
ফেলে দেওয়া সব কবিতা লুকিয়ে খাতায় টুকে রাখতেন বৌঠান সরোজিনী
রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদ, চলন্তিকা অভিধান রচিয়তা এবং ভূশুণ্ডির মাঠে-র মতো গল্পের লেখক, রাজশেখর বসু দু’বছর বয়সে বায়না ধরতেন, হয় বাঘ দেখতে দেখতে দুধ খাবেন না হলে হাতির পেটের নিচে বসে দুধ খাবেন। রাজশেখরের দাদা শশিশেখর বসু প্রায় ৬৩ বছর আগে, তাঁর বই ‘যা দেখেছি যা শুনেছি’-তে ছোট ভাইয়ের যে ছোট্ট জীবনকাহিনি লিখেছিলেন, সেই ফটিক (রাজশেখরের ডাক নাম) আজও আমাদের অনেকেরই অচেনা।
শশিশেখর সারা জীবন ইংরেজিতে লেখা-লেখি করার পর ৭৮ বছরে এসে বাংলা লেখা শুরু করেন। তারই ফসল এই বই ‘যা দেখেছি যা শুনেছি’। তাঁর এই বই মূলত ব্যঙ্গ রচনার সংকলন, তারই সঙ্গে আলো-বাতাসের মতো মিশে আছে পাণ্ডিত্য। সৈয়দ মুজতবা আলী শশিশেখরের রচনা সম্পর্কে লিখেছেন (যা এই বইয়ের সঙ্গে বাড়তি পাওনা), ‘শশিশেখর আসলে পণ্ডিত। আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই, তিনি যদি ‘উচ্চ’ জ্ঞানের যা পুঁজি জমিয়েছিলেন, তার সিকিভাগও পাণ্ডিত্যের বাজারে ভাঙাতেন তবে হালের সমাবর্তন উৎসবে একখানা উত্তম পিএইচ ডি কিংবা ডি লিট উপাধি পেতেন….সৃষ্টি কর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ তিনি যে মাঝে মাঝে শশিশেখরের মতো মাল ছাড়েন’।
কী নিয়ে লিখতেন শশিশেখর? সেই অদ্ভুত বিষয়-তালিকায় রয়েছে কালোজাম থেকে কুম্ভমেলা, শব্দের জাত বিচার থেকে সিপাই বিদ্রোহ। তাছাড়া তাঁর লেখায় একটা বিদ্রোহ আছে, আমাদের মনের ভেতরের অনেক মন্দির অনেক প্রতিষ্ঠানকে তিনি আঘাত করেছেন সচেতন ভাবেই। নেতাজিকে নিয়ে যিনি হালকা লেখায় দুটো ঠাট্টা জুড়ে দিতে পারেন, তিনি অবলীলায় লিখে ফেলেন, ‘ফটাস করে যেন একটা খুদিরাম মার্কা বোমা রাস্তায় ফাটল’। তাঁর লেখা যে প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্ব পাবে না বোঝাই যায়। সেটাই বোধহয় অন্যতম কারণ তাঁর বই প্রচার না পাওয়ার।
শশিশেখরের মতের সঙ্গে অনেকের মত হয়তো মিলবে না। কিন্তু লেখা, যুক্তি, তথ্যের জোর এতটাই যে শেষ না করে ছাড়াও যাবে না। ‘শব্দের জাত’ প্রবন্ধে শশিশেখর দেখিয়েছেন, বহু বাংলা শব্দকে কীভাবে ভদ্রতার পোশাক পরানো হয়েছে। অনেক শব্দ নিয়েই লিখেছেন তিনি। তাঁর মত– ইংরেজি অশ্লীল শব্দ ফ্রেঞ্চ পরিচ্ছদ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, বাংলায় এমন শব্দকে ঢেকে দেওয়া হয় ইংরেজি বা সংস্কৃত বোরখা দিয়ে। এতে শশিশেখরের আপত্তি। তাঁর মতে, ‘বাংলা ভাষা কি দাঁড়কাকের মতো কদর্য যে ময়ূরপুচ্ছে সাজিয়ে প্রবঞ্চনা করতে হবে?’
শব্দকে কী করে খুন করা হয়, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে শশিশেখর লিখেছেন, পশ্চিমে হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েটে নিয়মিত চালু কথা হল ‘খানগি ফাইল’ (কনফিডেনশিয়াল ফাইল), ‘খানগি কেরানি’ (কনফিডেনশিয়াল ক্লার্ক), ‘খানগি চিঠি’ (কনফিডেনশিয়াল চিঠি)। ‘বাঙালিরা গোপনীয়া লুক্কায়িতা নারীকে এই নাম দিয়ে শব্দটাকে ফাঁসি দিল। উচ্চারণেরও বিকৃতি ঘটল’।
প্রয়াগ নিয়ে লিখতে গিয়ে যা লিখেছেন তাতে বোঝা যায় পুণ্য অর্জন লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন, বাঁদর কাঁধে সাধু, ভাল্লুকের বাচ্চা কোলে সাধু, মাফলারের মতো পাইথন জড়ানো সাধু। এক সাধুবাবা আবার গাছের উপর থেকে ঝুলছেন, নিচে আগুন জ্বলছে, ঝুলে ঝুলে তিনি এটা ওটা খাচ্ছেন আর তাঁর এক চেলা দূরে বসে সাধুর গলায় পাক লাগানো দড়িটা মাঝে মাঝে টেনে চলেছে। এই সাধুর নাম লেখক দিয়েছেন ‘টানাপাখা সাধু’। তার পর তিনি প্রশ্ন তুলেছেন মানুষ কি ভেবে-চিন্তে সন্ন্যাসী হয়? না কি হঠাৎ কারও উপর রাগ করে সন্ন্যাসী হয়?
