কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ অর্জন ফস্কে গেল

ছোটোবেলা থেকেই বুকে বাসা বেঁধেছিল কমিউনিস্ট হওয়ার বেগমান ইচ্ছে

চিন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের কালপর্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রথমে ভাঙন, তারপর ভাগাভাগি চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করল। ক্রুশ্চেভের লেজ ধরে দুনিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের একদিকে ভিড় করল শান্তিপূর্ণ পথে বিপ্লব তথা সংসদীয় গণতন্ত্রের ভাবনায় প্লাবিত রুশপন্থী কমিউনিস্টরা। অন্যদিকে ক্রুশ্চেভপন্থায় আস্থাহীন চিনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাওসেতুঙের নেতৃত্বে বিপ্লবকামী কমিউনিস্টরা। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্পষ্ট দু’ভাগ দেখা দিল। রুশপন্থীরা এক ভাগে, অন্য ভাগে সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থাহীন চিনাপন্থীরা।

পরিবেশ পরিস্থিতির দ্বারা প্রাণিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমি কমিউনিস্ট অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষের লোক হয়ে গিয়েছিলাম। সোভিয়েত রাশিয়া এবং চিনের মতো আমাদের দেশটাও ‘কমিউনিস্ট দেশে’ পরিণত হোক সেটাও ছিল আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত কামনা। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে প্রকাশিত কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় কত বই কত সস্তায় সে সময়ে পাওয়া যেত, তেমনি বাংলা ভাষায়ও। আমি এবং আমরা অনেকেই সে সমস্ত বই বগলে নিয়ে ঘুরতে গর্ব অনুভব করলাম। যদি তাত্ত্বিকভাবে সেগুলো বুঝতে পারতাম খুব কম ক্ষেত্রেই। 

আমার এক জেঠতুতো ভাই উনিশশো চল্লিশ দশকের শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। সেই ছেলেবেলায় আমি দেখতাম, সেই দাদা লুকিয়ে-চুরিয়ে আমাদের বাড়ি আসতেন। মা, কাকিমা, জেঠাইমারা সে দাদা বাড়ি আসলেই তাঁকে লুকিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে আমাদের বাড়িঘরের পেছন দিয়ে তাকে পার করে দিতে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। মা’র কাছে সেই ছোটোবেলায় জেনেছিলাম, আমার ঐ দাদা নাকি গুপ্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পুলিশ ওদের মতো লোকজনকে দেখলেই নাকি ধরেবেঁধে নিয়ে যায়, গুলি করে মারে। আমি সেই বয়সেই আমার দাদার মতো হয়ে ওঠার কেমন একটা আকুলতা অনুভব করতাম। ভারত রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হবার পর আমাদের রাম ব্যানার্জি লেনের বাড়িতেও তিনি কয়েকবার এসেছিলেন। তাঁর কাছে জেনেছিলাম, কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা নাকি খুব কঠিন। কঠিন কমিউনিস্ট চিন্তাভাবনাকে বুঝতে পারা এবং আরও কঠিন সেই চিন্তাভাবনা অনুযায়ী শ্রমিক-কৃষক-গরিবগুর্বো মানুষদের মধ্যে কাজ করা, তাদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা। কথাগুলো যে তখন খুব আত্মস্থ করেছিলাম, তা দাবি করতে পারব না। কিন্তু মনের মধ্যে তাঁর মতো কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা এবং কমিউনিস্ট জীবনযাপন করার একটা বেগমান ইচ্ছে তখন থেকেই আমার বুকে বাসা বেঁধেছিল। 

চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ ও কমিউনিস্ট আন্দোলন দু’ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আমি বগলে নিয়ে ঘোরা বইগুলোকে এবার সত্যি সত্যি পড়তে ও বুঝতে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতাম – আমাকে একজন কমিউনিস্ট হয়ে উঠতেই হবে, সে জন্য শ্রমিক কৃষকের মধ্যে কাজ করতে হবে, লড়াই করতে শিখতে হবে, প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকতে হবে।

এমনি সময়ে হুগলি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে দু’জন কমরেড আমার খোঁজে আমাদের বাড়ি এসে হাজির হলেন। পার্টিতে তখন সংসদীয় পথ না বিপ্লবের পথ, সে নিয়ে কিন্তু ভাগাভাগি সম্পূর্ণ হয়ে যায়নি। ওনারা এসেছিলেন যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে। তাঁরা কেমন করে জেনে গিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আমি নাকি মার-টার খেয়েছিলাম। জেলেও ছিলাম কয়েকমাস। তাঁরা পার্টি নিয়ে আমার আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথাবার্তা বললেন। আমাকে গোটা তিনেক রাজনৈতিক বই পড়তে দিলেন। তার মধ্যে একখানি ছিল এমিল বার্নসের ‘মার্কসবাদ’, আরেকটি ছিল পার্টি সংগঠন সম্পর্কে লেনিন-স্তালিন-মাওসেতুং ইত্যাদির কয়েকটি রচনার সংকলন।

তাঁরা চলে গেলে আমি বইগুলো নেড়ে-চেড়ে দেখে পরে পড়ব বলে রেখে দিয়েছিলাম। তবে পড়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। মাসখানেক বাদে সেই কমরেডরা আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এবং আমাকে পার্টি সদস্যপদ অর্জনের একটা ফর্ম দিয়ে তা পূরণ করে দিতে অনুরোধ করলেন। ফর্মটি পেয়ে “আমি এবার কমিউনিস্ট হয়ে যেতে পারব” বলে মনে মনে আনন্দে নেচে উঠেছিলাম, তেমনি মনে পড়ে গিয়েছিল আমার সে দাদার কথা, “কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা খুবই কঠিন কাজ, কঠিন কমিউনিস্ট ভাবনা-চিন্তাকে বুঝতে পারা, সেই ভাবনা-চিন্তা অনুযায়ী শ্রমিক-কৃষক-গরিব-গুর্বো মানুষদের মধ্যে কাজ করা”…ইত্যাদি। অথচ আমি তার কিছুই না করে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হবার যোগ্যতা অর্জন করে বসলাম! মন থেকে এইভাবে সদস্যপদ অর্জনকে আমি যেন আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।

চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এ অবস্থায় আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ‘অর্জন’-এর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। সারা দেশ জুড়ে তখন কমিউনিস্টদের ধরপাকড় চলছিল। আমার পূরণ করা ফর্মটি যে কমরেড নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক বই-কাগজপত্রের সাথে আমার সেই ফর্মটিও পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’-র চটজলদি সদস্যপদ আমার আর অর্জন করা হল না।

(চলবে) 

Developed by DXDasia