ভারত-চিন যুদ্ধে উত্তাল হয়ে উঠল ছাত্রসমাজ

বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ভাগ হয়ে গেল দু’ভাগে

তারপর দিন সাতেক আমি কলেজে যাইনি। একদিন বাড়ির ঠিকানায় একটা পোস্টকার্ড এল ডাকে। প্রিন্সিপাল আমাকে দেখা করতে বলেছেন। পোস্টকার্ডটি হাতে নিয়ে তাঁর ঘরে এসে ঢুকলাম। আমার দিকে চোখ পড়তেই তাঁর প্রশ্ন, “এ্যাতদিন কলেজে আসো নাই ক্যান?” আমি উত্তরে বললাম, “আপনিই তো আমাকে রাস্টিকেট করলেন”। প্রিন্সিপাল একেবারে কাঁচা বাঙাল ভাষায় বলে উঠলেন, “পুটকি পোড়া রাগ তো আছে ষোলো আনা। যাও ক্লাস কর গিয়া”। বাঙাল ভাষায় ‘পুটকি’ মানে পশ্চাৎদেশ। আমি স্যারকে পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সেদিন স্যার আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন নমস্কার করার সময়।

অনেক কাল পরে বর্তমানে আমি অমিতার খোঁজ পেয়েছি। অমিতা দুর্গাপুরে থাকে। ওর বর শয্যাশায়ী। নিজেও ক্যান্সারে আক্রান্ত। দুই মেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে দু’জনারই। মাঝে মাঝে মা-বার সঙ্গে দেখা করতে আসে ওরা। অমিতা আমাকে জানিয়েছিল, “শরীর ভালো না। আমরা দু’জনেই অসুস্থ। অংশুমালী পাটে বসেছেন। দিনান্তের ঘণ্টা শুনছি জীবনের ঘণ্টাতলায়। বাজছে খুব জোর সুরে। বড়ো গভীরতর অসুখ আমার”।

ফোনে কথা বলতে কষ্ট হয় অমিতার। তাই ফোনে কথা বলতে পারি না ওর সাথে। তবু কেন যেন ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করে। ওর চোখ দুটো এখন সম্ভবত ‘পাথরের মতো পরিম্লান’। ভাবতে ভীষণ কষ্ট হয়।

এই উত্তরপাড়া কলেজে পড়ার সময়েই (১৯৬১-৬২) ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষ বাঁধে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বিপথগামী করতে সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে ক্রুশ্চেভ তখন স্তালিনের নিন্দায় পঞ্চমুখ। শান্তিপূর্ণ পথে কমিউনিস্ট বিপ্লব সাধন তথা পার্লামেন্টারি পথে বিশ্বের ‘বিপ্লবী’ পরিবর্তন ঘটাবার গরম গরম পিঠে বিতরণ করে তিনি যশস্বী হয়ে উঠলেন। বিপরীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যথার্থ বিপ্লবী অভিমুখে নিয়ে যাবার মহান সংকল্প নিয়ে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বাধীন চিন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগ্রামী ধারাকে বহন করে নিয়ে যাবার দায় কাঁধে তুলে নিল। শান্তিপূর্ণ পথে বিপ্লবের ফেরিওয়ালারা শান্তির কপোত উড়িয়ে মাও সেতুং তথা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ‘রুশপন্থী’ ও ‘চিনাপন্থী’ হিসেবে সাধারণভাবে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বনেদি নেতৃত্ব তখন সংসদীয় রাজনীতির স্বাদ পেয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের অধিকাংশই রাশিয়ার সমর্থকে পরিণত হল। ওই নেতৃত্বের একটা অংশ নিজেদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ লাইন আঁকড়ে ধরে ‘রাশিয়াও ভালো, চিনও ভালো’ – এরকম একটা মধ্যপন্থী অবস্থান বেছে নিলেন। আর ব্যাপক কমিউনিস্ট কর্মীরা ভারত বিপ্লবকে সাফল্যমণ্ডিত করার আকাঙ্ক্ষায় চিনের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান বেছে নিলেন।

আমাদের মতো কর্মীরা বিপ্লবপন্থাকে বরণ করে চিনের সমর্থক হয়ে গেলাম। ভারতের শাসক শ্রেণি চিনের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার করে তুলতে ব্যর্থ হয়ে আমাদের ‘চিনাপন্থী’ ও ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ নামিয়ে আনল। উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ভারতভূমিকে গ্রাস করল। চিনের নাম করা মানেই দেশদ্রোহিতা – তাই কমিউনিস্টদের সংগ্রামী অংশের উপর নেমে এল পথে ঘাটে আক্রমণ – পুলিশি হামলা, গ্রেপ্তার। ‘চিনা বাদাম’ কথাটা উচ্চারণ করাও ছিল তখন দেশদ্রোহিতার নামান্তর, বলতে হত ‘মোমফালি’! আমরা, ছাত্র-যুব কর্মীরা, যারা চিনের নিন্দায় মুখর হতে চাইনি, স্বাভাবিকভাবে আমরা শাসক সরকার ও শাসক দলের হাত থেকে নিস্তার পেলাম না।

ছাত্র পরিষদের ছেলেরা হঠাৎ ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের থেকে কলেজে আমাদের বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা চালাতে লাগল মরিয়া হয়ে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে পেরে ওঠার মতো বুদ্ধি ও শক্তি, কোনোটাই তাদের ছিল না। তারা ‘চিনা হানাদারদের দ্বারা আক্রান্ত ও আহত ভারতীয় সৈনিকদের জন্য রক্তদান’ করায় আমরা কেন কোনো কর্মসূচি নিচ্ছি না – এ প্রশ্ন তুলে হল্লা তুলল। তাদের জব্দ করতে আমরা আমাদের কর্তৃত্বাধীন ইউনিয়নের তরফ থেকে প্রায় ছাব্বিশ’শো রক্তদাতার নাম পেশ করে জানালাম, আমরা রক্ত দিতে প্রস্তুত। প্রশাসকরা জানালো, এত রক্তদাতার রক্ত নেবার জন্য তাদের কোনো প্রশাসনিক কাঠামো নেই। আমরা এই খবর প্রচার করে তাদের ছাত্র পরিষদ নেতৃত্বের মুখ ভোঁতা করে দিলাম। 

(চলছে…) 

Developed by DXDasia