সংবিধানেরও উপরে রামের আসন পাততে চায় হিন্দুত্ববাদীরা!

রাম এখন হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক দেবতা অর্থাৎ পলিটিক্যাল গড

লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রা থেকে ধরলে গত তিন দশকে এই হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের পাশাপাশি বহু রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক হাজার হবে। যদিও এখন অনেকেই সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইছেন। যেমন, কেউই প্রায় বলছেন না, সুপ্রিম কোর্টে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যণ সিং সরকার সেই বিতর্কিত সৌধ রক্ষায় কোনও ব্যবস্থা নেননি। উল্টে কল্যাণ সিং পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিয়মিত গর্ব করে বলতেন, ঠিকাদারকে দিলে একমাস লেগে যেত, কর-সেবকরা দু-দিনে ভেঙে দিয়েছে ওই সৌধ। সেই জন্যই কল্যাণ সিং এখন বীর। এখন উত্তরপ্রদেশের স্কুলে ছোটোদের কল্যাণ সিং-এর জীবনী পড়ানো হয়। কার্যত বলা হয়, ছোটোরা যেন বড়ো হয়ে তাঁর মতো হয়ে ওঠে। যদিও কল্যাণ সিংয়ের সরকারের তৎকালীন ডিজিপি প্রকাশ সিং অবসরের পর ২০২২ সালে ‘দ্য স্ট্রাগল ফর পুলিশ রিফর্মস ইন ইন্ডিয়া’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। রাজনীতি কীভাবে পুলিশকে চালায় তার প্রমাণ হিসেবে প্রকাশ লিখেছেন, তিনিও চেয়েছিলেন অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি হোক, কিন্তু ১৯৯২-এ যখন উত্তরপ্রদেশের সরকার সুপ্রিম কোর্টে প্রতিশ্রুতি দিল, তারা বাবরি মসজিদ রক্ষা করবে, প্রকাশ লিখছেন, “তখন রাজ্যের ডিজিপি হিসেবে আমার সর্বোচ্চ ধর্ম ছিল ওই সৌধ রক্ষা করা।”

উনিশ শতকে স্যামুয়েল বোর্ন-এর তোলা বাবরি মসজিদের ছবি

কল্যাণ সিং এবং আরও কয়েকজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুটি বৈঠকে বাবরি মসজিদের নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন প্রকাশ। মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এল, একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বিশেষ ধরনের কাঁটাতার (কনসার্টিনা কয়েল) সরিয়ে ফেলার। বাধা দিলেন প্রকাশ। ফল হল, তাঁকে বদলি করে দেওয়া। তারপর কী কী ঘটেছিল সবই এখন জানা।

এসব তো গেল পুরোনো কথা। নতুন কথা হল এটাই যে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, বিজেপির মন্দির রাজনীতি ভারতীয় রাজনীতির মর্মবস্তুকে অনেকটাই বদলে দিতে পেরেছে। বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে। আজ আর দেশে এমন কোনও রাজনৈতিক দল নেই যে দল জওহরলাল নেহরুর ভাষায় বলবে কোনও ধর্ম-নিরপেক্ষ সরকারের কোনো রকম মন্দির, মসজিদ, গির্জার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। মহাত্মা গান্ধী সারা জীবন ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ গেয়েছেন, কিন্তু তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনও দিন কোনো মন্দিরে যাননি। একবার গিয়েছিলেন, কারণ সেখানে দলিতদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল। আজ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল, ধর্মস্থানকে না-ছুঁয়ে আর রাজনীতি করতে পারছে না। এই পরিবর্তন ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি আনতে সক্ষম হয়েছে।

নেহরু ও গান্ধী

পলিটিক্যাল পাওয়ার বা রাজনৈতিক ক্ষমতা একটা ‘মিথ’-কে মানুষের সামনে তুলে ধরে ভোট চায়। সমাজবাদীরা বা কংগ্রেস এক ধরনের স্বপ্ন মানুষকে দেখিয়েছিল। কিন্তু তারা দু-পক্ষই খুব বাজে ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিজেপি একটা রামরাজ্যের স্বপ্ন তুলে ধরেছে। বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে সেই স্বপ্ন এখন ঝড়। তাতে কি সামনের ভোটে লাভ হবে বিজেপির?  

মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ। এই ৯টা রাজ্যে গত লোকসভা ভোটে বিজেপি এবং তার সঙ্গীদল পেয়েছিল ১৯৮টি আসনের মধ্যে ১৯২টি আসন। ফলে হিন্দি বলয়ে এই অঞ্চলে বিজেপির আসন বৃদ্ধির কোনও সম্ভাবনা প্রায় নেই। ১০ বছরের অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির ফলে আসন কমত ২০২৪-এর ভোটে। কিন্তু রাম মন্দির সেই কমাটা রুখে দেবে বলে মনে হচ্ছে। আরও একটা বিষয় আছে, মহারাষ্ট্রে এনডিএ পেয়েছিল ৪৮-এ ৪৭ এবং বিহারে বিজেপি এবং তার সঙ্গীদল পেয়েছিল ৪০-এ ৩৯। মহারাষ্ট্রে পরিস্থিতি ততটা আগের মতো নেই। বিহারে নীতীশ কুমারকে ফিরিয়ে নিয়ে দুর্গ রক্ষার চেষ্টা সফল হয়েছে। ফলে এই দুই রাজ্যে রাম মন্দিরের লহর এবারে কটা  আসন দেয় বিজেপিকে সেটা সময় বলবে।

দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক, অন্ধ্র, তামিলনাড়ু, কেরল, তেলেঙ্গানা, পুদুচেরি এই ছয় রাজ্যে লোকসভা আসন ১৩০টি। এর ভিতর কর্নাটকে বিজেপি ২৮টির মধ্যে ২৫টি আসন পেয়েছিল ২০১৯-এ। এবার কর্নাটকের দলিত নেতা মল্লিকার্জুন খার্গে কংগ্রেসে সভাপতি। কর্নাটক, তেলাঙ্গানায় বর্তমানে কংগ্রেসের শাসন। সব মিলিয়ে বিন্ধ্য পর্বতের এই ধারে অর্থাৎ দক্ষিণ ভারত নিয়ে বিজেপির সংশয় প্রবল। হিন্দি বলয়ে হিন্দু-হিন্দির পক্ষে ঝড় উঠলে দক্ষিণ ভারত উল্টো পথে হেঁটেছে, এমন নজির আমরা ১৯৭৭-এর ভোটে দেখেছি। ২০২৪-এ কী হয় জানতে আমাদের কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।

মহাত্মা গান্ধী সারা জীবন ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ গেয়েছেন, কিন্তু তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনও দিন কোনো মন্দিরে যাননি। একবার গিয়েছিলেন, কারণ সেখানে দলিতদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

আশি এবং নব্বইয়ের দশকে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানিকে বলতে শোনা যেত, ‘পজিটিভ সেকুলারিজম’-এর কথা। যার ব্যখ্যা তিনি দিলেন, সবার জন্য সুবিচার, বিশেষ ছাড় কাউকে নয়। এখন কিন্তু বিজেপি নেগেটিভ বা পজিটিভ, কোনও ধরনের সেকুলারিজমের কথাই আর বলে না। শুধু তাই নয়, ভারতের প্রায় কোনও রাজনৈতিক দলকেই আর দেখা যায় না কপাল ঠুকে বলতে, আমারা সেকুলারিজমের পক্ষে।

২০২৪-এ বিজেপি এককভাবে ৩০০-৩৫০ আসন নিয়ে ক্ষমতায় এলে আরও অনেক কিছু ঘটতে পারে। ভারতের সংবিধানের শুরুতেই যাকে প্রিঅ্যাম্বেল বলা হয়, সেখানে তিনটি শব্দ আছে, ‘সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র’। এর ভিতর সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, হিন্দুত্ববাদীদের মন্দির আন্দোলনের চাপে, তার অর্থ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে রইল বাকি গণতন্ত্র। আমরা সংসদে গত শীতকালীন অধিবেশনে যেভাবে শত শত বিরোধী সাংসদকে বহিষ্কার হতে দেখেছি, যেভাবে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত নতুন আইনে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে এরকম আশঙ্কার কারণ রয়েছে, ভারত সংসদীয় গণতন্ত্রকে ক্রমেই একটি নির্বাচনী গণতন্ত্রে পরিণত করে তোলার চেষ্টা চলছে। যেখানে সংসদ, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান থাকবে শাসকদলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। পৃথিবীতে অনেক দেশে এমন ঘটেছে। পুতিনের রাশিয়া তার একটা কাছাকাছি উদাহরণ।

রাম মন্দির, অযোধ্যা

রাম মন্দির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ঈশ্বর তাঁকে দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। এক সময় রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন। নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর দলের নেতারা কেউ বলছেন, স্বামী বিবেকানন্দ, কেউ তাঁকে অবতার ভাবছেন। এই ধরনের ভক্তিকে খুব ভয় পেতেন জওহরলাল নেহরু।

১৯৩৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত রামানন্দ চ্যাটার্জির ‘দ্য মর্ডান রিভিউ’ পত্রিকায় ‘চাণক্য’ ছদ্মনাম নিয়ে জওহরলাল নিজেই নিজের সমালোচনা করে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “জওহরলাল নেহরু যত বড়ো নেতাই হোন না কেন, তাঁকে ঘিরে কোনও ধরনের ধ্বনি দেওয়া স্লোগান দেওয়া, কর্মীদের ভক্তের মতো আচরণ করা উচিত নয়।” লেখাটির শিরোনাম ছিল, “উই ওয়ান্ট নো সিজারস”।

একাধিক সমীক্ষায় এটা প্রমাণিত যে হিন্দি বলয়ে, যারা বিজেপিকে ভোট দেন না, তাদেরও একটা বড়ো অংশ রাম মন্দির চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের রাম মন্দির আর এখন যেভাবে নরেন্দ্র মোদি রামকে তুলে ধরছেন দুটো এক জিনিস নয়।

