদাত্ত কণ্ঠে তার অনুরোধের গানটি গাওয়া শুরু করে দিল। আগে রোওয়া কুমারী ধান গাছের পাতাগুলোকে দুলিয়ে দিয়ে যমুনার কাছে পৌঁছে যেতে থাকল সেই গান

আমি দেখতে পাই, গান গাওয়া ওস্তাদ মামাকে ভাগনি দেখছে আর গান শুনে যেন হেসে গড়িয়ে পড়ছে। রং কালো, সুঠাম চেহারা। দূর থেকেও মেয়েটাকে কী সুন্দর লাগছে! 

(চলবে) 

Developed by DXDasia