
জগাইয়ের সঙ্গে আমি মাঠের কাজে যাব
ছবি-সংগৃহীত
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি আকাশ একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার। চারদিকে রোদ ঝলমল করছে। ওস্তাদের বিধবা মা, একটু ভারিক্কি চেহারার মানুষ, পরনে সাদা পাড়হীন শাড়ি – ঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন। ওস্তাদের বাড়ির সামনেই চার-পাঁচটা একই রকমের কুঁড়ে ঘর। সবাই ওস্তাদের আত্মীয়-স্বজন। সব ঘরেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নানা কাজে ব্যস্ত। বাচ্চারা হৈ চৈ করছে। ওস্তাদের বৌ পুকুরে বাসন মেজে ধুয়ে সেগুলো ঘরের দাওয়ায় রাখতে গিয়ে অপরিচিত আমাকে দেখতে পেয়ে লজ্জায় ঘোমটা টেনে ঘুরে দাঁড়াল।
খগেনদা বলল, “ওকে দেখে লজ্জার কোনো কারণ নেই গো। ও আমারই এক রকম ভাই। ক’দিন এখানে থাকবে বলে এসেছে। ওর নাম সনাতন। তোমরা ওকে সোনা বলে ডেকো’খন”।
ওস্তাদের মা ঝাঁটা রেখে হাত ধুয়ে কাপড়ের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে বলল, “জগাই গতকালই বলেছিল, ‘আগামীকাল আরেকজন দাদা আসবে গো মা। খগেন ডাক্তার বলেছে, উনি নাকি খুব ভালো লোক’। তা কাল কত রাতে এসে পৌঁছলে তোমরা?”
খগেনদাই উত্তর দিল, “বৃষ্টিতে এক্কেবারে ঝুপসে গিয়ে রাত এগারোটায় এসে পৌঁছেছি মাসিমা। তখন আর জাগাইনি”।
ওস্তাদের ভালো নাম জগাই। ও ভালো গান গায় বলে গাঁয়ের লোকে ওকে ‘ওস্তাদ’ বলে ডাকে। হাওড়ার দাসনগরে একটি ছোট্ট কারখানায় লেদ মেশিনের কাজ করে। এখন অর্ডারের খুব টান বলে কারখানায় খুব কম দিনই যেতে হয়। অন্য দিনগুলিতে ও ধান চাষে ‘জন’ হিসেবে কাজ করে।
খগেনদা ওস্তাদের বৌ ফুল্লরাকে বলে, “কই গো ফুল্লরা, উনুন ধরাবে কখন?” ফুল্লরা লজ্জায় মুখ ঢেকে উঠোনের মাঝখানে উনুনের দিকে ছুটল। কেরোসিন লম্ফ জ্বালিয়ে নিয়ে দু’টো কাঠ দিয়ে উনুন জ্বালাবার তোরজোর শুরু করল। কাঠ জ্বললে উনুনে একটা হাঁড়ি করে জল বসিয়ে দেয় ও। ছোটো বড়ো ক’টা স্টিলের গেলাসে গুড় দিয়ে আমাদের চা তৈরি হয়ে যায়। মাসিমা এক টুকরি মুড়ি এনে আমাদের সামনে রাখেন।
চা খাওয়া শেষ হলে ওস্তাদের বৌ ফুল্লরা ইশারায় ওস্তাদকে ঘরের ভেতর ডাকে। কিছুক্ষণ পর ওস্তাদ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খগেনদাকে বলে, “একটু চাল কেনার বন্দোবস্ত করতে হবে গো খগেনদা!” খগেনদা ঘরে ঢুকে জামার পকেট হাতরে ক’টা টাকা এনে জগাইয়ের হাতে দেয়। সেদিন দুপুরে কচি সজনে পাতার শাক আর খেসারি ডাল দিয়ে পেট ভরে খাওয়া হল। ঠিক হয়, আগামীকাল ভোরে জগাইয়ের সঙ্গে আমি মাঠের কাজে যাব। জগাই আমাকে হাতে করে ধান রোওয়া শিখিয়ে দেবে।
(চলবে)
