
নীলাঞ্জন হাজরার ‘কাবাব কিস্সা’ বইয়ের রিভিউ
একটু বাজে কথা দিয়েই লেখাটা শুরু করি। অনেক কাল যাবৎ খাওয়া-দাওয়ার সন্ধানে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর ফলে নানারকম লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেককে দেখেছি বেশ দিল খোলা, রাস্তায় চপমুড়ির গল্প থেকে সোজা নিজেদের হেঁশেলের সন্ধান দিতে কোনও সমস্যা হয় না তাঁদের— খাদ্য সম্পর্কিত একাধিক যাত্রাপথের অনেকগুলিতে তাদের সাবলীল অবস্থান তা বেশ বোঝা যায়। খাদ্য সম্পর্কে তাঁরা কোনও স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক কারণেই উদাসীন নন — চোখে এবং চেখে দেখার ব্যাপারে সহজাত উৎসাহ তাঁদের সবরকম ছুঁৎমার্গ থেকে একপ্রকার বাঁচিয়েই রেখেছে এতকাল, এবং ভবিষ্যতেও রাখবে এমনটা আশা করা যেতে পারে। পাশাপাশি আর এক ধরনের মানুষ দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন যাঁদের সঙ্গে কতা কইলে আপনার আর যাই হোক, কিচ্ছুটি দাঁতে কাটার ইচ্ছে হবে না বেশ কিছু কাল। এঁরা অ্যানারক্সিয়ায় মারা যাওয়ার আগে পেপটিক আলসার ইত্যাদি দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভোগেন, সারাজীবন একই খাবার একটানা খেয়েছেন ইত্যাদি গর্ববোধের ফলে খানিক স্ফীত, এবং শহরের কোথায় কোথায় হজমের দাওয়াদারু স্বল্পমূল্যে এখনও— অর্থাৎ এই মাগ্যি গণ্ডার বাজারেও— পাওয়া যাচ্ছে তার খোঁজ খবর রাখেন। এরা জন্মাবধি কখনও হেঁশেলের দুয়ার মাড়াননি, পোস্ত বা ঝিঙে বড়ি দিয়ে মাছের ঝোল ব্যাপারটা কেন ‘পাতলা’ হওয়াটা জরুরি সে বিষয়ে অজ্ঞ, এবং বিয়েবাড়িতে গেলে তবেই রাতের বেলায় মাংস ভক্ষণ করেন।
আমি প্রথম দলটিতে নাম লিখিয়েছিলাম বেশ ছেলেবেলায়— বাঙালবাড়ির দু’চার জন উপযুক্ত ট্রেনার পেলে ওই দলাভিষিক্ত হতে সময় লাগে না। দেখলাম আমার মতো যারা, তাদের কয়েকটি উপরিপাওনা জোটে জীবনে— শুধু যে উপরিই জোটে আসলটি বাদ দিয়ে, সে অবশ্য বুঝেছি পরে, অনেকটাই পরে। যাই হোক। বরাবরই কর্তব্যপরায়ণ বাঙালি বাপ মা বলে এসেছেন, সারাজীবন ভয়ানক খাটাখাটনি, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলে বাকি জীবনটা আরামে আয়েশে কাটানো যায়— অর্থাৎ আশি বছর অবধি এক রকম উদয়াস্ত খাটতে পারলে বাকি ক’টা দিন হাসপাতালে ‘অটোমেটিক ওঠানামা’ খাটে নাকে কানে গলায় নল লাগিয়ে শুয়ে থাকাটা একই সঙ্গে এনশিয়োর্ড এবং মহোত্তর হবে। আপওয়ার্ডলি মোবাইল লোকেরা সেরকমটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে থাকেন এবং কাজের মধ্যেই মুক্তির বিমলানন্দ লাভের উপায় ইত্যাদি খুঁজে পান। পরিষ্কার করে বলে দিই মশাই, নীলাঞ্জন হাজরার ‘কাবাব