
জাতপাতের ঊর্ধ্বে সারদাদেবী স্থান দিয়েছেন মানুষকে, গুরুত্ব দিয়েছেন মেয়েদের শিক্ষা
সে এক দুর্ভিক্ষের সময়। চারদিকে নিরন্ন মানুষের হাহাকার। তবে তারই মধ্যে যার যতটুকু আছে ততটুকু নিয়েই সে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ছোট্ট মেয়ে সারদাও তার হাত দুটি বাড়িয়ে দিল। কোমল হাতে তুলে নিল তালপাতার পাখা। সারদার বাবা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সাধ্যমতো কিছু ধান সঞ্চয় করেছিলেন সংবৎসরের জন্য। কিন্তু দুর্ভিক্ষের সময় নিজের পরিবারের কথা না ভেবে দুঃস্থ মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিলেন তিনি। অন্নসত্রে কড়াইয়ের ডালের খিচুড়ি রান্না করা হয় রোজ। গরম খিচুড়ি পাতে পড়তেই অভুক্ত পেট তার সর্বগ্রাসী খিদে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গরম ধোঁয়া ওঠা থালায়। অথচ হাত দেওয়া যায় না তাতে, এত গরম সে খিচুড়ি। আবার ওদিকে খাবারটা একটু জুড়োনোর অপেক্ষাও করতে চায় না ওই অভুক্ত পেটগুলো। এমন সময় মানুষগুলোর কষ্ট অনুভব করে ছোট্ট মেয়েটি পাখার বাতাস করতে লাগে সেই সব থালায়, যাতে তারা একটু শান্তিতে মুখে খাবার তুলতে পারে। অন্যের জন্য সহানুভূতির এই বোধ, এ সারদার জন্মগত। সারাজীবনই এই বোধ সঙ্গী তাঁর। সবার সব কষ্ট দূর হয় সে বোধে, কেবলমাত্র শ্রীশ্রীমা সারদা নামের আশ্রয়েই শীতল হয় কত অস্থির হৃদয়। সারদার একটাই পরিচয় তিনি সবার ‘মা’, যাঁর ছবির দিকে তাকালেই মনে হয় চরমতম একাকীত্বের মুহুর্তেও আমাদের মাথা রাখার মতো এক নিশ্চিন্ত, নিরাপদ কোল আছে। সারাজীবন ধরে তাঁর কথায় ও কাজে এই আশ্বাসই তো দিয়েছেন সারদা।
সারদার জন্মলগ্নেই যেন সূচিত হয়েছিল এই প্রত্যয়। হেমন্তের ধানকাটা শেষে ঘরে তখন পাকা ফসল তোলার পালা, চারদিকেই লক্ষ্মীশ্রী ভাব। বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রাম, শাঁখের আওয়াজে মুখর হয়ে ওঠে এক পৌষের সন্ধ্যায়। রামচন্দ্রের স্ত্রী, শ্যামাসুন্দরী দেবীর সদ্যোজাত কন্যা সন্তানকে বরণ করে নেয় কৃষ্ণা সপ্তমীর চাঁদের স্নিগ্ধতা। সরল বিশ্বাস বলে ওঠে লক্ষ্মীবারে লক্ষ্মী এসেছে ঘরে। উনিশ শতকের অজ পাড়া গাঁয়ে তখন লেখাপড়া শেখা তো দূরে থাক, মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরাতেও ছিল বিস্তর বাধা। সারদা তাই ঘরের কাজ করে। সংসার সামলে তার ছোটো ছোটো ভাইদের দেখভালের দায়িত্বও তার। ফসলের ক্ষেতে সে খাবার নিয়ে যায় মুনিষদের জন্য। বিচক্ষণ তাঁর স্বভাব, সঙ্গে আছে দুর্লভ সরলতা। এরই মধ্যে নিজের ভাইদের পাঠশালায় পড়তে দেখে তাদের পাশে বসে দূর থেকেই নিজের চেষ্টায় সারদার বর্ণপরিচয় হয়। কত যত্নের সে পরিচয়, পুঁথিগত বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে সেই অক্ষর জ্ঞান তাঁকে দিয়েছিল প্রখর বাস্তববোধ। ছোটো থেকেই সমবয়সী সবার মধ্যে সারদা এক্কেবারে আলাদা, ধীর স্থির। সবার সব ঝঞ্ঝাট শ্যামাসুন্দরীর ‘সারু’ সামলায় নিজের সাধ্যমতো। তন্ময় হয়ে দেখে জীবনকে, মানুষকে উপলব্ধি করে গভীরভাবে। এই মেয়েই মাত্র ছ’বছর বয়সে গাঁটছড়ায় বাঁধা পড়ে যাঁর সঙ্গে সেই আপনভোলা মানুষ, শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনেরও মূল সুর ওই এক, মানুষকে ভালোবাসা। সুরে সুরে সুর মিলে যায় তখনই, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সারদা হয়ে ওঠে যোগ্য সহধর্মিণী। শুরু হয় যেখানে যেমন সেখানে তেমন, যখন যেমন তখন তেমনভাবে, যার সঙ্গে যেমন তার সঙ্গে তেমনভাবে জীবনে চলার শিক্ষা। আপন পর ভেদ ছিল না সে জীবনে।
দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তখন কলকাতার তাবড় শিক্ষিত সমাজ জড়ো হয়েছে, উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের নতুন কথা লেখা হচ্ছে সে ঘরে। সারদা তখন নহবতের ছোট্ট, বদ্ধ ঘরটিতে সেই নবজাগরণের চালিকা শক্তি হয়ে দিন পাত করেছেন।
