হেরিটেজ স্বীকৃতি পেল রানি রাসমণির স্মৃতিবিজড়িত জানবাজারের বাড়ি

‘‌এ–ওয়ান’‌ গ্রেডের হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে মনোনীত হয়েছে বাড়িটি

য়েক বছর আগে রাণী রাসমণির (Rani Rashmoni) জানবাজারের রাজকীয় এই বাড়িটিই (Janbazar House) বেআইনি ভাবে দখল হয়ে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হল, শেষপর্যন্ত সেবাড়ি বেদখল হতে পারেনি – কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (KMC) বাড়িটিকে হেরিটেজ ভবন (Heritage Building) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাড়ির সদর দরজায় গোলাকার নীল রঙের ধাতুর ফলক লাগানো হয়েছে, যাতে খোদাই করে লেখা আছে ওই বাড়ির নাম, নির্মাণের তারিখ এবং এই বাড়িটি ‘এ–ওয়ান’ গ্রেডের হেরিটেজ বিল্ডিং। ‘এ–ওয়ান’ গ্রেডের হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে সেই বাড়িগুলিই মনোনীত হয়, যেগুলির কোনও বাহ্যিক পরিবর্তন করা যায় না এবং হেরিটেজ বিল্ডিং বিভাগে মনোনীত অন্যান্য বাড়িগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রানি রাসমণির জন্ম একটি কৃষক পরিবারে। মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় মাহিষ্য জমিদার পরিবারের বাবু রাজচন্দ্র দাসের (Babu Rajachandra Das) সঙ্গে। আমরা জানি, বাংলার অগ্রণী সমাজ সংস্কারকদের মধ্যে রানি রাসমণি অন্যতম একজন। রাজচন্দ্র মারা যাওয়ার পর তাঁকেই জমিদারি এবং আর্থিক তহবিলের দায়িত্বভার নিতে হয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁর জন্য এই গুরুদায়িত্ব সামলানো বেশ কঠিন কাজ ছিল। এসবের পরেও তিনি সাধারণ মানুষের কাছে একজন সত্যিকারের ‘রানি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, যাঁদের থেকে তিনি অকাতর ভালোবাসা আর সমীহ পেতেন। বিধবাবিবাহ বন্ধ করতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শুধু তাই নয়, বহুবিবাহের বিরুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে একটি খসড়া বিল পেশ করেছিলেন।

রানি রাসমণি বেশ কয়েকবার ব্রিটিশদের সঙ্গে ঘোরতর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেরকই একটি ঘটনা, গাঙ্গেয় অঞ্চলে মাছ ধরার জন্য ব্রিটিশরা নৌকার উপর যে কর আরোপ করেছিল, তাতে স্বাভাবিক ফেরি চলাচল ব্যহত হচ্ছিল। এর প্রতিকারে অন্যান্য জমিদারের কাছে কোনওরকম সাহায্য না পেয়ে গরিব জেলেরা রানি রাসমণির কাছে যায়। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ১০০০০ টাকার বিনিময়ে একটি ইজারা চুক্তি করেন, যাতে জেলেরা ওই অঞ্চলে নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারে। তাঁর এহেন অবস্থান দেখে ইংরেজরাও চমকে গিয়েছিল এমনকী পরবর্তী সময়ে নৌকা এবং জেলেদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয় তারা। গঙ্গার চারপাশে এখনও ইতিহাসের সাক্ষী বহন করছে রানি রাসমণির তৈরি বাবুঘাট (তাঁর স্বামীর স্মরণে), আহিরীটোলা ঘাট এবং নিমতলা ঘাটের মতো জনপ্রিয় ঘাটগুলি। এরকমই বেশ কিছু জনহিতৈষী কাজকর্মের জন্য তিনি সাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন – হয়ে উঠছিলেন ‘লোকমাতা’ রানি রাসমণি।

রানি রাসমণির জানবাজারের এই বাড়িটিতে এক সময় মহাধূমধাম করে দুর্গাপূজা এবং জগদ্ধাত্রী পুজোর চল ছিল। ১৭৯২ সালে প্রীতিরাম দাস এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর উপাধি হয়েছিল ‘মাড়’। কারণ, রাজচন্দ্র দাস সিদ্ধ চালের জল, পচা বাঁশ থেকে আঠা তৈরি করতেন। কাগজ তৈরির ব্যবসা ছিল তাঁদের। সমসাময়িক বহু নামকরা ব্যক্তি জানবাজারের ওই বাড়িতে যেতেন। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস তো প্রায়ই আসতেন এবং শোনা যায়, সেই বাড়িতে মা দুর্গার পূজাও করেছিলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হিসেবে বাড়িটির একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই ভারতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে এই বাড়িটি একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে যা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, এখনও এমন অনেক বাড়ি আছে, আগামী দিনে কলকাতা পুরসভা যাদের হেরিটেজ তকমা দিতে পারে। ইতিমধ্যেই সেই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। শুরুটা করা হল রানি রাসমণির বাড়ি দিয়ে। এমনকী শহরে এমন ১০০টি বাড়িতে ফলক বসাবে কলকাতা পুরসভা। সেই তালিকায় রয়েছে ৫, এস এন ব্যানার্জি রোডে অবস্থিত কলকাতা পুরসভার সদর ভবনটিও। ইতিহাস আমাদের শিকড় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, নিজেকে চিনতে শেখায়। হেরিটেজ তকমাধারী, বহু ঐতিহাসিক তথ্য সমন্বিত এই বাড়িগুলি সেই কাজই করে। রানি রাসমণির জানবাজার বাড়িটি সেরকমই একটি ঐতিহাসিক স্থান যা ফেলে আসা সময়কে আজও বহন করে চলেছে।

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে করুন।

Post Tags
Developed by DXDasia