
শহরে পাখিদের ফিরিয়ে আনতে ‘শের’ সংগঠনের এই অভিনব প্রয়াস
‘শের’-এর সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু বঙ্গদর্শনকে জানান, “নগরায়নের ফলে ক্রমশ কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছে এবং গাছের সংখ্যা কমছে। ফলে কমে যাচ্ছে পাখিদের বাসা। তাই আমরা কলকাতায় ৩০টি স্কুলে পাখিদের বাসা তৈরি করে দেব। যা দেখাশোনা করবে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরাই।”
‘বার্ডম্যান অফ ইন্ডিয়া’ সেলিম আলির (Birdman of India Salim Ali) ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ উদ্যোগ নিল বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে চলা সংগঠন ‘শের’ (SHER)। কলকাতার বালিগঞ্জ শিক্ষা সদন (Ballygunge Shikkha Sadan) স্কুল ও তার আশেপাশে ২০টি পাখির বাসা তৈরি করল তারা। কলকাতার মোট ৩০টি বিদ্যালয়ে পাখিদের জন্য বাসা তৈরি করে দেওয়া হবে। যাতে এ শহরে সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকতে পারে পাখিরা।

গত ১২ নভেম্বর ছিল ভারতের প্রথমযুগের পাখি বিশারদ সেলিম আলির ১২৬তম জন্মদিবস। আত্মজীবনী ‘দ্য ফল অব আ স্প্যারো’ (বাংলায় ‘চড়াই উতরাই’)-তে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘অস্থিতপঞ্চক সভ্যতার দ্রুতবেগের এই যান্ত্রিকযুগের কোলাহলময় ডামাডোল থেকে আমার মুক্তির রাস্তা হল পাখি দেখা।’’ পাখি যে গবেষণার বিষয় হতে পারে, ঘরের বাইরে গিয়ে তাদের ইতিহাস খুঁজে বার করা যেতে পারে, এই বিষয়টা ভারতীয়দের মধ্যে তাঁর আগে বৃহৎ পরিসরে কেউ ভাবেননি। ভারতের পাশাপাশি আফগানিস্তান, তিব্বত, ভুটানের পাখির প্রজনন, তাদের বাসস্থান, জীবনযাত্রা সব কিছু নিয়ে বিশদে কাজ করেছেন সেলিম আলি। প্রতিটি সমীক্ষার উপর লিখেছেন গবেষণাধর্মী বই। তাঁর লেখা ‘বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস’ (Book of Indian Birds) আজও পক্ষী-প্রেমীদের কাছে ধর্মগ্রন্থের মতো। ১৯৪৭-এর পর সেলিম বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে গুরুত্বপূর্ণ আসনে জায়গা করে নেন এবং সংগঠনটির উন্নয়নে সরকারি সাহায্যের সংস্থান করে দেন। তাঁরই উদ্যোগে বর্তমান সাইলেন্ট ভ্যালি জাতীয় উদ্যান ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। ১৯৫০ সালে সুইডেনে আন্তর্জাতিক পক্ষিতাত্ত্বিক কংগ্রেস-এ সেলিম আলি একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বাইক ‘সানবিম’। একটাই উদেশ্য, ওই বাইকে করে গোটা ইংল্যান্ড চষে বেড়ানো। তাঁর স্বপ্ন সফলও হয়েছিল।
‘শের’ সংগঠন তাঁর জন্মদিনটিকেই বেছে নিয়েছিল এহেন মহৎ উদ্যোগের জন্য। কলকাতা শহর থেকে জেলা শহর – সর্বত্রই গাছের সংখ্যা কমে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই পাখিদের নিজস্ব বাসার ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত। এ মহাবিশ্বে বাঁচার অধিকার রয়েছে সকলেরই। শহরবাসীদেরই এগিয়ে আসতে হবে, যাতে সকলের জীবন কিছুটা হলেও সুনিশ্চিত করা যায়।