শেক্সপিয়রের নাটকে, জুলিয়াস সিজার যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসার পর জনতার তাঁকে ঘিরে উল্লাস, তাঁকে রাজ মুকুট পরানোর চেষ্টা দেখে ব্রুটাসদের মনে হয়েছিল, সিজার গণতন্ত্র থেকে সরে যাচ্ছেন। তিনি রাজা হতে চাইছেন। সেই নাটকের অনুষঙ্গ মাথায় রেখেই সম্ভবত নেহরু তাঁর লেখার ওইরকম শিরোনাম বেছে নিয়েছিলেন। লেখা শুরু হচ্ছে এরকম ভাবে। “রাষ্ট্রপতি জওহরলালকি জয়”। (তখন কংগ্রেস সভাপতিকে হিন্দিতে রাষ্ট্রপতি বলার চল ছিল)। চাণক্য ছদ্মনামে জওহরলাল লিখছেন, “রাষ্ট্রপতি জওহরলাল চলেছেন অপেক্ষারত ভিড়ের মধ্যে দিয়ে, জয়ধ্বনি শুনে নেতা আস্তে করে দুই হাত তুলে নমস্কারের ভঙ্গিমা করলেন, মুখে তখন তাঁর স্মিত হাসি, সেই হাসি দেখে ফের জয়ধ্বনি শোনা গেল জওহরলালকি জয়।” তিনি আরও লিখছেন, “জওহরলালের মতো মানুষেরাও বদলে যেতে পারেন স্তাবকতার পরিবেশে, যতই তাদের ভালো কাজ করার ক্ষমতা থাকুক না কেন, তারাও হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। তখন এই ধরনের জওহরলালের মতো নেতারা মুখে হয়তো আন্তরিক ভাবেই বলছেন তিনি সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা জানেন, প্রতিটি মানুষের মন হৃদয়ের অধীন, আর সেই হৃদয়ের অন্তরের ইচ্ছাকে সমর্থন করার জন্য যুক্তি সাজাতে বেশি সময় লাগে না। ফলে একটু এদিক থেকে ওদিক হলে এই জওহরলালেরাও ডিক্টেটর হয়ে উঠতে বেশি সময় নেবেন না।

কোনও রাষ্ট্রনেতা এইভাবে নিজের নাম গোপন রেখে প্রকাশ্যে নিজের সমালোচনা করছেন, সারা পৃথিবীতেই এ এক নজির বিহীন ঘটনা। কারণ জওহরলাল আসলে শুধু মানুষকে সতর্কই করছেন না, ভবিষ্যতে দেশে যাতে কোনও জনপ্রিয় নেতা ডিক্টেটর না হয়ে ওঠেন, এ যেন তারই আগাম সতর্কবার্তা। এইখানেই জওহরলাল অনন্য। সবার থেকে আলাদা।

প্রায় একই কথা বলেছিলেন বাবাসাহেব আম্বেদকার কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লির শেষ দিনে। আম্বেদকার বলেছিলেন, “এই যে সংবিধান আমরা তৈরি করলাম তাকে রক্ষা করতে হবে। যেদিন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলীয় আদর্শকে সংবিধানের উপরে স্থান দেবে সেদিন এই সংবিধান অকেজো হয়ে যাবে।”

ফের রাম মন্দির প্রসঙ্গে ফেরা যাক। একাধিক সমীক্ষায় এটা প্রমাণিত যে হিন্দি বলয়ে, যারা বিজেপিকে ভোট দেন না, তাদেরও একটা বড়ো অংশ রাম মন্দির চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের রাম মন্দির আর এখন যেভাবে নরেন্দ্র মোদি রামকে তুলে ধরছেন দুটো এক জিনিস নয়। ভারতীয়রা বহু দেব-দেবীর পুজো করে। একমাত্র ভারতীয়রাই পীরের দরগা, গির্জা, বৌদ্ধ মন্দির, গুরুদ্বার, সব ধর্মক্ষেত্রে গিয়ে মাথা ঠেকায়। তার মধ্যে রামও আছেন। কোথাও কোথাও রাবণেরও পুজো হয়। বাংলা কাব্যে মধুসূদন রাবণকে অনেক বড়ো করে এঁকেছেন তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যে। কিন্তু এখন হিন্দুত্ববাদীরা চাইছেন একজন রাষ্ট্রীয় ঈশ্বর। কতটা সফল হবে তারা, সে পরের কথা। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি দেখাতে চাইছেন, সবার উপরে রাম, তিনি তার প্রতিনিধি।

রাম এখন হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক দেবতা। পলিটিক্যাল গড। সব বিরোধীদলকে তারা এখন রাবণ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে। কিন্তু অন্যায়ভাবে বালীকে বারবার হত্যা করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন অনেকে।

*কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব।
 

Developed by DXDasia