কিস্সা’ তাঁদের জন্য লেখা হয়নি। যাঁরা ছেলেবেলায় ‘নম্বর বাড়ানোর উপায়’ পড়েছেন এবং টেলিভিশনে ‘কুইজ’ নামক অনুষ্ঠান দেখে মার্কিনদের কায়দায় জ্ঞানভাণ্ডারটিকে আড়েবহরে প্রশস্ত করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের কাজেও এই বই লাগবার সম্ভাবনা কম। তবে যাঁদের সত্যিই সাবধান করে দিতে চাই, তাঁরা বই পড়ে মানসিক শান্তি, মর্নিংওয়াক করে সুস্বাস্থ্য এবং যোগব্যায়াম করে স্পিরিচুয়াল মেটামরফোসিস অর্জনের পথে ছেলেবেলা থেকেই আগুয়ান। দয়া করে মশাইরা ‘কাবাব কিস্সা’ সযত্নে পরিহার করবেন। তার কারণ এই নয় যে আপনাদের মতো মহাপুরুষের জীবন এই বই পাঠান্তে ঋদ্ধ হয়ে উঠবে না, বরং উল্টোটাই ভয় আছে, এর থেকেও আপনারা ‘সহজ আত্মোপলব্ধি’ বা ‘শেয়ার মার্কেটে নিশ্চিত সাফল্য’ গোছের ইনার মিনিং খুঁজে বার করে গোটা প্রচেষ্টাটির বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন।
আরও পড়ুন
আমুদে বাঙালির জীবনচর্যায় ‘আম’-এর দাপট
এতদূর আমড়াগাছির কারণ একটা আছে। যারা বাজে কথা বলে, তারা তা এমনি বলে না। নীলাঞ্জনের এই বইটা পড়তে গিয়ে আমার গোড়াতেই যে উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে গেল, সেটি ইভো আন্দ্রিচের ‘দ্য বসনিয়ান ক্রনিকলস্’। শুরুটা যদি মনে পড়ে, তাহলে দেখবেন একটি পাহাড়ের ঢালে কতজন বসে আছেন। চারপাশে মহা গোলমালের আশঙ্কা। রাষ্ট্রবিপ্লব সময়ের অপেক্ষা। সকলেই উদ্বিগ্ন— তবে খামোকা লাফালাফি করে, অথবা কমিটি বসিয়ে বদহজমের পাকা ব্যবস্থা দেখছেন না কেউই। আর এই মানসিকতা, এই এলিয়ে থেকে আয়েশে আরামে যা হচ্ছে সেটিকে মেনে নেওয়ার ঔদার্যটুকু না থাকলে বাপু বার্গার খাওয়া চলে কোঁৎ কোঁৎ করে, কাবাব জাতীয় উমদা খানার দিকে হাত না বাড়ালেই ভালো। নীলাঞ্জন হাজরার বইটা যতখানি কাবাব নিয়ে, ততখানিই এই জীবনবোধ সম্পর্কিত। যেখানে তাজা কাবাব এবং কফি পাওয়া যায়, সেখানেই ‘শের-ও-শায়রি-র’ দুনিয়ায় ডাকাবুকোরা উপস্থিত— এবং ওঁর লেখা থেকে এমন আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না যে উল্টোটাও একই রকম সত্যি। ব্যাপারটা নিশ্চই বদলে যেত যদি কাবাবের সঙ্গে কবি এবং সমঝদারদের বদলে স্টক এক্সচেঞ্জ-এর নামীদামি দালালদের জীবন গত কয়েকশো বছর যাবৎ সম্পৃক্ত হয়ে থাকত। আন্দাজ করা যেতেই পারে যে, তার ফলে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ চাউমিন দিয়ে হুইস্কি পান করতো এবং দীঘায় গিয়ে হাফ প্যান্ট পরে ভদ্রবেশী মহিলাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলত — আমার মিসেস। তবে শুনেছি সেরকমটা নাকি এমনিতেই কিছু লোকে বলে থাকে। তা হলেই বুঝুন!!

