
বিয়ের সময় বামুনের ভুল মন্তরের কারণেই নাকি বাচ্চা হয়নি বৌদির
বৌদির ওপর রাগ করে বাবা সেই যে দেশে ফিরে গেলেন, জ্ঞান থাকতে আর এদেশে এলেন না। এলেন যখন, তখন বাবার কোনো জ্ঞান নেই। আমাদের দেশের বাড়ির টিনের চালের ওপর ঘর-সংসার পাতা লাউ গাছটা থেকে লাউ ও লাউ-ডাঁটা কাটতে উঠেছিলেন বাবা। কোনো কারণে সেই চালা থেকে তিনি মাটিতে পড়ে যান। হাত-পা তো ভাঙলোই, তার সঙ্গে সেই যে জ্ঞান হারিয়ে বসলেন, প্রাণ থাকতে সে জ্ঞান আর ফিরে পেলেন না।
যে মা এতদিন বাবার কর্তালিতে সংসারের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে টুঁ শব্দটিও করত না, সেই মায়ের ওপরই ওই দুঃসময়ে সমস্ত দায়-দায়িত্ব এসে পড়ল। জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাইদের সাহায্যে বাড়ি-ঘর-জমিজমা সব জলের দামে বিক্রি করে বাবাকে কোনোরকমে টানতে টানতে কলকাতায় আমাদের টেমার লেনের বাড়িতে এনে তুলল মা। আমরা নড়নচড়নহীন, বাকশব্দহীন শয্যাশায়ী বাবাকে নীরবে চোখের জল ফেলতে দেখলাম। দাদা যথাসাধ্য চেষ্টা করল বাবাকে ভালো করে তুলতে। এমনকি আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে প্রায়শ্চিত্তও করল বাবার। কিন্তু, তাতেও বাবার ‘পাপমুক্তি’ ঘটল না।
আরও পড়ুন
পালিয়ে ট্রেনে উঠতেই দেশ-ছাড়া চিরতরে
একদিন সকালে, দাদা কাজে চলে গেছে আর আমি দাদার নির্দেশে শয্যাশায়ী বাবার পায়ে একটা দুর্গন্ধযুক্ত কবিরাজি তেল মালিশ করছি। কাজটা যে আমার এতটুকুও ভালো লাগত, তা বলতে পারব না। বাবার আমার দিকে চেয়ে আছেন প্রায় পলক না ফেলে। গাল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি একহাতে বাবার পায়ে তেল মালিশ করছি আর অন্য হাতে বাবার পায়ের শেষ প্রান্তে কাঠের সেলফের নিচের তাকে মুড়ির টিনে হাত ঢোকাচ্ছি। উদ্দেশ্য— দেশ থেকে মায়ের নিয়ে আসা পাটালি গুড়ের এক টুকরো কোনোরকমে আত্মসাৎ করা। অজ্ঞানপ্রায় বাবাও আমার ওই বৃত্তিকে সহ্য করতে না পেরে গোঁ গোঁ করে উঠলেন। আমি টিন থেকে হাত বের করে বাবার কানের ওপর উপুড় হয়ে বললাম—ও বাবা, কী হইচে কও না! ইরকম করতে আছ ক্যান?
বাবা গোঙাতে গোঙাতেই দু’পাশের হাতদুটো তোলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। হাত দুটো ধপাস করে পড়ে গেল। মাথাটা একপাশে হেলে পড়ল। মুখ দিয়ে গ্যাঁজা বেরোতে লাগল। আমি চিৎকার করে উঠলাম—মা, বৌদি! দেখো বাবা কীরকম করতাছে!
বাবা-বৌদি-ছোটদি সবাই ছুটে এল চিৎকার শুনে। বাবার কী হয়েছে তা বুঝতে মায়ের দেরি হল না। সবাই মরা-কান্না কেঁদে উঠল। বৌদি আমাকে বলল—দৌড়াইয়্যা গিয়া তোর দাদারে ডাইক্যা আন।
হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই আমি তিনতলা থেকে রাস্তায় নেমে দৌড় লাগালাম। দাদা চিৎপুরে মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটি হাসপাতালে সকালে কাজ করত। আমাকে একদিন সেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল দাদা। স্মৃতিতে থাকা সেপথ ধরে আমি এঁকেবেঁকে ছুটতে লাগলাম। দাদা এল। নাড়ী দেখল এবং বলল—সব শেষ হইয়্যা গ্যাছে! চারদিক থেকে একটা সম্মিলিত কান্না যেন বাবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মৃত্যুশোক কাকে বলে তা অনুভব করার শক্তি তখন আমার ছিল না। সবাই কাঁদছে। সুতরাং আমারো কান্না পেল। আমিও কাঁদলাম।
কিন্তু, আমার সত্যি সত্যি কান্না পেল নিমতলা শ্মশানে বাবাকে দাহ করার সময়। ব্রাহ্মণ ঠাকুর আমাকে দাদার পিছনে পাটকাঠি আঁকড়ে ধরে বাবার চিতার চারপাশে কয়েকবার ঘুরিয়ে জ্বলন্ত পাটকাঠির মাথাটা বাবার মুখে তিনবার ছোঁয়াতে বললেন। দাদার চোখেও তখন জল। আমি বামুন লোকটাকে সহ্য করতে পারছিলাম না। সেই ছোটোবেলায় দেশের বাড়িতে থাকতে ঢিল মেরে এক বামুন ঠাকুরের মাথায় আলু ফলিয়ে দিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছে করছিল, শ্মশানের এই বামুন ব্যাটাকেও তেমনই কিছু করি।

আমাদেরই জেঠতুতো-খুড়তুতো দাদাদের একজন ছিল হেমাদা। হেমাদার বিয়ে হয়েছে অনেকদিন। বৌদিকে খুব সুন্দর দেখতে। তবে, বৌদিকে খুব কাঁদতে দেখতাম আমরা। হেমাদা আসলে বৌদিকে খুব মারধর করত। বৌদির দোষ— তার কোনো ছেলেপুলে হয় না। আর, সেই অপরাধেই পরিবারের প্রায় সকলের কাছ থেকেই প্রতিনিয়ত ধিক্কার শুনতে হয়। বাবা-মা অনেকদিন হেমাদাকে এই বিষয়ে উপদেশ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু, গোঁয়ারগোবিন্দ হেমাদা পারলে আমার বাবাকেই মারে।
আমার শৈশবের পরম আশ্রয় আর পরামর্শদাত্রী ছোটদিকে একদিন জিজ্ঞেস করি—হেমাদা বৌদিকে এমন মারে ক্যান? ছোটদি বলে- বৌদির ছেলেপুলে হয় না বলে। ‘ছেলেপুলে হয় না ক্যান?’ ছোটদির সোজা জবাব—‘বিয়ার সময় বামুনঠাকুর ঠিকমতো মন্ত্র পড়েন নাই হয়তো।’ ঠাকুরমশাইটা কে, আমার জানতে ইচ্ছে করে। ছোটদি বলে—‘আমাদের শনি-সত্যনারায়ণ পূজা-টুজা যিনি করেন, তিনিই তো ওই বিয়ার ঠাকুর ছিলেন।’
এই ‘সত্য’ উদ্ঘাটনের পর থেকেই আমি তক্কে তক্কে থাকতাম। বৌদির যত কষ্ট-কান্নার মূলে ওই ঠাকুর। একদিন দেখি বামুন ঠাকুর আমাদের বড়ো পুকুরের ঘাট থেকে কানে স্নান সেরে পৈতে লাগিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে উঠে আসছেন। আমি তাঁর মাথা লক্ষ করে ছুঁড়লাম একটা বড়ো মাপের ঢিল। ঠাকুরমশাই দেখতে পেয়েছিলেন ঘটনাটা কে ঘটিয়েছে। আমার নামে গাল দিতে দিতেই তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। আমি তখন এক পলকে উধাও!
কিছুক্ষণ পরেই ঠাকুরমশাই আমাদের ঘরের দুয়ারে এসে হাজির। ‘নব বাবু, ও নব বাবু’ বলে বাবাকে হাঁক পারেন। ঠাকুর মশাইয়ের পরনে ভেজা কাপড়। বাবা ঘরে এসে বসতে বললে, ঠাকুরমশাই বলেন—‘ঘরে আর ঢুকুম না। আপনের ছোটোপোলা ঢিল মাইর্যা আমার কপালের কী অবস্থা করছে দেখেন।’
আমার কবিরাজ বাবা ঠাকুরমশাইয়ের কপালের দিকে চেয়ে দেখেন, কপালটা আলুর মতো ফুলে উঠেছে। বাবা গম্ভীর গলায় আমায় ডাকলেন—‘নেপু’। আমি তখন রান্নাঘরে পান্তা গিলছিলাম। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাবার ঘরে পা দেওয়ার আগেই ভেজা কাপড়-পরা ঠাকুর মশাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝলাম এবার কী ঘটতে চলেছে!
বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন—‘ঠাকুরমশাইয়ের এই অবস্থা হইল ক্যামনে? তুই ওনার কপালে ঢিল মারছস?’ আমি চুপ করে থাকি। বাবা এবার বাঘের মতো গর্জন করে ওঠে—‘কী, সত্য কথা বলার সাহস নাই?’ আত্মসম্মান রক্ষা করতে আমি মাথা নিচু করে জবাব দিলাম—‘হ, আমিই ঢিল মারছি ওনারে!’
– ‘ক্যান ঢিল মারলি তুই এই বুড়া মানুষডারে?’
– ‘বিয়া দেবার সময় উনি ভুল মন্তর বলেন ক্যান?’
আমার জবাব শুনে বাবার চক্ষু তো চড়কগাছ। ‘গাল টিপলে দুধ বাইরয় পোলা ঠাকুরমশাই’র মন্তরের ভুল ধরে?’ বাবার মুখ-চোখ লাল হয়ে ওঠে। ওদিকে ঠাকুরমশাইয়ের টিকিও খাড়া হয় হয়! বাবা আমার চুলের মুঠি ধরে গালে এক চড় কষিয়ে বলেন—‘তুই কী কইর্যা কস যে উনি ভুল মন্তর বলেন বিয়া দিবার সময়?’ আমিও ঘাড় চিতিয়ে জবাব দিই—‘ভুলভাবে মন্তর পড়ছিলেন বইলাই তো হেমাদার বৌর কোনো ছেলে-পুলে হয় না। তার জন্য বৌদি প্রত্যেকদিন মাইর খায়!’
আরও পড়ুন
বাস্তুহারাদের বাস্তুশাপের গল্প
বাবার বোধহয় তৎক্ষণাৎ হেমাদার বৌয়ের অবস্থাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাকে দোষী ভাবতে যেন তাঁর মন চায় না। ঠাকুর মশাইকে বলেন—‘আপনে বাড়ি যান ঠাকুরমশায়। আমি দেখি অরে কি করণ যায়।’ ঠাকুরমশাই চলে যান। বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন—‘পান্তা খাওয়া শেষ হইছে পুরা?’ আমি বলি- ‘না’। বাবা বললেন- ‘যা খাইয়্যা আয়!’
‘বলো হরি, হরি বোল!’—সম্মিলিত চিৎকারে আমার স্মৃতিভঙ্গ হয়। বাবার চিতা নিভে আসছে। ডোমেরা ছাই ঘেঁটে একটা ছোটো মাংস-জড়ানো হাড় তুলে এনে দাদার হাতের মাটির সরায় তুলে দেয়। দাদা সেটা নিয়ে গঙ্গাজলে ভাসিয়ে দেয়। ব্রাহ্মণ ঠাকুর মন্ত্র পড়ে দাদাকে গঙ্গায় ডুব দিতে বলেন।
আমাকেও ডুব দিয়ে উঠতে হয়। আমাদের দুজনকেই পরে নিতে হয় একখণ্ড কোয়া কাপড়, গলায় নিতে হয় কাছা। তাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় একটা লোহার চাবি। এই গোটা ব্যাপারটা দেখে আমার খুব রাগ হতে থাকে। মনে মনে ভাবি—ছেলেবেলার সেই বামুন ঠেঙানোর মতো শ্মশানের এই বামুন-ব্যাটার কপালেও যদি একটা আলু ফলিয়ে দিতে পারতাম!