‘শের’ সংগঠন তাঁর জন্মদিনটিকেই বেছে নিয়েছিল এহেন মহৎ উদ্যোগের জন্য। কলকাতা (Kolkata) শহর থেকে জেলা শহর – সর্বত্রই গাছের সংখ্যা কমে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই পাখিদের নিজস্ব বাসার ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত। এ মহাবিশ্বে বাঁচার অধিকার রয়েছে সকলেরই। শহরবাসীদেরই এগিয়ে আসতে হবে, যাতে সকলের জীবন কিছুটা হলেও সুনিশ্চিত করা যায়। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখিদের নিশ্চিত জীবন সম্পর্কেও জ্ঞাত থাকতে হবে। ‘শের’-এর সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু (Joydip Kundu) বঙ্গদর্শনকে জানান, “নগরায়নের ফলে ক্রমশ কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছে এবং গাছের সংখ্যা কমছে। ফলে কমে যাচ্ছে পাখিদের বাসা। তাই আমরা কলকাতায় ৩০টি স্কুলে পাখিদের বাসা তৈরি করে দেব। যা দেখাশোনা করবে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরাই।”
শহর যেমন সবুজের আশ্রয় হারাচ্ছে, পাশাপাশি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটবাড়িতে আগের মতো ঘুলঘুলি বা খিলানের খাঁজ থাকছে না। স্বাভাবিকভাবেই শহর থেকে মুখ ফেরাচ্ছে পাখিরা। শীতকালীন পরিযায়ী পাখিদের (Migrant Birds) শহরে আসাও তুলনায় কমে গেছে। তাই ‘শের’-এর উদ্যোগে শহরে পাখিদের ফিরিয়ে আনতে এই অভিনব প্রয়াস।
সেলিম আলি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবিত পাখি দেখতেই তাঁর সবচেয়ে ভালোলাগে। পাখি নামের মধ্যেই আছে ওড়া। খাঁচায় বন্দি নয়, খোলা আকাশে অবিরাম উড়ে চলাই পাখিদের ধর্ম। ‘শের’-এর উদ্যোগে কৃত্রিম এই বাসা তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে মাটির হাঁড়ি। তাতে ফুটো করে ঝোলানো হচ্ছে গাছে গাছে। যাতে সেই হাঁড়ির মধ্যে ঘাস-পাতা-ডালপালা অনায়াসে ঢুকিয়ে বাসা গড়তে পারে পাখিরা।

পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোতে যেমন লেখা থাকে না গাছের কথা, তেমন পাখিদের ওড়ার কথাও লিপিবদ্ধ হয় না। অথচ পাখিরা আদর্শ শিল্পী। তাদের কেউ বাসা বানায় কাদা দিয়ে, কেউ বানায় ডাল-পালা দিয়ে, কেউ পালক দিয়ে, কেউ ঘাস দিয়ে; তার গড়নও কতরকমের- কারো বাসা কেবল একটি ঝুড়ির মতো, কারো বাসা গোল, কারো বাসা লম্বা চোঙার মতো।
‘শের’-এর এই বৈপ্লবিক উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়েছে শহরের নামী স্কুলগুলি। পাখিরা ঠিকমতো বাসায় ফিরছে তো? কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যে নেচার ক্লাব আছে, তারা গোটা প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি চালাবে। সেই কারণে প্রাথমিকভাবে স্কুলগুলিকে বেছে নেওয়া। গড়িয়াহাট-বালিগঞ্জ কলকাতার প্রধান একটি এলাকা। সেই কারণে বালিগঞ্জ শিক্ষা সদন দিয়ে শুরু করা হল। এরপর ধীরেধীরে লরেটো, লা মার্টিনিয়ার, ইন্দাস ভ্যালির মতো মোট ৩০টি স্কুল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাখির বাসা তৈরি করা হবে বলে জানান ‘শের’-এর সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু।
____
ছবি সৌজন্যেঃ শের
