একটা কাদামাখা দেহকে পুলিশ টেনে হিঁচড়ে জিপে তুলছে

হঠাৎ গুলির আওয়াজ, সঙ্গে সঙ্গে একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল ডোবায়

ট্রেন এগিয়ে আসতে লাগল ঘুস ঘুস করে। আমরা দু’জন লাইনে দাঁড়িয়ে লাল পতাকা দোলাচ্ছি। দূরে রেলগেটে মানুষ ভিড় করে দেখছে – কী হয়! কী হয়! রেল এসে ঘুস ঘুস করে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেবুদার হাতে নুরুল ইসলামের ছবিটা দিয়ে আমি মিসকালো ইঞ্জিনটার গা বেয়ে উপরে উঠে লাল পতাকা দুলিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, “ইন…কিলাব”! চতুর্দিকে জবাবের ঢেউ উঠল, “জিন্দাবাদ”! এবং দেখলাম স্রোতের মতো বিপুল ধারায় চারপাশ থেকে শয়ে শয়ে লোক আটকে থাকা ট্রেনের দিকে ছুটে আসছে – ট্রেনটা ঘিরে ফেলেছে অসংখ্য কালো মাথা! চারদিকে একটা যুদ্ধজয়ের আনন্দ। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” আর “শহিদের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ” স্লোগানের উদ্দীপনা। আমি ইঞ্জিন থেকে নেমে এলাম। ইঞ্জিন ড্রাইভার বললেন, “কোনো চিন্তা করবেন না, আমি সমস্ত স্টিম ছেড়ে দিচ্ছি, পুলিশের বাবার সাধ্য নেই ট্রেনকে টেনে নিইয়ে যায়”!

বিপ্লব কাকে বলে তা জানি না। বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে বড়ো হচ্ছি। কিন্তু বিপ্লব যে কীভাবে জনগণের কাছে উৎসব হয়ে উঠতে পারে, তা চাক্ষুষ করে বিহ্বল হয়েছি। আমরা দু’জন সলতেতে আগুন দেবার কাজটি করেছি শুধু, তারপরের সব কাজের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন জনগণ। আটক যাত্রীদের স্নান খাওয়ার ব্যবস্থা থেকে অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা পর্যন্ত সব দেখভাল করছে সাধারণ মানুষ। গয়লারা বড়ো বড়ো ট্যাংক করে দুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই দুধের ট্যাংক তাঁরা তুলে দিলেন জনগণের হাতে।সেই দুধ গরম করে শিশুযাত্রীদের খাওয়াবার ব্যবস্থাও করে ফেললেন তাঁরা। বৈদ্যবাটি স্টেশন জুড়ে তখন গণভোজনোৎসব! কিছু ছেলে বাঁশের মাচায় অতুল্য ঘোষ ও প্রফুল্ল সেনের কুশপুত্তলিকা শুইয়ে “বলো হরি, হরি বোল, দুই শালাকে কাঁধে তোল” স্লোগান দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা শুরু করে দিয়েছে।

ট্রেন পাহারা দেবার জন্য দু’পাশে লাইন দিয়ে যে পুলিশেরা দাঁড়িয়েছিল, আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা টিফিনের প্যাকেট কেউ দেখতে না পায় – এভাবে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। পেট ভরে খাইয়েছিল ট্রেনের ড্রাইভার ও গার্ড ইত্যাদিরও। এর সবটাই সংগঠিত হয়েছিল গণ-উদ্যোগে। আমাদের পার্টির সক্রিয় ভূমিকা ছিল খুব কমই।
অবশেষে স্টেশনে রাত্রি নামল। যাত্রীদের নিজ নিজ কামরায় দরজা বন্ধ করে থাকতে বলে আমরা পুলিশের গ্রেপ্তারি এড়াতে গা ঢাকা দিলাম। পরের দিন ভোরে এসে দেখলাম, মিলিটারি দিয়ে ট্রেনটাকে নিইয়ে গেছে। রেল গেট খোলা। লরি যাতায়াত করছে। মাঝে মাঝে যাতায়াত করছে ট্রেনও।

স্বাভাবিকভাবে আমরা স্বস্তি অনুভব করছিলাম। লরির ড্রাইভারদের ধমকাচ্ছিলাম। ধারালো ছুরি দিয়ে টায়ার ফাঁসিয়ে দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম। রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে আসাম রাইফেলসের ডজনখানেক সদস্য রাইফেল কাঁধে নির্বাক হয়ে আমাদের দেখছিল। দোকানপাট খুলবে কি খুলবে না ভাবাভাবি চলছিল। হঠাৎই আমার পেছনে আসাম রাইফেলসের কিছু সদস্য তেড়ে এল। আমি ডানপাশের গলিটা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের আরেকটা গলি দিয়ে ছুট লাগালাম। আমার পেছনে কে একজনও আমাকে অনুসরণ করে ছুটছিল। তারও পেছনে রাইফেলধারীরা।

হঠাৎ গুলির আওয়াজ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি আমার পেছনের ছেলেটি আমার ডানপাশের একটা ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। কে পড়ল, কীভাবে পড়ল – আমার তখন দেখার অবকাশ নেই। পেছনে পুলিশ। আমি ছুটছি, প্রাণপণ ছুটছি। 

ছুটতে ছুটতে বড়ো রাস্তায় গিয়ে পড়লাম। আমি পথ চলতি সাধারণ মানুষের মতো হেঁটে চললাম জিটি রোডের দিকে। একটা পুলিশ জিপ আমার পাশ দিয়ে জিটি রোডের দিকে ছুট লাগালো। আমি যখন জিটি রোডে এসে পৌঁছুলাম, তখন দেখি একটা কাদা মাখা দেহকে তিন-চারজন পুলিশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে জিপে তুলছে। আমি জিটি রোড টপকে পাশের পাড়ায় ঢুকে মাঠে এসে থামলাম। আরও কয়েকজন বন্ধু আমাকে দেখে পাশে এসে বসল। কার গুলি লাগল, কে মরল, আমরা কেউ ভেবে পাচ্ছিলাম না। একটা অব্যক্ত বেদনা আমাদের গ্রাস করেছিল। 

(চলবে)

Developed by DXDasia