একবার গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে জয়রামবাটি থেকে গঙ্গাস্নানে বেরিয়েছেন সারদা। পথে পড়ল ডাকাত উপদ্রবের আঁকড়া কুখ্যাত তেলোভেলোর মাঠ। ওদিকে সঙ্গীরা তাড়াতাড়ি হেঁটে এগিয়ে গেছে অনেকটা, অন্ধকার পথে সারদা তখন একা। হঠাৎ শুনলেন খটখট করে লাঠির আওয়াজ, সঙ্গে এক বাজখাঁই গলা, ‘দাঁড়িয়ে কে!’ ভয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া অবস্থাতেও সারদা বললেন, “বাবা, আমি তোমার মেয়ে, সঙ্গীরা ফেলে গেছে, পথ হারিয়ে ফেলেছি…”। এক মুহূর্তে বদলে গেল চিত্রপট, বাবা ডাক শুনে সেই ডাকাত সর্দার আর স্ত্রী সন্তানস্নেহে সহায় হল তাঁর। কেবল পরকে আপন করে নেওয়ার মনোভাব নয়, সারদার উপস্থিত বুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতিতারও অমোঘ পরিচয় এই ঘটনা।
দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তখন কলকাতার তাবড় শিক্ষিত সমাজ জড়ো হয়েছে, উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের নতুন কথা লেখা হচ্ছে সে ঘরে। সারদা তখন নহবতের ছোট্ট, বদ্ধ ঘরটিতে সেই নবজাগরণের চালিকা শক্তি হয়ে দিন পাত করেছেন। সবদিকেই তাঁর যথাযথ দৃষ্টি। শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানরা রাত্রে বেশি বেশি খেলে জপধ্যান করতে পারবেন না বলে যখন পরমহংসদেব আশঙ্কা করছেন, তখন সারদা এসে কে ঘন করে ডাল খাবে, কে খিচুড়ি পছন্দ করে, কার কটা রুটি খেলে ভালো করে পেট ভরবে, তার বন্দোবস্ত করছেন। অত পরিশ্রমেও যেন হৃদয়ে তাঁর আনন্দের ঘট। অন্যের জন্য কিছু করতে পারলেই মনে শান্তি। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া পোকার মতো কিলবিল করতে থাকা সব জীবের তিনি ‘মা’। উনবিংশ শতাব্দীর প্রান্তিক বাংলার ‘মেয়েমানুষ’ শ্রীশ্রীমা সারদা জাতপাতের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন মানুষকে। শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্য শরৎ মহারাজ আর গ্রামের মুসলমান ডাকাত আমজাদ, শ্রীমা’র কাছে দুজনেই সমান প্রিয় সন্তান। নিজের হাতে খেতে দিয়ে মা সবার এঁটো কুড়োন নিজে। কেবল মুখের কথা নয়, নিজের প্রতিটি কাজে শ্রীমা সারদা আমাদের শেখান জীবনবোধ। একবার জনৈক এক ভদ্রলোক শ্রীমাকে জানান তার পরিচিত একজনকে অফিসে প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলতে হয় বলে সে আর চাকরি করবে না। প্রখর বাস্তববোধ সম্পন্ন শ্রীমা সারদা তখন বলেন চাকরি ছাড়লে ক’দিন পরে অভাবে চুরি, ডাকাতি করার চেয়ে চাকরি না ছেড়ে এই মিথ্যের সঙ্গে আপোষ শ্রেয়। তৈরি হয় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াবার নতুন বয়ান। মেয়েদের সব সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে তাদের শিক্ষায়। তাই নিজে কখনও প্রথাগত পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও শ্রীমা চাইছেন তখনকার ঘরের সব মেয়েরাই যেন প্রাথমিক শিক্ষাটুকু পায়। কেউ তাঁর কাছে তাদের বাড়ির মেয়েদের কথা জানালে শ্রীমা, সিস্টার নিবেদিতার স্কুলে তাদের ভর্তি করিয়ে দিতে বলছেন, কেবল বই এ পড়া শিক্ষা নয়, হাতেকলমে জীবনের নানা পাঠ শেখানো হত যেখানে।
শ্রীশ্রীমা সারদার সারা জীবনটাই ত্যাগ, তিতিক্ষা, ধৈর্য, স্থৈর্য, বাস্তববোধ, ভালোবাসা, আত্মশ্রদ্ধার আকর গ্রন্থ, যে বইয়ের পাতা একটার পর একটা উল্টেও কখনও শেষ হওয়ার নয়। উনিশ শতকের গ্রামের মেয়ে, প্রথাগত শিক্ষাহীন এই মানুষটির পায়ে তাবড় জগৎ স্থান নিয়েছে একসময়। কারণ তিনি নিজমুখেই সে আশ্বাস দিয়েছেন- পাতানো মা নন, গুরু পত্নী নন, তিনি একান্ত আপনার, তিনি সত্যিকারের মা। তিনি সংঘজননী। শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারায় স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একমাত্র চালিকা শক্তি তিনি। তাঁকে কেন্দ্র করেই মাতৃশক্তির জাগরণ সেখানে। শ্রীমা সারদা তাঁর জীবন দিয়ে এমন একটি মাতৃ চরিত্রের ধারণা স্থির করে গেছেন, যে তাঁর স্থূল শরীর চলে যাওয়ার একশো বছর পরেও পৃথিবীর সব মায়ের মুখের আদলে, মায়েদের গায়ের গন্ধে, তাদের হলুদ মাখা আঁচলে মিশে থাকে শ্রীশ্রীমামায়ের মুখ। এতটাই বিশ্বস্ত সে মহাজীবন, এতটাই জীবন্ত সে আশ্রয়।
