‘তুমি আজ না বাঁচালে সাবান খেয়ে মরব রামঠাকুর’

দাদার বেত নাচছে পিঠে। সেইসঙ্গে নাস্তিক হওয়ার পাঠ নিচ্ছে এক হতভাগা…

দাদা আমার পিঠে সেই বেতের সদ্ব্যবহার করল আবার কিছু দিনের মধ্যেই। তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি আমি। হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোল। দেখলাম, অঙ্কে আমি ১২ পেয়েছি। ১২ পাওয়াটা অবশ্য আমার কাছে অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। অঙ্ক কোনোদিনই আমার ভালো লাগত না। দাদা আমাকে শাসন করেছে, কিন্তু অঙ্ককে ভালোবাসতে শেখায়নি কখনও। অঙ্কের ‘হোমটাস্ক’ আমি বাড়ি থেকে নিজের কৃতিত্বে কোনোদিনই করে নিয়ে যেতাম না। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের খাতা দেখে টুকে অঙ্কের স্যারকে খাতা জমা দিয়ে দিতাম।

কিন্তু আমাকে তো ‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’টা গার্জিয়ানের সই করে আবার স্কুলে জমা দিতে হবে।! আমি দাদাকে দেখাব কী করে ঐ ‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’! কোনও উপায় খুঁজে পাই না। রাতে ঘুম আসে না। চোখ বুজলেই দাদার হাতের বেতকে আমার পিঠে নাচতে দেখি!

হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল মাথায়! আচ্ছা, ইংরেজিতে লেখা 12-র ‘1’-এর বাঁদিকে কলম দিয়ে দুটো আঁক কাটলেই তো 12 হয়ে যাবে 42। দাদা তো আর টোটাল মার্কস যোগ করে দেখতে যাবে না!

যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। আমাদের তখন হ্যান্ডেল কলম দোয়াতে ডুবিয়ে লিখতে হত। ঘরে কেউ নেই। ছোটদি উপরের রান্না ঘরে বৌদিকে সাহায্য করছে। আমি দরজা বন্ধ করে প্রোগ্রেস রিপোর্ট আর দোয়াত-কলম নিয়ে ‘অপারেশন’ করতে বসে গেলাম। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে সবেমাত্র ১-কে ৪ বানাতে যাচ্ছি, হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক। বৌদির গলা—‘দরজা বন্ধ কইর‍্যা কী করস রে তুই?’

তাড়ার চোটে ভক করে নিব থেকে কালি পড়ে গেল ‘১’-এর ওপর। ১২-টাই পুরো কালিতে ঢেকে গেল। তাড়াতাড়ি রিপোর্টটা বিছানার তোষকের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা খুললাম। বৌদি সন্দেহের চোখে এদিক-ওদিক বার-দুয়েক দেখে কীসের একটা কৌটো নিয়ে ফের রান্নাঘরে চলে গেল। আমি তোষক উল্টে দেখি, গোটা প্রোগ্রেস রিপোর্ট কালিতে মাখামাখি! কোথায় যে সেটাকে লুকোব ঠিক করে উঠতে পারি না।

দাদা প্রায় রোজই জিজ্ঞেস করে-‘ কী রে, তোগো হাফ ইয়ার্লির রেজাল্ট বাইরয় নাই?’ আমি বলি, ‘কই এখনও তো দেয় নাই।’ বলার সময় প্রতিবার গলাটা শুকিয়ে আসে। দাদাও অবাক হয়। বলে, ‘এখনও ক্যান রেজাল্ট বাইরয় নাই খোঁজ লইয়া দ্যাখতে হইব তো।’

একদিন টিফিনের সময় হৈ হৈ করে ক্লাস থেকে বেরোতেই দেখি স্কুলের দাদা অফিস-ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। দাদাকে দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দাদা আজ আমায় মেরেই ফেলবে।

স্কুল থেকে ফিরে আমি সেইদিন আর খেলতে বেরোই না। একসময় ঘর খালি পেয়ে বৌদির ঠাকুরের আসনে লাল শালুতে মোড়া সিঁদুরের কৌটোটা খুঁজে বের করি। দুর্গাপুজোর বিসর্জনের সময় মা দুর্গার পায়ে ঠেকিয়ে বৌদি এই সিঁদুর কৌটোয় টাকা রেখে লাল শালুতে মুড়ে ঠাকুরের আসনের নিচে লুকিয়ে রাখত। আমি সেই কৌটো থেকে টাকা বের করে ফের লাল শালুতে মুড়ে রেখে দিই। ছোটদিকে ‘খেলতে যাচ্ছি’ বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েই টাকাটাকে ষোল আনায় ভাঙিয়ে নিই। তারপর, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট থেকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত যত মন্দির-ঠাকুর বাড়ি আছে, সব জায়গায় এক আনা, দু’আনা করে ছুঁড়ে দিয়ে নমস্কার করে প্রার্থনা করি- ‘ঠাকুর, তুমি আমাকে দাদার মারের হাত থেকে রক্ষা কর। ঠাকুর…’

