
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবধি প্যাথে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো চিত্রনির্মাতা ও পরিবেশক
আজীবন অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। যেমন- তাঁর পরিচালিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রের সূত্রেই বাংলা ছবির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল প্যারিসের বিখ্যাত ‘প্যাথে কোম্পানি’। কিন্তু কী এমন কারণ ছিল যার জন্য দূরদেশের ‘প্যাথে কোম্পানি’র দ্বারস্থ হয়েছিলেন রায় মহাশয়?
এ ক্ষেত্রে একটু ‘প্যাথে’-ভ্রমণ করতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবধি প্যাথে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো চিত্রনির্মাতা ও পরিবেশক। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ইতালি, জার্মানি, রাশিয়া ও জাপানে তাদের প্রোডাকশন ইউনিট ছিল। প্যারি(প্যারিস, ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে 'প্যারি')-তে ছিল বিশাল কারখানা, আর স্টুডিও জয়েঁভিল-ল-পোঁ ও ভিয়েঁসেনর-এ। সেই পর্বে প্যাথের যাবতীয় শর্ট ফিল্ম ও ডকুমেন্টরি চলচ্চিত্রের পরিচালনা করতেন ফার্ডিনান্ড জেককা। তাঁরই সমকালীন ফরাসি পরিচালক মিলিস-এর নাম বেশি পরিচিত তাঁর ছবির শিল্পগুণের জন্য। ঠিক সেই অর্থেই ফিচার ফিল্ম তৈরি করতে জেককা ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ‘প্যাথে’ যে কারণে খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছে, তার কৃতিত্ব জেককারই। ১৯০৯-এ তৈরি প্যাথে-র ‘লা মিজয়ারেবল’ দর্শকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারেনি, এটাই ছিল তাদের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু করে যে-চলচ্চিত্রের সম্ভার এখনও রক্ষিত হচ্ছে প্যারির আর্কাইভে, তার পিছনে আছে প্যাথে এবং জেককা।
১৯০৯ থেকে প্যাথে কোম্পানির নিউজ রিল প্রকাশ শুরু হয় ‘প্যাথে গেজেট’ নামে। ১৯১০-এ ইংল্যান্ড ও ১৯১১-য় আমেরিকা থেকেও তার নির্মাণ ও বিতরণ শুরু। মোরগের ডাক নিয়ে শুরু হওয়া ‘প্যাথে গেজেট’ ১৯৫৬ পর্যন্ত সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে প্যাথে ‘ওয়ার্নার ব্রাদার্স’ ও ‘অ্যাসোসিয়েটেড ব্রিটিশ পিকচার কর্পোরেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ‘প্যাথে নিউজ’ ও ‘প্যাথে পিকটোরিয়াল’ নামে তথ্যচিত্র ও সংবাদ-চিত্রও তৈরি করত তারা।
তবে চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে ফোনোগ্রাফ রেকর্ড, অর্থাৎ মোমের তৈরি চোঙা রেকর্ডের ব্যবসা ছিল প্যাথের। রেকর্ড ব্যবসার মুনাফার সুবাদেই চলচ্চিত্র জগতে তারা নিজেদের আসন মজবুত করেছিল। চার্লস ও এমিল প্যাথে নামে দুই ভাই প্যারি শহরে ১৮৯৬-এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন- ‘প্যাথে ব্রাদার্স’। এডিসনের তৈরি ফোনোগ্রাফ যন্ত্র ও তার রেকর্ড বিক্রি করার এজেন্সি-ব্যবসা। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা নিজেরাই প্যারির উপকণ্ঠে ‘শাতু’ অঞ্চলে চোঙা রেকর্ড তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্যাথের প্রতীক ঝুঁটিওয়ালা মোরগকে প্রথম দেখা যায় এই যন্ত্রেই। সিনেমায় আসার পরেও, এই মোরগই ছিল তাঁদের প্রতীক। এডিসনের সুবাদে প্যাথেরা যেমন রেকর্ড ব্যবসায় নেমেছিল, তেমনই ঘটেছিল সিনেমার ক্ষেত্রেও। এডিসনের তৈরি কিনোটোস্কোপের এজেন্সি নিয়ে তাঁরা ফ্রান্সের প্রায় প্রতিটি থিয়েটারে চলন্ত ছবি প্রদর্শন শুরু করেন। এইভাবেই রেকর্ড নির্মাতা ‘প্যাথে কোম্পানি’র পরে চলচ্চিত্র শিল্পে আগমন।
