হাত-সাফাইয়ের শিক্ষা ও বেতের আদর

‘পকেটমারা’র রোজগারের আনি দিয়ে কেনা হত হজমি গুলি…

আমার দাদার রোজগার ছিল খুব অল্প—মাসে আশি টাকার মতো হবে। ফলে, আজকালকার অভিভাবকরা ছেলে, মেয়েদের হাতখরচের জন্য যেমন পাঁচ-দশটাকা প্রায় রোজই দিয়ে থাকেন, সেখানে আমার দাদা পাঁচ-দশ পয়সাও কোনওদিন আমাকে আর ছোটদিকে দিত না। অথচ স্কুলের সামনের তেলেভাজার দোকান থেকে সমবয়সী অন্যান্য ছেলেমেয়েদের তেলেভাজা, কমলা-হলুদ আইসক্রিম, ঘষা বরফের লাল-নীল মনুমেন্ট, হজমি-গুলি ইত্যাদি কিনে খাওয়া স্বাভাবিকভাবেই ‘বস্তু থেকে চিন্তা’র নিয়ম অনুযায়ী আমাদেরও প্ররোচিত করত। 

প্ররোচনায় কে না পিছলায়! অতএব, দাদা দুপুরে বাড়ি ফিরে জামা কাপড় ছেড়ে স্নান করতে গেলে, হ্যাঙারে ঝোলা দাদার জামার পকেট থেকে দু’চার আনা সরাবার বিদ্যাও অচিরেই আমরা রপ্ত করে ফেললাম। কেউ আসছে কিনা দেখার জন্য ছোটদি দুয়ারের দুই কপাট বন্ধ করে তাতে একটুখানি ফাঁক রেখে পাহারা দিত। আর, দাদার পকেট-সাফাইয়ের পবিত্র কাজটি সারতাম আমি। পরের দিন ইস্কুল গেলে সেই রোজগারের পয়সা আমরা কাজে লাগাতাম। হজমি-গুলির প্রতি আমাদের আকর্ষণ ছিল খুব। ওই হজমি কিনে ভাগ করে কাগজে মুড়ে নিয়ে দু’জন দুই স্কুলে ঢুকে যেতাম। হজমি-অলা একটুকরো খবরের কাগজের মুড়ে আমাদের কালো রঙের একটা নুন দিত। সেই নুন একটু জিভে ঠেকালেই সারাদেহে একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে যেত। ‘ইলেকট্রিক নুন’ হিসেবে সেই নুনের একটা গণ-পরিচিতি ছিল।

রাম ব্যানার্জী লেনে আমাদের থাকার ঘর ছিল দোতলায় আর রান্নাঘর ছিল তিনতলায়। স্বাভাবিকভাবেই দিনের অধিকাংশ সময়টা বৌদি থাকত ওপরে। আমরা দুই ভাইবোন দোতলার ঘরে স্বাধীন জীবনযাপন করতাম। সেদিন হল কি, আমি তো দাদার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা এক-আনার কয়েন প্রায় বের করে এনেছি, তখন দরজায় পাহারায় থাকা ছোটদিকে ওর পিছনের হাত ক্রমাগত নেড়ে জানান দিল, বৌদি আসছে। ছুটে এসে দুজনে পড়তে বসে গেলুম। আমার রোজগারের আনিটা লুকিয়ে ফেললাম অঙ্ক বইতে। বৌদি ঘরে ঢুকে দেখল আমরা দুজন দুলে-দুলে জোরে জোরে পড়ছি। বৌদি এটা-ওটা নিয়ে আবার ওপরের রান্নাঘরে উঠে গেল।

দাদা রাতে একটু আগে বাড়ি ফিরলে আমাদের পড়াতে বসত। ওই দিনও দাদা সন্ধের মধ্যেই বাড়ি ফিরে চা-টা খেয়ে আমাদের পড়াতে বসল। অঙ্কের ভিত ছিল আমার খুবই কাঁচা। তাই আমাকে পড়াতে বসলে দাদা প্রথমেই অঙ্ক নিয়ে পড়ত। সেদিনও দাদা পড়াতে বসে বললো, কই, তোর অঙ্কের বইটা লইয়্যা আন দেখি।

আর সেই অঙ্কের বইতেই যে দাদার পকেট থেকে আত্মসাৎ করা আনিটা টং করে মেঝেতে পড়ে গড়িয়ে গিয়ে দাদার সামনে চিৎ হয়ে পড়ল। আমি ও ছোটদি মাথা নিচু করে বসে ট্যাঁরা চোখে এ-ওর দিকে দেখি। ভাবটা এমন, আমরা যেন কিছুই জানি না!

দাদা পড়াতে বসলেই একটা ছোট বেত নিয়ে বসত। অচিরেই সেই বেতটা যে এবার আমার পিঠের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। কেন না, দাদা ছোটদিকে কখনও মারত না।

“অ্যাই পয়সা কোথ থিকা তোর বইয়ের মইধ্যে আইলো?”- আনিটা হাতে তুলে দাদার রাঙা চোখের জিজ্ঞাসা।

আমি কোনো জবাব দিই না। মাথা নিচু করে থাকি। দাদা ছোটদিকে জিজ্ঞাসা করে- “তুই জানস কিছু?” ছোটদিও নীরব। ভয়ে একেবারে কুঁচকে আছে। দাদা আমার পিঠে সপাং সপাং করে বেতের ঘা মারে। আমি দুহাত দিয়ে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করি। “এই পয়সা কোথা থেকে আইলো, ক!” – আর মার। ছোটদি কেঁদে বলে ওঠে- ওরে আর মাইরো না দাদা! আমি কইতাসি পয়সা ও কোথায় পাইসে।” দাদা বলে, “ তোরে আর কইতো হইবো না। অ্যাই আনি আমার জামার পকেটে ছিল।”- এই বলেই আমার পিঠে আরেক ঘা বেত। সঙ্গে মন্তব্য, অ্যাই বয়সে পকেট মারতে শিখা গেছে। বড় হইলে চোর ডাকাত হইবো।

তারপর দাদা আমাকে অঙ্কের খাতা নিয়ে আসতে বলে। আমি তখন চোখের জলে, নাকের জলে একাকার। কিন্তু অঙ্কের খাতা কী করে দেখাব দাদাকে! দাদা গতকাল যে অঙ্কগুলো করে রাখতে বলে গিয়েছিল তার একটাও আমি যে করতে পারিনি!

ট্যাঁরা চোখে দেখবার চেষ্টা করি, দাদা বেতটা কোথায় রেখেছে। দাদা ধমকে বলে, “কই, অঙ্কের খাতা বাইর কর।”

আমি অঙ্কের খাতা কিছুতেই খুঁজে পাই না।

(ক্রমশ)

Developed by DXDasia