কাবাব কিস্সা বইয়ের সম্পূর্ণ প্রচ্ছদ
একদম গোড়ায় যে কথা অর্ধসমাপ্ত রেখেছিলাম, তার শেষটুকুতে খানিক তর্কের অবতারণা। যাঁরা খাদ্য বিষয়ে নাক সিঁটকানো মতো, তাঁরা নিশ্চই যাবতীয় গা ঘিনঘিনে তথ্যসমৃদ্ধ ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ হাঁটকে বেশ বুঝেছেন যে প্রতিটি সভ্যতার বিকাশের গল্প আসলে কোনও না কোনও উপায়ে আয়েশ আমেজে এলিয়ে থাকার প্রক্রিয়াগুলিকে মেজে-ঘষে পছন্দ মাফিক ফিটফাট করে নেওয়ারও গল্প। এমন একটা সভ্যতার উল্লেখ নেই যারা মদ বানায়নি, এমন একটিও জাতির বিকাশ ঘটেনি যারা খানাপিনা-সহ ‘total hedonism’-কে মানবমুক্তির একমাত্র মোক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়নি। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে ভারতে মোগল সাম্রাজ্য এবং সে সময় ধরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলি এই অঞ্চলের ‘binding factor’ হিসেবে কাজ করেছে এবং হাজার হাজার বছর যাবৎ লালিত সূক্ষ্ম অনুভূতির ক্ষেত্রগুলিকেও জুড়েছে একটির সঙ্গে আর একটিকে। জিভে শান দেওয়ার ব্যাপারে নীলাঞ্জনের উল্লিখিত বাজারের পত্তন, সেখানে দোকানপাট গড়ে ওঠা, নানা ধরনের মানুষের আগমন এবং বিভিন্ন ধরনের জমায়েত, আড্ডায় খাদ্যবস্তু চেখে দেখার অভিজ্ঞতা ওই আলসেমি-আশ্রিত স্বাদ এবং খাওয়ার তরিকাগুলিকে সূক্ষ্মতর করেছে। মনে আছে নিশ্চয়ই মুজতবা আলির ‘দেশে বিদেশে’-তে উল্লিখিত বিভিন্ন জাতের মানুষের সরাইখানা, পথেঘাটে দেখা হওয়ার, নানাবিধ জিনিসের সঙ্গে জীবনবোধের টুকরো টাকরাও হাত বদল হওয়ার গল্প। একটিকে বাদ দিয়ে আর একটি হয় না। দিল্লি বলতেই আপনার মনে হতে পারে লালকেল্লা থেকে জওহরলাল পায়রা উড়িয়ে পতাকা তুলে স্বাধীনতা ঘোষণা ইত্যাদি করছেন। নীলাঞ্জনের বর্ণনায় নাদির শাহর লুটের বীভৎসতা ছাপিয়ে জাহানারা বেগমের ১৬৫০ সালে পত্তন করা রাস্তা জুড়ে কাবাবের গন্ধ— মসালেদার— ম ম করে। কিংখাবের পোশাক, আতরের খুশবু, পূর্ণিমার রাতে তালাওয়ের জলে চাঁদ চিক চিক করে, দোকানের রোশনাই, মৃদুভাষী খরিদার— এই মায়াবী পরিবেশের পাশে পতাকা ওড়ানো বা পায়রা যাই হোক না কেন, গোটা নেহেরুভিয়ান ভিশনটাই কেমন ডিজেনারেটেড চরম অশিক্ষাজনিত উল্লাস প্রদর্শন মনে হতে বাধ্য। কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা আমার লক্ষ্য নয়। কেবল বলতে চাইছি যে, এক ধরনের সংস্কৃতি বেশ কয়েকশো বছর যাবৎ এই উপমহাদেশে একটি সুস্থ সামাজিক জীবন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রচনা করেছিল যেখানে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করাটা রোজকার ঘটনাগুলোর মতোই স্বাভাবিক, তার জন্য আলাদা আয়োজনের দরকার ছিল না। মাথায় রাখতে হবে ইংরেজ এ দেশে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে এই গোটা উপমহাদেশে মন্বন্তরের কোনও ইতিহাস নেই। যেটা বলতে চাইছি তা হল, ইংরেজরা আসার পর থেকে একসঙ্গে বসে খাওয়ার, খাদ্যবস্তু ভাগ করে নেওয়ার, গল্প শোনার এবং শোনানোর পরিসরগুলিও ছোটো হয়ে এল। স্বাধীনতাভিলাষী জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজদের ধরন মোতাবেক স্বাধীন রাষ্ট্র চাইল — যে সাংস্কৃতিক সামাজিক পরিমণ্ডল ধ্বংস করে ইংরেজ সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল, সেটির সূক্ষ্ম সাংস্কৃতিক সামাজিক জীবনবোধগুলিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল না। সে যুগে সকলে এবেলা ওবেলা কোপ্তা কালিয়া কাবাব কোর্মা