অবাধ খুন, লুঠতরাজ, দাঙ্গার মধ্যেই আবার শুরু হল শ্রমিক আন্দোলন

ভাটার শেষে জোয়ার

ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষের পরিণতিতে সারা ভারত জুড়ে কমিউনিস্ট বিরোধী অপপ্রচারের যে ঢেউ উঠেছিল, তাতে অনেকেই ভেবেছিল, ভারত থেকে কমিউনিস্টরা এবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কমিউনিস্ট পার্টিকে আর এদেশে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে না। এর ওপর কমিউনিস্টদের মধ্যে ভাঙাভাঙি কমিউনিস্ট বিরোধী ও শাসক-শোষক মহলকে উল্লসিত হতে সাহায্য করেছিল।

কিন্তু ওই শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক দৃশ্যপটের দ্রুত পরিবর্তন দেখা দিল। টাকার অবমূল্যায়ন ঘটল। নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতার ঢেউ। ১৯৬৪ সালের ২৭ মে নেহরু মারা গেলেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন আগেই শুরু হয়েছিল, ভাঙল শুরু হল এবার প্রায় সব দলেই, কংগ্রেসেও। কংগ্রেস ভেঙে দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হল – আদি কংগ্রেস ও নব কংগ্রেস। চিন-ভারত যুদ্ধের ধাক্কায় উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে গেল বহুগুণ। খাদ্যদ্রব্যে স্বয়ম্ভরতা তো দূর অস্ত, দেখা দিল বিপুল ঘাটতি – মার্কিন গম সরাসরি রেশন দোকানে এসে ঢুকতে লাগল। সরকার দাম বেঁধে দিতে চাইল। ধনী চাষিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল তাতে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ভেঙে গড়ে উঠল আঞ্চলিক দল – বাংলা কংগ্রেস, জনতা কংগ্রেস ইত্যাদি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংঘাতে সামাজিক শ্রেণিগুলো চঞ্চল হয়ে উঠল। দেশজুড়ে দেখা দিল ছাত্র-বিক্ষোভ। শিক্ষাক্ষেত্রে অশান্তি তীব্রভাবে বেড়ে চলল। ছাত্র অবাধ্যতা দমন করতে রাষ্ট্র সহিংসভাবে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ, এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম এবং তার উপরে চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব সারা বিশ্বের ছাত্রসমাজের সাথে এদেশের ছাত্রসমাজকেও বেপরোয়া করে তুলল। গতানুগতিক আন্দোলনের পথ ছেড়ে তারা হয়ে উঠল নতুন দিশার অন্বেষক। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার চৌহদ্দি ছেড়ে গোটা সমাজ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সাধনে তা দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। ছাত্র-শ্রমিক আন্দোলনে এল নতুন জোয়ার।

এরই মধ্যে ঘটল ভ্রাতৃঘাতী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। দাঙ্গা বাঁধল প্রথমে এপার বাংলার মালদাতে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ল ওপার বাংলার রাজশাহীতে। আমরা হলাম দিশাহারা। বেলঘরিয়ায় দুর্বৃত্তদের দলবদ্ধ আক্রমণে ১৯ জন শ্রমিক মারা গেলেন। মোহিনী মিলসের মুসলমান শ্রমিকদের উপর রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হল। দ্বিধাবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ব্যর্থ হল। প্রাণহানির সঙ্গে চলল অবাধ লুঠতরাজ। সংখ্যালঘু গৃহহারা মানুষদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যেতে লাগল। “দিন আনি দিন খাই” মানুষদের পাশে দাঁড়াবার লোক খুঁজে পাওয়া বেশ ক’দিন খুব কঠিন ছিল। কিন্তু সমাজে কিছুই অপরিবর্তনীয় নয়। কিছুকালের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা কলুষিত পরিবেশে শ্রমিক আন্দোলনে নতুন প্রাণের সাড়া জেগে উঠল। জয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার সাত হাজার শ্রমিক ছিয়ানব্বই দিন ধরে ধর্মঘট চালিয়ে গেল হিন্দু-মুসলমান শ্রমিকদের ঐক্য অম্লান রেখে। জয়ার শ্রমিকদের সমর্থনে সমগ্র ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প সাধারণ ধর্মঘট পালন করে সৃষ্টি করল নয়া ইতিহাস। কর্মচারী আন্দোলনও মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো – পালিত হল দেশব্যাপী দাবিদিবস। জীবনবিমা কর্মচারীগণের বিক্ষোভ মিছিলে পথঘাট বন্ধ হয়ে গেল। পুলিশের লাঠি, ধর্মঘটিদের ওপর ডিআই রুল প্রয়োগ, গ্রেপ্তার, ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা – কোনো কিছুই শ্রমিকদের দমাতে পারল না। অবশেষে জয়ার শ্রমিকদের আন্দোলন জয়যুক্ত হল। সাম্প্রদায়িকতার বিষ-বীজাণুকে নাশ করে পশ্চিমবাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলন আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াল।

মানুষের সংগ্রাম এরপর আরও বিস্তৃতি লাভ করল দেশের বুকে আকালের ছায়াপাতে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হুহু করে বাড়তে লাগল। অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি মানুষ সাম্প্রদায়িক সমস্যাকে দূরে ঠেলে সরিয়ে খাদ্য ও ন্যায্য মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাবিতে “দাঙ্গা নয়, শান্তি চাই, সস্তা দরে খাদ্য চাই” শ্লোগানে পথ কাঁপিয়ে মিটিং মিছিল করতে লাগল দিকে দিকে। এরই সাথে উঠল জেলবন্দি হাজারো কর্মীর মুক্তির দাবি – চারপাশে খাদ্যের দাবি ও বন্দিমুক্তির দাবিতে জনসভা, কনভেনশন ইত্যাদি হতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের এই আন্দোলনের সাথে শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলন যুক্ত হওয়াতে খাদ্য আন্দোলনে বেগ সঞ্চার হল। শ’য়ে শ’য়ে হাজারে হাজারে মানুষ মিছিল-সমাবেশে যোগদান করতে লাগল। কারখানায় কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট নৈরাজ্যের পরিবেশকে পাল্টে দিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে সংগ্রামী উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলল।

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia