
বর্তমানে সেই উষ্ণতার আঁচ কি চাপা পড়ে যাচ্ছে?
ঘেঁটে গেছে ঋতু বৈচিত্র্য। কলকাতায় (Kolkata) নিয়মমতো ফি বছর শীতকাল আসছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে শীত ছাড়াই আসছে। আগের মতো শীত নেই, মাঝের দু’বছর অতিমারি তার সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার রমরমা – এমতাবস্থায় কেমন চলছে কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়্যা রের (Wellington Square’s) জনপ্রিয় ‘ভুটিয়া বাজার’ (Bhutia Market)?
কয়েক বছর আগেও কলকাতাবাসীরা বিশেষত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকত শীত শুরুর আগে আগে রিফিউজি তিব্বতীদের (Refugee Tibetans) আমদানিকৃত শীতবস্ত্রের (Winter Garments) জন্য। শীত পড়তেই ভিড় বাড়তো পশম সুতোয় বোনা বাহারি শাল, সোয়েটার, কার্ডিগান, স্টোল, মাফলার, পঞ্চুর মতো শীতপোশাকের একরাশ সম্ভারের পাশাপাশি পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রীর জন্য। প্রতি বছরের মতো এ বারও নভেম্বরের শুরু থেকে পসরা সাজিয়েছেন পরিযায়ী পাহাড়ি ব্যবসায়ীরা। মাঝের দু’বছর অতিমারির কারণে ভিন্ রাজ্যম থেকে কোনও ব্যাবসায়ী এ শহরে আসতে পারেননি। তারপর পরিস্থিতি তুলনায় স্বাভাবিক হওয়ায় তিন মাসের জন্য এ শহরই তাঁদের অস্থায়ী ঠিকানা।

বছর কয়েক আগেও ভুটিয়া বাজারে গেলে ভিড়ের চাপে পা ফেলা যেত না। কার্যত মাছি তাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। হইহট্টগোল, ধাক্কাধাক্কিতে একটা শীতকালীন উৎসবের আবহ তৈরি হত। ডিসেম্বরের শেষে শীতের পারদ কিছুটা হলেও নেমেছে। তবুও দোকানগুলিতে ভিড় নেই ক্রেতাদের। শীতের খামখেয়ালিপনাই কি এর কারণ? অন্য রাজ্যের ব্যবসায়ীদের দাবি, কলকাতায় শীতের মেয়াদ ক্রমশ কমে আসছে। বছর কয়েক আগেও নভেম্বর থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত ভাল কেনাবেচা হওয়ায় ব্যবসা জমে উঠত। এখন ডিসেম্বর মাস চলে এলেও বেচাকেনায় বেশ ভাটা। সারা দিনে ক্রেতার সংখ্যাও হাতে গোনা। তার মধ্যে আবার কেউ কেউ শীতপোশাক হাতে নিয়ে, দেখেশুনে দরদাম করেই চলে যাচ্ছেন। মুখে সারল্যের হাসি থাকলেও চিন্তার ভাঁজ ব্যবসায়ীদের কপালে।

ছেলের জন্য উলের টুপি আর টেকসই জ্যাকেট কিনতে এসেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা রঞ্জন মিত্র। তাঁর কথায়, “এখন শীতই পড়ে না ঠিকমতো, তাই নতুন শীতের পোশাক কিনতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আমি প্রতি বছরই নিয়ম করে এখানে আসি। দামাদামি করে এরকম ভালো টেকসই জিনিস আর কোথায় পাবো! তাও এখন সে ভিড় আর হয় না।”