না খেতে পেলেও, শুধুই উচ্চবর্গের খাবার ছিল এমনটা নয়, হলে, নীলাঞ্জন হাজরার কাবাব সংক্রান্ত কিস্সাটি একেবারেই এই পরিমাণ জনপ্রিয় হত কি না সন্দেহ। অর্থাৎ খেতে পরতে পেত সকলে একরকম। পরের অধ্যায়ে কোত্থেকে একদল নেংটি আঁটা, ছাগলের দুধ খাওয়া অ্যানারক্সিক বেড়াল তপস্বী এসে জুটলেন, এবং যে দেশে তদ্দিনে ভুখা মরাটা প্রায় স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে গরিব মানুষদের জীবনে, সে দেশে সংযম প্রচার করে লিডার হয়ে গেলেন। যে দেশের লোকে খেতে পায় না, সে দেশে না খাওয়া, বা একটু ফলের রস সেবন ইত্যাদিকে কোন ধরনের উজবুকরা মহৎ জীবন যাপন হিসেবে প্রচার করে থাকেন, তা আমার ক্ষুদ্র মগজে ঢুকবে না। নীলাঞ্জন হাজরার বইটি ওই দুই পৃথিবীর মাঝে অবস্থিত। ইংরেজি পাঠে শিক্ষিত, ইংরেজদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তাদের পুলিশ, জেলখানা, মেকলে, কেরানি, ক্রিকেট, পশ্চিম ইউরোপের যৌন সংস্কৃতি মিলিয়ে মিশিয়ে এক স্বাধীনতা আন্দোলন এবং আধুনিকতার যে ঠেলা বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ভারতীয়দের হজম করতে হল, তা এই উপমহাদেশের কাবাব কিস্সা থেকে সাধারণ মানুষের participation-এর সুযোগ ছেঁটে দিল অনেকটাই। আমিনাবাদের টুন্ডে কাবাবির যে গল্প ১৯০৫ সালে শুরু, তার গোড়ায় ভোপালের মহারাজার উপস্থিতির উল্লেখ করেছেন নীলাঞ্জন। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন participation-এর বদলে গোড়া থেকে partition-এর দিকে দু’কদম এগিয়ে না থাকলে, মাউন্টব্যাটনদের সামনে আভূমি ঝুঁকে আনুগত্য প্রকাশের আহ্লাদে বিগলিত হয়ে না থাকলে, পশ্চিম ভারতের কথা বাদই দিলাম, পুবেও ওরকম দু-চারটে ‘ঘরানা’ বিলকুল আবিষ্কৃত হত। এখানে অমন নধর গাই— কেবল দুধ দিয়ে শেষ হয়ে গেল বেচারাদের জীবন। এই যে নীলাঞ্জন বলেছেন পাকপ্রণালীর কথা— যা তাঁর মতে ‘ভারতেও সেটিই প্রথম কালিনারি ম্যাগাজিন’— যে হেঁশেল থেকেই বাংলা কাবাবের আধুনিক যুগ শুরু, ‘বাঙালি রমণীর একদিন-প্রতিদিনের হেঁশেলের রান্নার সম্ভাব্য তালিকাতেও যুক্ত হল’, এটি ক্ষুদ্র একটি সম্প্রদায়ের রাঁধা এবং খাওয়ার মধ্যে আটকে পড়াটা সুস্থ সামাজিক বিকাশের লক্ষণ নয় নিশ্চই। অর্থাৎ, যারা SFI করবেন তাঁরাই বিফ-কাবাব খাবেন আর বাকিরা ‘না, না আমার ঠাকুমা এখনও জীবিত’— এমন একটা ভাব যেন ঠাকুমাটি যে গরুর ন্যাজ পাকড়ে বৈতরণী পার হওয়ার পরিকল্পনা ছকে ছিলেন, আমরা সেটিকেই জবাই করে গিলবার মতলব এঁটেছি— বলে পাশ কাটাবেন এমন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার গণ্ডগোলগুলো মাথায় আসা উচিত ছিল অনেক আগেই। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ওই কেতাবটি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ— এবং নীলাঞ্জনের এই বইও— তা হল এই যে, উনবিংশ শতকের বিভিন্ন সময়ে যে অভিঘাতগুলিকে সহজে সাধারণ মানুষ হেঁশেল অবধি টেনে এনেছিল, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে সেগুলিকে জীবন থেকে ছেঁটে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলি রাষ্ট্রের মদতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল। নীলাঞ্জনের বই থেকে সামাজিক অভিঘাতগুলিকে চেনা সহজ হয়। সব সময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন তা নয়, তবে ওই যে মাংস বাটতে হবে মিহি করে, কখনও মাংসের টুকরো হবে আখরোটের মাপে, আঙুরের উল্লেখ বা অনুল্লেখ অদল-বদল এবং ধারাবাহিকতার ইঙ্গিতবাহী। তবে দরিয়াই কাবাবের নামকরণের পিছনে কোন রহস্য, তা তিনি উদ্ধার করতে পারেননি দেখে আশ্চর্যই হলাম। অনেক খেটেছেন এই তথ্য সমৃদ্ধ কেতাবটির পিছনে। ওই নাম-রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারাটা আমাদের মগজে খচখচ করতেই থাকবে।