সব পয়সা শেষ হতে আমি বাড়ি ফিরে আসি। দাদা ফিরবে রাত আটটায়। গীতাদের বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো। ছোটদিকে নিয়ে বৌদি ওদের ঘরে। নারায়ণপুজোর সিন্নি খাওয়ার লোভ বিসর্জন দিয়ে আমি ঘরে রয়ে গেলাম। ঠাকুরের আসনের সামনে বসে রামঠাকুরের পায়ে মাথা ঠুকে বলতে লাগলাম, ‘ঠাকুর তুমি আমাকে বাঁচাও।’

হঠাৎ, আমার মনে পড়ে গেল দাদার কাছ থেকে শোনা রামপ্রসাদের গল্পটা। রামপ্রসাদ নাকি মা কালির হাতের খাঁড়াটি নিজের হাতে নিয়ে কালিকে বলেছিল, ‘মা তুই যদি দেখা না দিস, তাহলে আমি এই খাঁড়া দিয়ে আমার গলা কেটে ফেলব।’ রামপ্রসাদ যখন খাঁড়াটা গলায় বসাতে যাবে, মা কালি স্বয়ং দেখা দিয়ে তাঁর হাত থেকে খাঁড়াটা কেড়ে নিয়েছিল। আমি ভাবলাম— পুজোর ফলমূল কাটার বঁটিটা আমার গলার কাছে ধরে রামঠাকুরকে বলি— ঠাকুর তুমি যদি আজ আমাকে না বাঁচাও, তাহলে আমি এই বঁটি গলায় বসিয়ে দেব। কিন্তু, বঁটিটা আমি কোথাও খুঁজে পেলাম না। উল্টে বঁটি খুঁজতে গিয়ে দেখি তাকের ওপরে একটা সাবান। আমি শুনেছিলাম, সাবান নাকি বিষ। খেলেই সুনিশ্চিত মরণ। আমি সেই সাবানটা নিয়ে প্রায় আদ্ধেক খেয়ে ফেললাম আর বলতে লাগলাম— ‘ঠাকুর তুমি যদি আজ আমাকে না বাঁচাও, এই বিষ খেলাম আমি। ঠাকুর…’

কিন্তু ঠাকুর কোথায়! একটা রুল কাঠ নিয়ে যমদূতের মতো দাদা ঢুকল ঘরে। আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে সজোরে ওই রুল কাঠটা আমার পিঠে বারবার বসিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, ‘তোর নাকি রেজাল্ট বাইরয় নাই, না? কথাডা এক্কেবারে সইত্য, তাই না? বল, বল অঙ্কে কত পাইছস? কই রাখছস রেজাল্ট? বাইর কর!’

দাদা কথাগুলো বলছে আর আমাকে মেরে চলেছে, আমি ঘরময় লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। দাদা রাগের চোটে এক্কেবারে বদ্ধ উন্মাদ তখন। মাঝের থেকে রুল কাঠটাই দু’টুকরো হয়ে গেল। 

আমি শুধু- ‘ও দাদা, আমারে আর মাইরো না মাইরো না’—বলে চেঁচাচ্ছি। কিন্তু শত মারেও দাদা আমার মুখ থেকে বের করতে পারেনি প্রোগ্রেস রিপোর্টটা কোথায়! কী করে দেখাব সেটা দাদাকে! ওটা তো একেবারে কালিতে মাখামাখি হয়ে আছে তোষকের তলায়।

সেবারও সত্যনারায়ণ পুজো ফেলে গীতার মা, বাবারা ছুটে এসে দাদার মারের হাত থেকে আমাকে বাঁচায়। আর সেদিন শেষ রাত থেকেই আমার শুরু হল সাদা দুধের মতো পাতলা পায়খানা। সাবান খাওয়ার ফলাফল।

সেরে উঠতে কদিন লেগেছিল মনে নেই। কিন্তু, এই অভিজ্ঞতার থেকে আমি বুঝলাম ঠাকুর বলে কিচ্ছু নেই! আমি হয়ে উঠলাম ঘোর নাস্তিক। ঐসব ঠাকুর-টাকুর আমি বিশ্বাস করি না একদম। ‘শালা! সব ফোর টোয়েন্টি!’ 

Developed by DXDasia