শিক্ষক নন্দলালের উপদেশ অমান্য করেছিলেন রামকিঙ্কর

তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার

পাশ্চাত্য শিল্পরীতির সঙ্গে বাংলা তথা ভারতের নিজস্ব রীতির আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। ভারতীয় শিল্পকলার জগতে আধুনিকতার অন্যতম দিশারী তিনি। ১৯০৬ সালে বাঁকুড়ার যুগিপাড়ায় জন্ম হয়েছিল তাঁর। ক্ষৌরকারের কাজ ছিল পারিবারিক পেশা। অর্থের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সুরেন পণ্ডিতের পাঠশালায় পড়াশোনার পর রামকিঙ্কর ভর্তি হন বঙ্গ বিদ্যালয়ে। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই স্কুল ছেলে পারিবারিক ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করতে হয় ছোটোবেলাতেই। যুগিপাড়া নৈশ বিদ্যালয়ে চলতে থাকে পড়াশোনা। এদিকে ছোট্ট রামকিঙ্করের ঝোঁক ছবি আঁকা আর মূর্তি গড়ার দিকেই। কুমোরদের দেখাদেখি কাদা দিয়ে মূর্তি গড়া শুরু করেছেন। বাড়ির পাশেই থাকতেন অনন্ত সূত্রধর। রামকিঙ্কর তাঁর থেকে প্রতিমা গড়া শিখতেন। বাবা চণ্ডীচরণ ছেলের তৈরি মূর্তি মেলায় মেলায় বিক্রি করে বাড়তি কিছু রোজগার করতেন। অল্প টাকার বিনিময়ে নিষিদ্ধপল্লির মহিলাদের মূর্তি গড়ে দিতেন রামকিঙ্কর।  

এরই মধ্যে শুরু হল অসহযোগ আন্দোলন। রামকিঙ্কর যোগ দিলেন জাতীয় কংগ্রেসে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আবক্ষ ছবি আঁকা শুরু করলেন। এছাড়াও উপার্জনের জন্য আঁকতেন সাইনবোর্ড, মঞ্চসজ্জার ছবি। এরই মধ্যে তিনি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নজরে পড়ে যান। ততদিনে রামকিঙ্কর লালবাজারের জাতীয় বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম দেখে রামানন্দ শান্তিনিকেতন যাওয়ার প্রস্তাব দেন। করে দেন যাবতীয় ব্যবস্থাও। ৪ বছর পর ১৯২৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার ছাত্র হিসেবে যোগ দিলেন রামকিঙ্কর। লাভ করলেন নন্দলাল বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য।

১৯৩৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কলাভবনে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন রামকিঙ্কর। প্রকৃতি এবং প্রান্তিক মানুষকে নিজের চেতনার রঙে রাঙিয়ে নিজের সৃষ্টিকর্মে তুলে ধরেছেন বারবার। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু জীবন্ত মডেলের ব্যবহার পছন্দ করতেন না। কিন্তু শ্রদ্ধাভরেই সেই উপদেশ অমান্য করেছেন রামকিঙ্কর। নিজের কাজে মডেল ব্যবহার করেছেন। কলাভবনে তিনিই প্রথম অয়েলের কাজ করেন। পাশ্চাত্য শিল্পীরীতিতে ছিলেন সাবলীল। দেশীয় শিল্পের প্রভাবও ভীষণভাবে রয়েছে তাঁর কাজে। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা তাঁর সৃষ্টিতে ছাপ ফেলেছিল। ‘সুজাতা’, ‘সাঁওতাল পরিবার’, ‘বাতিদান’, ‘হেড অফ আ উইম্যান’, ‘পোয়েটস হেড’, ‘কলের বাঁশি’ ইত্যাদি নানা কালজয়ী ভাস্কর্যের জনক তিনি। বিশ্বভারতীর থেকে তিনি লাভ করেছেন ‘দেশিকোত্তম’ সম্মাননা, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডিলিট’ উপাধি দিয়্বেছে। ভারত সরকার তাঁকে ভূষিত করেছে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মাননায়। ১৯৮০ সালে রামকিঙ্কর প্রয়াত হন কলকাতায়। এরপর তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করে ভারত সরকার।

তথ্যঋণ – শৌভিক দাস, আবীর মুখোপাধ্যায়। 

 

Developed by DXDasia