
এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে এল অশ্লীল কবিতা লেখার অভিযোগ
কিছুদিন পরে, কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব ছাত্র পরিষদের ছেলেদের মস্তানিতে বানচাল হয়ে গেল। মারামারি, লাঠালাঠি হল। ছাত্র-শিক্ষক সবাই এধার-ওধার দিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন। উত্তরপাড়া লাইব্রেরির মাঠে অনুষ্ঠানের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। গঙ্গার পাড়ে সেই মাঠ। আমাদের ছাত্র সংসদকে দেখাশোনার দায় যেই কলেজ শিক্ষকের ছিল, অনেকেই দেখল, তিনি গঙ্গার পাড় ধরে ভয়ে দৌড়চ্ছেন। ছাত্র ফেডারেশনের দেওয়াল পত্রিকা ‘অভিযান’-এর পরবর্তী সংখ্যায় এই নিয়ে কয়েকটি কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে একটা কার্টুনে ওই শিক্ষককে গঙ্গার পাড় দিয়ে দৌঁড়তে দেখা গিয়েছিল। আরেকটি কার্টুনে ছিল কলেজের অধ্যক্ষ বোরখা পরে বসে আছেন, কলেজের কোনো সমস্যাই তিনি সমাধান করতে ব্যর্থ।
‘অভিযান’ প্রকাশিত হওয়ার দু’চার দিন পরে বাংলার শিক্ষক রথীন চট্টোপাধ্যায় কলেজ করিডোরে আমাকে একপাশে ডেকে বললেন, “তোমার আঁকা ওইসব কার্টুনের কথা শুনে প্রিন্সিপ্যাল ভীষণ রেগে গেছেন। তোমাকে হয়তো ডেকে পাঠাতে পারেন। তৈরি থেকো”।
আমার একটা দীর্ঘদিনের অভ্যাস, পোস্টার, কার্টুন, প্রচ্ছদ – যা-ই আঁকি না কেন, আমি তাতে আমার নাম দিতাম না। ‘অভিযান’ পত্রিকাতেও সম্পাদক হিসেবে আমার নাম থাকত না। আমি তাই আমাদের ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী সমরেশ চট্টোপাধ্যায়কে ডেকে শিখিয়ে দিলাম, “আমাকে প্রিন্সিপ্যাল ডাকলে আমি বলব, পত্রিকার সম্পাদক তুই, ওনার যা বলার উনি যেন তোকে ডেকে বলেন”।
আমার ডাক পড়লে আমি যথারীতি কথাগুলো বললাম। প্রিন্সিপ্যাল সমরেশকে ডেকে পাঠালেন এবং পত্রিকার ওই কার্টুন সংখ্যাটি খুলে আনার হুকুম দিলেন। সমরেশ পত্রিকাটি খুলে এনে প্রিন্সিপ্যালের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উপর মেলে ধরল। তাঁকে ঘিরে বসে থাকা সেই শিক্ষকরা উপুড় হয়ে পরে কার্টুনগুলো দেখতে লাগলেন। সকলের সামনে বোরখা পরা অবস্থায় তাঁর কার্টুনটি দেখে প্রিন্সিপ্যাল তো রেগে লাল। সমরেশকে জিজ্ঞাসা করলেন, “অ্যাইগুলো কে আঁকছে?” আমাদের অধ্যক্ষ পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন এবং সব সময়েই বাঙালভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু সমরেশকে এ ব্যাপারে তো কিছু বলতে শেখানো হয়নি! সমরেশ শিল্পী হিসেবে গড়গড়িয়ে আমার নাম বলে দিল। অধ্যক্ষ রেগে উঠে বললেন, “এ্যাই তো কইয়্যা গেল হেয় কিছু জানে না!” তারপরই হুকুম হল আমাকে ডেকে আনার। আমি তাঁর ঘরের বাইরেই অপেক্ষা করছিলাম। না ডাকতেই ঢুকে গেলাম। তিনি আমাকে দেখা মাত্র রেগে একেবারে কাঁই। ফর্সা মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, “স্যার, আমি কার্টুনগুলো এঁকেছি বটে, কিন্তু তা আপনাকে অপমান করার জন্য নয়। আপনি আমার বক্তব্যটা একটু শুনুন”। অধ্যক্ষ বললেন, “রাখো তোমার কথা। সেইবার কী একটা অসভ্য কবিতাও তুমি একটা পত্রিকায় টাঙাইছিলা”। তারপর তাঁর আপ্তসহায়ক বীরেশ্বরবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বীরেশ্বরবাবু, কী যেন নাম মাইয়্যাডার? ডাকেন তো একবার মাইয়াডারে”। কয়েক মিনিটের মধ্যে অমিতাকে ডেকে আনা হল। স্যার তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী? কোথায় থাকো? গার্জিয়ান কে? এইসব ছাইপাঁস কী লেখো তুমি? আমি তোমার চরিত্রের খোঁজ নিমু?”
আমিতা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমি আর সহ্য করতে পারি না। আমি বললাম, “স্যার, কবিতা পত্রিকার সম্পাদক আমি। সে কবিতা প্রকাশের দায় দায়িত্ব আমার। আপনি যা বলার তা আমাকে বলুন। ওকে এসব কথা বলছেন কেন?”
অধ্যক্ষ টেবিল চাপড়ে বললেন, “কমুই তো। কী পাইছ তুমি তোমরা কলেজটারে? কলেজ কি বেন্দাবন, প্রেম করনের জায়গা?”
আমি বললাম, “স্যার আমরা ছাত্র আন্দোলন করি। ছেলে মেয়ে সবাইকে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। মেয়েদের সঙ্গে হেসে কথা বললেই প্রেম হয়ে যায়, সেটা আপনি ভাবতে পারেন, আমরা ভাবি না”।
স্যার বলে উঠলেন, “লজ্জা করে না তোমার, আমার মুখের উপর কথা কইতে? যাও তুমি এইখান থিকা। তোমারে আমি কলেজ থিকা রাস্টিকেট করলাম”।
আমি বললাম, “আমাকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয় স্যার। আপনি আমাকে তাড়িয়ে দিলে আমার পড়াশোনা হয়তো আর হবে না। তবে আমি কিছু অন্যায় করেছি বলে মনে করি না”। বলেই স্যারের পায়ে হাত দিয়ে ঢুকুস একটা প্রণাম করে আমি তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। অমিতাও চোখের জল মুছে ক্লাসে চলে গেল।
(চলবে)