এই প্যাথে কোম্পানির সঙ্গে একজোটে গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যবসা শুরু করেছিলেন এইচ বোস (হেমেন্দ্রমোহন বসু)। ১৯০৫ কি ছয় সালে এইচ বোস বাংলাদেশে ফোনোগ্রাফ রেকর্ডের ব্যবসায় নামেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এইচ বোসের প্রথমদিকের সমস্ত রেকর্ডে সেকারণেই প্রাধান্য পেত স্বদেশিকতা। ১৯০৬ থেকে প্যাথে কোম্পানি ফোনোগ্রাফ রেকর্ডের বদলে, ডিস্ক রেকর্ড তৈরি করতে শুরু করে। এইচ বোসও তাঁদের সহযোগীতায় ডিস্ক রেকর্ড তৈরি শুরু করেন। ১৯০৮ থেকে ‘প্যাথে-এইচ বোসেজ রেকর্ড কোম্পানি’-র ডিস্ক রেকর্ডের বিক্রি শুরু হয় কলকাতায়। ‘প্যাথে এইচ বোস’-এর একটা মাত্র রেকর্ডই এখন রবীন্দ্রনাথের প্রাচীনতম কণ্ঠস্বরের সাক্ষ্য বহন করছে। রেকর্ডের এক পিঠে আছে ‘বন্দে মাতরম’ আর অন্য পিঠে আছে ‘সোনার তরী’-র আবৃত্তি। এইচ বোসের সহযোগীতা ছাড়াও, প্যাথে তাদের তৈরি নিজস্ব বাংলা রেকর্ডের ব্যবসা শুরু করেছিল তখনই। তারা ‘প্যাথেফোন অ্যান্ড সিনেমা কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটা অফিস তৈরি করে কলকাতায়। ৭ নম্বর লিন্ডসে স্ট্রিটে কোম্পানির মূল কেন্দ্র, আর শাখা ছিল ১৭৯ ধর্মতলা স্ট্রিটে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্যাথের তরফে একটা ক্যাটালগ ছাপা হয়েছিল শুধুমাত্র কলকাতা অফিসের জন্যই। এতে প্রচুর স্টিল সহ দেড়হাজার সিনেমার উল্লেখ এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছিল। ওপেন এয়ার সিন, কমিক সিন, ট্রিক সিন, ফেয়ারি তেল ইত্যাদি ভাগে ছবিগুলিকে ভাগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ওপেন এয়ার সিনেমার অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘লাইফ ইন ইন্ডিয়া’। ৭৭৫ ফিতের এই চলচ্চিত্রে কলকাতার পথঘাট, ইডেন গার্ডেন, চিড়িয়াখানার পাখি, জল তোলার কল ইত্যাদি দৃশ্য ছিল ওদের সংগ্রহে।
মোটামুটি এভাবেই রোম, ভেনিস, জেরুজালেম, মিশর, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েনা, ভারত, নিয়াগ্রা—সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল ‘প্যাথে’। গড়ে ওঠে প্যাথে সিনেমা আর্কাইভ। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামরিক চিত্রাবলী’ বিভাগের তালিকায় দেখা যায় রুশ-জাপান যুদ্ধ ও রাশিয়ার ওডেসা বিপ্লবের ছবি তুলেছিল প্যাথে কোম্পানি। ওডেসা বিপ্লবের চিত্রটির বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’-এর নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষের কথা, অফিসারের নির্দেশে এক নাবিককে গুলি করে হত্যা করার কথা এবং নাবিক বিদ্রোহ ইত্যাদির ছবি। ব্যাটলশিপ পোটেমকিন তৈরি করার আগে রুশ পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন প্যাথে কোম্পানির নাবিক বিদ্রোহের বাস্তব ফুটেজের সাহায্য নিয়েছিলেন, এ সম্ভাবনা প্রবল। বিদ্রোহী নাবিকদের বাস্তব আচরণ সম্পর্কে আইজেনস্টাইনের ধারণা করার একটা উপায় সম্ভবত নির্মিত ওই তথ্যচিত্র। ডি সিকা-র ‘বাইসাইকেল থিফ’-এর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার লক্ষ্যণীয়। সিনেমার বিভিন্ন শাখায় অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিল প্যাথে কোম্পানি। সুতরাং…
সত্যজিৎ রায়ও যে তাঁর তথ্যচিত্রের জন্য প্যাথে-র উপর নির্ভর করবেন—তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যুদ্ধের বাস্তব ছবির জন্য কোনো বেসরকারি এবং বিদেশি উৎসের উপর নির্ভর না-করে সত্যজিতের উপায় ছিল না। ‘রবীন্দ্রনাথ’ ছবিতে বিশ্বযুদ্ধ সংক্রান্ত চলচ্চিত্রের যে-অংশ সত্যজিৎ রায় ব্যবহার করেছিলেন, তা সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্যাথে-র ক্যামেরাচালকদের সৌজন্যে আজ আর্কাইভে সুরক্ষিত। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩৩-এ। কাজেই ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সংগ্রহ শুরু হওয়ার অন্তত চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে থেকেই প্যাথের ভাণ্ডার গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। সেই কারণেই ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্র তৈরি করার সময় সত্যজিৎ রায় ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উপর নির্ভর করেননি। তিনি জানতেন, পুরোনো হওয়ার সুবাদে ‘প্যাথে’ই নির্ভরযোগ্য। আর এভাবেই ভারতীয় সিনেমায় সত্যজিতের সূ্ত্রে ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল প্যারিসের বিখ্যাত ‘প্যাথে কোম্পানি’।
গ্রন্থঋণঃ
প্রবন্ধ সংগ্রহঃ সিদ্ধার্থ ঘোষ