আরও পড়ুন
“নারী ছলনাময়ী, জন্ম অভিনেত্রী, কিন্তু সে কি শুধু পুরুষজাতিকে মুগ্ধ করবার জন্যে?” – আশাপূর্ণা
বইটার একটা গণ্ডগোল চোখে পড়ল। ‘ইরানে গিয়ে এই দেখেছি, সেখানে গিয়ে ওই দেখেছি’ ইত্যাদি উল্লেখের পিছনে যে গল্পগুলো, সেগুলোকে নীলাঞ্জন ছেঁটে বাদ দিয়েছেন। এই ধরনের বই নানা ধরনের খাওয়ার গল্পের মিশেলে অনেকে বেশি ‘মসালেদার’ হয়ে ওঠে। লেখকের তেমন অভিজ্ঞতা এবং গল্পের অফুরান ভাণ্ডারের হদিশ আমরা নানা সময়ে পেয়েছি। এই বই লিখতে গিয়ে সেগুলোকে বাদ দেওয়ার ফলে বইটা খানিক বর্ণহীন হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। মানছি, এ বইটা মূলত কাবাবের ইতিহাস নিয়ে লেখা সাজিয়ে তৈরি হয়েছে এবং আগুপিছু যাতায়াত ক্রোনোলজিকার প্রোগ্রেশন ইত্যাদি বিধিনিষেধকে কাঁচকলা দেখিয়েই এটা সম্ভব হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, তার ফলেই মাঝেমধ্যে বেশ কিছু tempting ফাঁকফোঁকর তৈরি হয়েছিল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশেল ঢুকিয়ে দেওয়ার। পরীক্ষা নিরীক্ষার উল্লেখ আছে, জমিয়ে গল্প বলার সুযোগগুলো এড়ানো নিয়েই আমার অনুযোগ।
ওই যে গোড়ায় একদল লোকের কথা উল্লেখ করেছিলাম যাদের খাওয়া ছাড়া জীবনে কিছু হল না, তাদের আর একটা বদগুণ খেয়াল না করে উপায় নেই। এ শালারা সর্বক্ষণ খাওয়া নিয়ে গল্প করে— কোনও সময় বিষয়ে টান ধরলে থালাবাটি বর্তন নিয়ে কথা বলবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তবে বিষয়টিকে কিছুতেই হেঁশেল, খাবার ঘর, ডাইনিং টেবিলের নাগালের বাইরে বেরতে দেবে না। নীলাঞ্জনের লেখায় সে গুণটি পুরোপুরি বর্তমান। নানা ধরনের বাসনের উল্লেখ এবং সেগুলো সম্বন্ধে সন্দেহের স্থানগুলিও দেগে দেওয়ায় ভোজনরসিকরা তথ্যসমৃদ্ধ লেখা তো পেলেনই— যা খুবই দরকারি সে নিয়ে সন্দেহ নেই— তবে চারইয়ার মিলিত হলে তর্ক করার হাতে গরম যে উপকরণ পেলাম সেটা আরও জরুরি। খাওয়াদাওয়া নিয়ে আড্ডায় কে আর কবে শুধু পিঠ চাপড়ে দস্তরখান ছেড়ে উঠেছে— একে তাকে জাফরানের কোয়ালিটি নিয়ে জ্ঞান দেওয়া, মাংস কোথায় ভালো পাওয়া যায় সে নিয়ে তকরার এবং কার শালির বিয়ের কোপ্তায় ঘি কম পড়েছিল, সে নিয়েই আলোচনা জমে ওঠে। নীলাঞ্জনের এ বইতে সে সুযোগ আছে। ভুল বুঝবেন না পাঠকগণ। কোন কেতাবে পাঁচশো বছর আগে কী লেখা হয়েছে বা হয়নি সে নিয়ে গোলমালের আশঙ্কা যে নেই, সে বিষয়ে আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত— তবে আমাদেরই একজন যে নাক সিঁটকে বলে উঠবেন ‘আকবরের খানসামা? সে আবার কী জানে?!?’ সে সম্বন্ধেও আপনারা সমপরিমাণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। নীলাঞ্জনের বইতে কাবাবের যাত্রার গল্পটি পড়তে পড়তে কাবাব সম্পর্কিত গল্পগুলি, তার রসিক কদরদানদের জীবন যাপনের তৌর তরিকাগুলিরও খানিক হদিশ পাওয়া যায়। নীলাঞ্জন নিজে কীভাবে খোঁজ পাত্তা লাগিয়েছিলেন, সেটি কি কম রোমাঞ্চকর নাকি? সব মিলিয়ে জমাটি একখানা বই। তার ওপর আবার রেসিপি দেওয়া আছে। পরবর্তী সংস্করণগুলিতে রেসিপি এবং গল্পের অংশ বাড়ুক। এমন বই কলেবরে বৃদ্ধি পাবে সে আশা করা যেতেই পারে!
কাবাব কিস্সা। নীলাঞ্জন হাজরা। ধানসিড়ি। ৪৫০ টাকা