শীত না পড়া ব্যবসা-হ্রাসের একটা কারণ কিন্তু, অন্যান্য কারণগুলি কী? ‘‘নভেম্বরের শুরুতে কলকাতায় এসেছি। এক মাস হয়ে গেল। অথচ তেমন কিছু বিক্রি করে উঠতে পারিনি। দোকানে ঠাসা মাল রয়েছে। ক্রেতা আসছে না, তা বলব না। কিন্তু দেখাশোনাই সার। আর একটু শীত পড়লে কিনব বলে আশা দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন বেশির ভাগ। খুব বেশি মোটা শীতপোশাক কিনতে চাইছেন না বেশির ভাগ ক্রেতাই। সকলেই হালকা, কিন্তু শৌখিন পোশাকের খোঁজ করছেন। বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে স্টোলের বেশ একটা চাহিদা রয়েছে। দোকানে এসে সেগুলিই দেখাতে বলছেন তাঁরা।” বলছিলেন দীর্ঘ দিন ধরে ভুটান থেকে এসে ওয়েলিংটনে দোকান দেওয়া এক ব্যবসায়ী।
শীতের স্থায়িত্ব কমছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে মানুষের পছন্দ-অপছন্দতেও। বদলেছে রুচি। অনলাইন কেনাকাটার যুগে মাফলার, সোয়েটার কিনতে দোকানে যাওয়ার ঝোঁক অনেকটাই কমেছে। পাঁচটা দোকান ঘুরে কেনাকাটি করার সময়ই বা কোথায়। সময় এবং শ্রম— দুই-ই বাঁচাতে অনলাইনই এখন ভরসা।
বিগত কয়েক বছর ধরে লাদাখ থেকে শীতের পোশাক বেচতে কলকাতায় আসছেন ইয়াসির ভট্ট। তাঁর কথায়, ‘‘মোজা কিংবা মাফলার, এখন আসলে সকলেই ব্র্যান্ডেড পরতেই ভালবাসেন। ভাল দামি পোশাক প্রচুর আছে আমার কাছে। কিন্তু সেগুলির চাহিদা নেই। সকলেই দোকানে এসে মাঝারি দামের পোশাকেরই খোঁজ করেন। একটা স্টোলের দাম ৭০০ টাকা শুনে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু গুণগত মান, সুতো দিয়ে করা স্টোলের কারুকাজ দেখছেন না। সেই সঙ্গে দরদাম তো আছেই। আমাদের প্রত্যেকটি দোকানে পোশাকের দাম বাঁধা। বেশি কিংবা কম কোনওটাই নিতে পারব না। জিনিসের মান বুঝেই দাম রাখা হয়েছে। খুব সস্তার জিনিস আমাদের কাছে পাবেন না। কারণ আমরা যে জিনিসটি দেব তা অনেক বছর পর্যন্ত ভাল ভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।’’
ইয়াসিরের সঙ্গে গলা মেলালেন হিমাচল প্রদেশ থেকে আসা কিশোরী লাল গৌতমও। ব্যবসার সূত্রে দীর্ঘ দিন ধরে শহরে আসায় কলকাতার মানুষের পছন্দ সম্বন্ধে একটা সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘কলকাতায় তো এখন আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা তেমন পড়ে না। ফলে হালকা উলের সোয়েটার, হাফ জ্যাকেটের মতো পোশাকই পছন্দ করেন অনেকে। তেমন পোশাকও আমাদের কাছে রয়েছে। তার জন্য তো আসতে হবে।’’

ধর্মতলা চত্বরে অনেক কম দামে ঢেলে বিক্রি হয় শীতের পোশাক। তা ছাড়া শপিং মলগুলিতে চলছে ‘উইন্টার সেল’। অনলাইন পোশাক বিপণিগুলিও এই সময় শীতের পোশাকের উপর বিপুল ছাড় দেয়। অন্য কোথাও সস্তায় পছন্দসই পোশাক পেয়ে গেলে আর কেন ওয়েলিংটন ভুটিয়াবাজারে ভিড় জমাবেন ক্রেতারা? এখানে তো কোনও ছাড়ের ব্যাপার নেই। সব দোকানে এক দাম।
দীর্ঘ দিন ধরে কলকাতায় আসার ফলে অনেক ক্রেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অনেকে আবার ভালোবেসে ফেলেছেন আমাদের মাতৃভাষাকে। এমন অনেক ক্রেতাই আছেন যাঁরা নিজেদের পছন্দমতো দোকানীর থেকে শীতের পোশাক কিনবেন বলে অপেক্ষা করে থাকেন, ফোন করে জেনে নেন ‘কবে আসছেন?’। ভালো মান না হলে কি তেমন হত! “শীতের পোশাক সব সময় টেকসই হওয়া জরুরি। যাতে বহু দিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। গলায় জড়ানো স্কার্ফ থেকে শুরু করে ছেলেদের মাফলার— আমরা সব সময় টেকসই জিনিসই বিক্রি করি। সস্তা মানেই যে মান ভাল হবে না, তেমন নয়। পোশাকের মান ভাল বলেই নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করেন কলকাতার ক্রেতারা।” স্মিত হেসে এমনটাই বলেন ভুটিয়া বাজারের এক মহিলা ব্যবসায়ী।
