
দেশে বিপ্লবী অবস্থা ভীষণভাবে পেকে উঠেছে
বিপ্লবের আবেগ আমাদের স্কুল-কলেজ ছেড়ে, চাকরি-বাকরি ছেড়ে, ঘর-বাড়ি ছেড়ে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়বার আহ্বানকে কার্যকর করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। চারু মজুমদার আহ্বান করেছিলেন, “সেরা কমরেডরা গ্রামে চলুন”। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন পার্টির বহু মানুষ, বিশেষ করে ছাত্র-যুবরা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তেমনি আমরা যাঁরা তাঁর রাজনীতির বিরোধী ছিলাম, তাঁরাও অনেকে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিলাম নিজ নিজ রাজনৈতিক সংগঠনের আহ্বানে। যেমন, চারু মজুমদারের স্বপ্ন ছিল বিশ শতকের সত্তর দশকের মধ্যে ভারত বিপ্লবকে সম্পন্ন করে ফেলা। দেশে বিপ্লবী অবস্থা ভীষণভাবে পেকে উঠেছে। এখন ভারতীয় বিপ্লবীদের প্রাথমিক প্রধান ও কেন্দ্রীয় কাজ, সশস্ত্র সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভারত বিপ্লবকে সফল পরিণতিতে পৌঁছে দেওয়া। এ সময় নানা অর্থনৈতিক সংগ্রাম, ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রাম, নানা ধরনের গণসংগ্রামে কমরেডদের সময় ও সামর্থ্য নষ্ট করা চলবে না। সশস্ত্র সংগ্রামই বিপ্লবে অনুসরণীয় বিপ্লবী পদ্ধতি। ব্যক্তিগতভাবে জোতদার, জমিদার, অত্যাচারী বদবাবু ও পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর লোকজনকে হত্যা করার নামই শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, গেরিলা সংগ্রামের বিস্তৃতি। শত্রুর রক্তে হাত রাঙাতে না পারলে কেউ বিপ্লবী হতে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
আরেকটি বিষয়ে এক্ষেত্রে আলোচনা করাটা জরুরি বলে মনে হয়। বিষয়টি হল চিন, চিনা পার্টি এবং মাও সেতুং প্রসঙ্গে। বিপ্লবপূর্ব চিনের সামাজিক অবস্থা ও আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থা প্রায় এক ছিল। সেক্ষেত্রে চিনা বিপ্লবের শিক্ষা আমাদের কাছে বহু বিষয়ে শিক্ষণীয় ছিল নিঃসন্দেহে । মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি মূলত গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে দখল করে, দখলিকৃত গ্রামগুলো দিয়ে শহরকে ঘিরে ফেলে অবশেষে শহরগুলোকে দখল করে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করেছিল। কৃষিপ্রধান দেশে চিনা বিপ্লবে কৃষকরাই ছিল বিপ্লবের মূল বাহিনী। বিপ্লবী যুদ্ধের মূল কৌশল ছিল গেরিলাযুদ্ধ।
আমাদের দেশে বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল আমরা যা রচনা করেছিলাম (আমরা বলতে, আমাদের নেতৃত্ব), তা প্রায় চিনা বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের নকল। প্রায় ৪৯/৫০ সাল আগের চিনের সমাজব্যবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে রচিত কর্মসূচিতে আমরা ওই ৫০ বছর পরের ভারতবর্ষের অবস্থার সঙ্গে হুবহু এক করে বিবেচনা করলাম। চিনের বাস্তব অবস্থায় সংগ্রাম চালাতে গিয়ে মাও সেতুং তাঁর অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে যে লেখাপত্র লিখেছেন, আমরা সেগুলোকেই আমাদের দেশের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় প্রয়োগে নিয়ে যেতে চাইলাম। মাও সেতুং হয়ে উঠলেন আমাদের নেতৃত্বের একমাত্রা আরাধ্য ‘দেবতা’ – তাঁর শিক্ষাকে হবহু বেদবাক্যের মতো অনুসরণ করতে চাইলাম। চারু মজুমদার তো ভারত ও চিন যেন প্রায় এক ভূখণ্ডে অবস্থিত বলে মনে করতে লাগলেন। তাই বললেন, চিন রাশিয়া বা আমেরিকা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, তাই আমাদের দেশে বিপ্লবের কাজকে ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি নিজেকে বললেন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ভারত শাখার একজন সদস্য। আর বললেন, চিনা পার্টির চেয়ারম্যান আমাদেরও চেয়ারম্যান।
অথচ, তখনকার চিনা পার্টিতে প্রবল শ্রেণিসংগ্রাম চলছে। চিনা পার্টি যা বলছে, যা প্রচার করছে, তার মধ্যে কখনও মাও চিন্তার আধিপত্য, কখনও বা পুঁজিবাদের পথের পথিকদের চিন্তা দ্বারা পরিপুষ্ট। কখনও বা লিনপন্থী এবং কখনও ‘বাম’ লাইনের পৃষ্ঠপোষক। আমরা কিন্তু, চিনা পার্টি কোনো ভুল করতে পারে না – এ বিশ্বাসে বিহ্বল। তাই, চিনা পার্টির সপ্তম কংগ্রেস যখন চিনা পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান, মাওয়ের উত্তরসূরী হিসেবে লিন পিয়াও-এর নাম ঘোষণা করল, তখন বর্তমান প্রতিবেদক ওই কাজকে ‘মার্কসবাদী যুক্তি’তে অত্যন্ত সঠিক বলে এক ‘প্রামাণ্য’ লেখা লিখে ফেলেন ‘দক্ষিণ দেশ’-এ! হায়, এই লিন পিয়াওই ক্যুদেতার মাধ্যমে মাওকে হত্যা করে চিনের পার্টি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলে চক্রান্ত করে ব্যর্থ হয়ে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ রাশিয়ায় পালাতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হলেন। এখন ভাবলে মনে হয়, আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে কী পরিমাণ বাল্যখিল্য বোধই না তখন কাজ করেছিল। অন্ধ অনুকরণ বা দাসত্বের মনোভাব ছিল আমাদের মজ্জায় মজ্জায়।
(চলবে)
