
শহরের ছবিতে রং এবং একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ
“রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে/ রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে…”
গানটা শুনলেই বেশিরভাগ বাঙালির চোখের সামনে ভেসে ওঠে রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন-এর বসন্ত। কিন্তু লাল মাটির দেশ থেকে দূরে রবি ঠাকুরের জন্মের শহরে কালো পিচের রাস্তায় যাদের নিত্য যাতায়াত, শহুরে ধূসরতা যখন মনকে বলে “একটু সবুজে চোখ মুছিয়ে দে” বসন্তের শহর, তখন সেই নাগরিক ক্লান্তিকে শুষে নিতে নিজেকে সাজিয়ে তোলে সবুজ পাতা আর নানা রঙের ফুলের সমারোহে। কলকাতার ক্যাকোফনি এই ঋতুতেই হার মানে একটা সামান্য পাখির কাছে, যার কুহুতান নিতান্ত বেসুরো মানুষের মনকেও বাঁধে সুরের বাঁধনে, আর রসিক মনকে করে আরও উদাস।

বালিগঞ্জ চত্বরে ফুটে ওঠা কৃষ্ণচূড়া
আসলে বছরের শেষ ঋতুটা প্রতি বছরই সবার জন্য নিয়ে আসে বর্ষশেষের উপহার। তাই মহা সমারোহে ঋতুরাজের এই আগমন হেলায় হারিয়ে দেয় শহরের যান্ত্রিক জীবনকে। ইঁটের পাঁজর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা নতুন সবুজ পাতাটা জানিয়ে দেয় বছরভর লড়াই, দমবন্ধ করা কাজের চাপের পরেও প্রাণের স্বাভাবিক স্পন্দনের জয় হবেই।

টালিগঞ্জ অঞ্চলে গাছভর্তি বোগেনভেলিয়া, কাগজ ফুলও বলেন অনেকে
বসন্তের বিকেলে মন যখন একটু ছুটি চায়, যখন সব তাড়াকে দূরে সরিয়ে নদীর পাশ দিয়ে আলগোছে হাঁটতে ইচ্ছে করে, কিংবা ময়দান বা ঢাকুরিয়া লেক যখন আন্তরিক আমন্ত্রণ জানায় তাদের সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে, তখন সেই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য কারই বা থাকে? গাছে গাছে ফুটে থাকা অশোক, শিমূল যেন মনের ধুলো ঝেড়ে তাতে লাগায় নতুন রঙের প্রলেপ, আর আগুন রঙের পলাশ উস্কে দেয় যৌবনের আগুনকে, যে আগুন একইসঙ্গে প্রেমের আর বিদ্রোহের।
আসলে নতুন কিছু সৃষ্টির উৎসই তো পর্যাপ্ত তাপ। তাই শীতের শুরুতে অবাঞ্ছিত সব পাতা ঝরিয়ে প্রকৃতি অপেক্ষা করে সেই তাপের, যে তাপ জন্ম দেয় নতুন পাতার, নতুন ফুলের। আর শহর কলকাতা জানে ভালোবাসার উষ্ণতাকে কীভাবে গায়ে মাখতে হয়। তাই হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও যখন বিকেলে বন্ধুর ডাক পড়ে প্রিন্সেপ ঘাটে যাওয়ার জন্য, তখন মনছুট হয়ে যায় প্রায় সকলেরই, তাহলে এই শহর কি উপেক্ষা করতে পারে বসন্তের ডাককে? শুধু ময়দান বা ঢাকুরিয়া লেক কেন? সদা ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ও যখন লাল শিমূল গাছটা চোখে পড়ে তখন মন থমকে যায় ঠিক ওইখানেই, বিদ্যুতের লাল আলোর সিগন্যাল বিরক্তিকর ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করলেও পথিকের মনে অনুভূতিকে জমা করতে প্রকৃতির সিগন্যাল একেবারে অব্যর্থ। আবার রোজ কর্মক্ষেত্রের তাড়া নিয়ে লোকাল ট্রেনে শহরে আসা মানুষটি যেদিন জানলার পাশে বসার সুযোগ পায়, সেদিন ঠিক স্টেশনে ঢোকার আগে সে জানতে পারে শহরটা অতটাও রুক্ষ নয়, কারণ ওখানে রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া গাছ দুটো ফুলে ফুলে সেজে তাদের ডালপালা ছড়িয়ে স্বাগত জানায় তাকে, মনে জোগায় কাজ করার নতুন উদ্যম।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছে টাঙানো রয়েছে "এভাবেও ভালোবাসা যায়"

পাটুলির এক নার্সারিতে বসন্ত
বিশ্বায়নের পৃথিবীতে যখন ছুটে চলাই ধর্ম, তখনও প্রকৃতিতে ঋতু পরিবর্তন হয় নিজের নিয়মে। তবে শহরবাসীর সুযোগ হয় না সব ঋতুর সৌন্দর্য উপভোগ করার। বর্ষা এখানে জমা জলে বিরক্তির কারণ, শরতের কাশফুল ফোটার অবকাশ পায় না শহরের রাজপথের ধারে, হেমন্তের নতুন ধানের গন্ধও দূষণ ভেদ করে পৌঁছতে পারে না নাগরিক নাসারন্ধ্রে। শুধু, ঋতুরাজের রথ এখনও প্রতি আসে কল্লোলিনীর বুকে। তাই বছর শেষে ক্লান্ত নাগরিক এই কটাদিন নিত্য আশ্রয় পায় প্রকৃতির বুকে। বাঁচুক এই আশ্রয়, প্রকৃতির বুকে প্রাণ ভরে শ্বাস নিক শহরবাসী। রঙের মরশুমে আরও রং লাগুক কলকাতার বুকে, কলকাতা বাসীর বুকে।
____
প্রচ্ছদের ছবি: উইকিপিডিয়া, অতিরিক্ত ছবি: সুমন সাধু
