সিনেমা হলে বসে প্রেমেন মিত্তিরের সঙ্গে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখলেন শিবরাম চক্কোত্তি

শিবরাম প্রায়ই বলতেন, “প্রেমেনের মতো মিত্র হয় না”

এক বার, চাঁদনির ‘চাং ওয়া’য় বসে খাওয়াদাওয়া করছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শিবরাম ও আরও কয়েকজন। স্নেহের আবেগে জাপ্টে ধরে হঠাৎ হেমেন্দ্রকুমার প্রেমেনের গালে একটা চুমু খেয়ে বসলেন। শিবরাম লিখলেন, “গল্প না বৎস, না কল্পনা চিত্র / হেমেন্দ্র চুম্বিত প্রেমেন্দ্র মিত্র।” শিবরাম তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’তে লিখেছেন, “পৃথিবীতে বড় বয়সের বন্ধু বলে কিছু হয় না। বন্ধু হয়, সেই ছোটবেলায় স্কুল কলেজে পড়বার সময়। তার পর হয় এনিমি বা নন-এনিমি। এই নন-এনিমি দেরই আমরা বন্ধু বলে ধরি।” তবে, প্রেমেন মিত্তিরের বেলায় শিবরামকে প্রায়ই বলতে শোনা যেত, “প্রেমেনের মতো মিত্র হয় না।”

সেই মিত্র’র সঙ্গেই তাঁর বিশ্বভ্রমণের একটা খাসা গল্প আছে। গল্পই বটে! রোজ একটি করে সিনেমা না দেখলে নাকি খাবার হজম হত না চক্কোত্তি বাবুর। সিনেমা দেখতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রেমেন বাবুর। পরিচয়ের পরেই দু’জন মিলে ঠিক করেন বিশ্বভ্রমণে বেরোবেন।

মোটামুটি কোন কোন দেশ ঘুরতে যাওয়া হবে সব ঠিকঠাক, প্রতিদিন ব্রাডশ' নিয়ে বসছেন, মাথায় আর দ্বিতীয় চিন্তা নেই, প্রস্তুতি তুঙ্গে, এমন সময় মিত্তির বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কিন্তু এত দেশ যে ঘুরব দু’জনে টাকা কই?’’

চক্কোত্তি বাবু জোর গলায় বললেন, ‘‘আরে লাখ টাকার মামলা ঠুকেছি ভায়া। মামলাটা জিতলেই হাতে এসে যাবে লক্ষ লক্ষ টাকা। ধরেই নিন মামলাটা জিতে গেছি, শুধু রায় বেরোতে যে ক’দিন।’’

হ্যাঁ, সত্যিই শিবরাম সেবার এক বন্ধুর উপদেশে এক লাখ টাকার মামলা ঠুকেছিলেন তাঁর পৈতৃক সম্পত্তির দাবিতে। এমনিতে টাকাপয়সা, সম্পত্তির প্রতি কোনও দিনই তার আসক্তি ছিল না। নেহাত পেটে টান না পড়লে টাকার চিন্তাও করতেন না। পুরো জীবনটাই যেন তার কাছে ছিল একটা ঠাট্টা। সেই শিবরাম টাকার জন্য মামলা ঠুকলেন? এও কি বিশ্বাসযোগ্য!এই সুযোগে তাঁর পারিবারিক ‘হিস্ট্রি’ সংক্ষেপে বলে নেওয়া যাক। জমিদার বংশের উত্তরসূরী হয়েও বাউণ্ডুলেপনা ছিল তাঁর রক্তে। 

উত্তরবঙ্গের চাঁচোলের রাজা ঈশ্বরগুপ্তের দুই স্ত্রী সিদ্ধেশ্বরী আর ভূতেশ্বরী। রাজা দুই স্ত্রীকেই অপুত্রক রেখে দেহ রাখলেন। তখন সিদ্ধেশ্বরী দেশের থেকে নিজের বোন বিন্ধ্যেশ্বরীর ছেলে শিবপ্রসাদকে নিয়ে এসে তাকে দত্তক নিলেন। এই শিবপ্রসাদ চক্রবর্তীই হলেন শিবরামের বাবা। রাজসম্পত্তিতে আগ্রহ তৈরি হল না শিবপ্রসাদের। সংসারে থেকেও তিনি সন্ন্যাসী। আর মায়ের প্রতি শিবরামের ছিল আজীবনের গভীর ভালবাসা, তিনিও সারাক্ষণ আধ্যাত্মিক জগতেই থাকতেন।

বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করল ছেলেও। সংসারের প্রতি মায়া জন্মাল না শিবরামের। একেবারে অল্প বয়স থেকেই বারবার বাড়ি ছেড়ে বারবার পালাতো কিশোর শিবরাম। ফাঁকা পকেট নিয়েই  ট্রেনে চেপে বসে, যা হোক তা হোক করে, যেখানে খুশি যত দিন খুশি কাটিয়ে আবার সে ফিরে আসত বাড়ি। শিবরামের এহেন কাণ্ডকারখানার পরও নির্বিকার থাকতেন তাঁর বাবা-মা দুজনেই। এ ব্যাপারে ছেলেকে কখনই কিছু জিজ্ঞাসা করতেন না তাঁরা।

এমন পরিবেশে বড় হওয়ার জন্যই হয়তো টাকাপয়সা, সম্পত্তি, সংসার কোনও কিছুতেই মায়া জন্মাল না কোনও দিন। তারপর ওই কিশোর বয়েসেই একদিন পাকাপাকি ভাবে বাড়ি ছেড়ে শিবরাম পালিয়েছিলেন স্বয়ং দেশবন্ধু চিত্তররঞ্জন দাশের সঙ্গে। মোটামুটি এই হল তাঁর ‘হিস্ট্রি’।

এবার দেখা যাক শেষপর্যন্ত কী হল সেই ‘শিব্রামীয় মামলা’র।

শিবরামের বাবা সন্ন্যাস গ্রহণ করে গৃহত্যাগ করার সময়ে সম্পত্তি লিখে দিয়ে যান তাঁর ভাইকে। কিন্তু শেষ বয়সে তিনি আবার ঘরে ফিরে আসেন। শিবরামের এক বন্ধু তাঁকে বোঝান যে, ওই পুরোনো উইল টিকবে না, কারণ সন্ন্যাস ত্যাগ করে তিনি আবার সংসারে ফিরে আসেন। 

বিদেশ ভ্রমণের প্ল্যান জমতে থাকে সেই সঙ্গে মামলা থেকেও মন সরতে থাকে। উকিল ব্যারিস্টার কিছুই ঠিক হয়নি। শুনানির দিন এসে পড়ে। শিবরাম বলেন, “মামলা তো পকেটে, দরকার কী উকিলের?”। 

শিবরাম নিজেই সব। প্রমাণ বলতে একজন সাক্ষী। আর সেই সাক্ষী কে? শিবরামের কাকা! যাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন স্বয়ং তাকেই নিজের পক্ষের সাক্ষী বানিয়েছেন তিনি। এতই বিশ্বাস যে সাক্ষী মিথ্যে বলবেনই না। তাঁর দাবি, নিজের কাকাকে তিনি সবচেয়ে বেশি চেনেন। তাঁর চোখে চোখ পড়লেই কাকা নাকি পায়ে আর জোর পাবেন না।  

এ দিকে আদালতে দাঁড়িয়ে পায়ের কোনও দুর্বলতা না দেখিয়েই সেই প্রতিপক্ষ তথা সাক্ষী তথা শিবরামের কাকা বলেন যে, ‘‘ধর্মাবতার শিবরামবাবুর এই অভিযোগ সবটাই মিথ্যে এবং ভিত্তিহীন।’’

ব্যস, সাক্ষীর একটি কথাতেই পুরো মামলা ডিসমিস। এবং এভাবেই মামলার সঙ্গে ডিসমিস হয়ে যায় প্রেমেন বাবুর সঙ্গে তাঁর লাখ টাকার বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নও।

তথ্যসূত্রঃ

প্রবন্ধ সংগ্রহঃ সিদ্ধার্থ ঘোষ, আনন্দবাজার পত্রিকা

 

Developed by DXDasia