কুম্ভমেলা নিয়ে তাঁর রচনায় মেলার রকমারি খাবারের জিভে জল আসা বিবরণের পর শশিশেখরের মন্তব্য, ‘মানুষকে ভগবান খেতেই জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু কুম্ভমেলার লক্ষ লক্ষ ভিখারীর কোনও গতি করলেন না। দেখে জীবনে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়’। ‘গ্রান্ডট্রংক’ রোড নিয়ে শশিশেখর ‘মিউটিনিতে ‘গ্রান্ডট্রংক’ রচনায় লিখেছেন, ডাক বাংলায় পৌঁছনোর এক মাইল আগে থেকে দুই ঘোড়ায় টানা ডাকের গাড়ির লোক বিউগল বাজিয়ে জানান দিতে থাকে, গাড়ি আসছে ঘোড়া বদল হবে, ঘোড়া প্রস্তুত রাখো। এই যে বিউগলের ‘ডাক’ শোনা যেত, হইচই পড়ে যেত ঘোড়া রেডি করার, এই বিউগলের ডাক থেকেই ‘ডাক’ শব্দের জন্ম যার মানে চিঠিপত্র। সেখান থেকেই পোস্ট অফিসের বাংলা ডাকঘর, মত শশিশেখরের।
‘খাঁজা কাঁঠাল’-এ শশিশেখর যা লিখেছেন তা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না অনেকেরই। তিনি লিখেছেন, কাঁঠাল কখনও কখনও প্রাণও বাঁচায়। একটি নৌকায় ৫০ জন কোথাও যাচ্ছিল। ওই নৌকায় ৫০টা কাঁঠালও ছিল। নৌকা হঠাৎ ডুবে যায় মাঝ নদীতে। প্রত্যেকে লাইফবোটের মতোএকটা করে কাঁঠাল বুকে চেপে সাঁতরে নদীর কিনারায় উঠে এলো। শশিশেখর অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, সব কাঁঠাল কিন্তু ভাসে না। সব কাঁঠালের এমন গুণ নেই।
‘আমশাস্ত্র’ লেখায় যেসব আমের নাম পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে আছে, রাঢ়ী, সুকুল, সিফিয়া, আলফানজো, নীলমভারী, হিলসাপেটি, পেয়ারাফুলি, মধগুলগুলি। রামের আংটি নিয়ে সীতাকে অশোকবনে যখন দেখতে লঙ্কায় গিয়েছিল হনুমান, শশিশেখর লিখছেন, আমভক্ত হনুমান এত রামভক্ত ছিল যে জঙ্গলে বসে আম খেয়ে খেয়ে আঁটিগুলো সব ছুড়ে ছুড়ে ফেলেছে অযোধ্যায় আর সীতার বাপেরবাড়ি মিথিলার দিকে তাই ওই সব যায়গায় ভালো আম হয়।
আরও পড়ুন
নেতাজির নির্দেশে ‘চাকরি’ গেল শিবরামের
‘নেতাজির বার্তাবহ’, ‘জাতি নিপাত’, ‘ভালুকের আফিম’, ‘পর্দা পদ্ধতি’, ‘মাসী-পিসী ডাক্তার’ ইত্যাদি পর পাঠক পৌঁছবেন পরশুরাম মানে রাজশেখর বসুর জীবনকাহিনিতে। সেখানে মিলবে রাজশেখর সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য। যেমন রাজশেখর ডাক্তারি পড়েননি কিন্তু তিনি মড়া কাটা শিখতে যেতেন কলেজে পড়ার সময়। বাড়িতে তাঁর বেশ বড় ল্যাবরেটারি ছিল নিজে হাতে তৈরি। বাড়ির লোকজনের অসুখ-বিসুখ হলে রাজশেখর ওষুধ লিখে দিতেন। সে সময় রাজশেখর গীতার কিছু কিছু অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। সে সব, শশিশেখর লিখেছেন তিনি নাকি টাইমস অফ ইন্ডিয়া, মাদ্রাজ মেল এবং পাইওনিয়ার পত্রিকায় নিজের নামে ছেপেছিলেন।
১২ বছর বয়সে রাজশেখর পড়তে বসে কবিতা লিখতেন। সেসব কবিতা লিখে কাউকে না দেখিয়ে দলা পাকিয়ে ফেলে দিতেন। সবার অজান্তে ওই দলা পাকানো কবিতা সংগ্রহ করে রাখতেন শশিশেখরের স্ত্রী, ১৩ বছরের বৌঠান সরোজিনী। পরে বাপের বাড়ি গিয়ে সরোজিনী সেসব কবিতা নতুন খাতায় টুকে রাখতেন। এরকম দু’খানা খাতা ছিল সরোজিনীর। খাতার উপরে লেখা ছিল ‘মেজো ঠাকুরপোর কবিতা’। সেই খাতার একটি কবিতা-
‘বাস বিতরণ কুসুমের ব্রত/ সেব্রত পালিয়া মরিয়া যায়/ কাঁদে কি কুসুম মানবের মতো/ বিপরীত রীতি দেখি ধরায়’। সরোজিনীর এই গোপন সংগ্রহের কথা পরে জানতে পেরেছিলেন শশিশেখর । কিন্তু কখনও সেই জগতে প্রবেশের চেষ্টা করেননি। জানতে চাননি কার লেখা। রাজশেখর মারা যাবার পর একদিন ওই খাতা দুটি সরোজিনী গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।
হয়তো ‘চুরি’ করা সম্পদ ধরে রাখতে চাননি। হয়তো জলের কাছেই বলেছিলেন মনের কথা।
যা দেখেছি যা শুনেছি, মিত্র ও ঘোষ, দাম- ৬০টাকা
