
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২৫
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এমএ পরীক্ষার পাঠ চুকিয়ে কয়েক মাস খড়গপুর রেলওয়ে স্কুলে চাকরি করেছিলেন সুচরিতা দাশ। তার পর সেই চাকরি ছেড়ে চলে যান তমলুক। সেখানে এসে তমলুক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে জীবনের সব অধ্যাবসায়, শ্রম, যোগ্যতা, আত্মত্যাগ দিয়ে খড়ের ছাউনির ঘর ও ৬-৭ জন ছাত্রী নিয়ে চলতে থাকা সেই স্কুলকে তিল তিল করে গড়ে তোলেন সুচরিতা। আজ এই স্কুলটিই ‘রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’ নামে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন, খ্যাতনামা ও বৃহত্তম স্কুল। সুচরিতা দাশ এখন প্রয়াত, কিন্তু এই স্কুলের জন্য তাঁর কাজের ধারা, প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে তাঁর ভূমিকা, সারা জীবন স্কুলের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করা, সবটাই এই স্কুলের বর্তমান শিক্ষিকাদের চলার পথের প্রেরণা।
সুচরিতা দাশ, জীবনানন্দ দাশের একমাত্র বোন। ডাকনাম খুকু। জন্ম ১ এপ্রিল ১৯১৫। মৃত্যু ২২ মে ১৯৮০। বিয়ে করেননি। তমলুকে চাকরি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসা দাদা ও বোনের জীবনে কতটা দাগ কেটেছিল, তা জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তাঁর *কথোপকথনের একটি অংশ উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে। রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় তৈরি, নামকরণ, ইতিহাস সবটাই চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে এই কথোপকথন থেকে—
কলকাতার ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িটাই জীবনানন্দ দাশের কাছে যেন হয়ে উঠেছিল বরিশালের সর্বানন্দ ভবন। একদিন বিকেলে। বাইরে বেলা পড়ে এসেছে। দারুণ একটা হাওয়া দিচ্ছে।
জীবনানন্দ তাঁর বোন সুচরিতাকে বললেন, “আয় বোস।”
সুচরিতা চেয়ার টেনে দাদার সামনে বসল।
“তোর স্কুল কেমন চলছে খুকি?”
“চলছে এক রকম। কিন্তু খুব খাটতে হচ্ছে।”
“কী রকম?”
“মেদিনীপুর জেলা শহর থেকে বেশ দূরে স্কুলটা। যদিও কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে। কিন্তু একেবারে গ্রাম এলাকা। বিদ্যুৎ নেই, ভালো রাস্তা নেই। এখন কিছুটা উন্নত হয়েছে। আমি প্রথম যখন ওখানে যাই, মানুষের মধ্যে খুব একটা সচেতনতাও ছিল না। স্কুলটা প্রথমে ছিল জুনিয়র স্কুল – ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু ভালো একটা স্কুল হবে, সে আশা সকলের ছিল।”
“আচ্ছা। পরে কী হল?”
“স্কুলের পরিচালক সমিতি ও সাধারণ মানুষ বিদ্যালয়টিকে দশম শ্রেণিতে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে মহিষাদলের রাজ পরিবারের আর্থিক আনুকূল্যে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মিত হয়।”
“কিন্তু স্কুলের নাম রাজকুমারীর নামে হল কেন?”
“কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কর্তৃপক্ষ সেই পরিবারের প্রয়াত রাজকুমারীর বিদ্যালয়টির নামকরণ করেন – রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। এতে কেউ আপত্তি তোলেনি। বরং সবাই খুশিমনে মেনে নিয়েছে।”
“বাহ্। ওখানকার মানুষজন নিশ্চই ভালো। বিদ্যানুরাগী। তমলুকে তুই স্কুলে যোগ দিয়েছিস, তা অনেকদিন হয়ে গেল, না রে খুকি?”
“হ্যাঁ, দাদা। ১৯৪০ সালের পয়লা এপ্রিল জয়েন করি। এখন তো স্কুল অনেক বড়ো হয়েছে। বরিশালের মতো বিশাল পুকুরের পাশে স্কুলটা। দূর থেকে যারা পড়তে আসে, তাদের থাকার জন্য হস্টেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষিকাদের জন্য কোয়ার্টার আছে। ফুলের বাগান, গাছপালা এবং অডিটোরিয়াম আছে। স্কুলের সঙ্গে লাগোয়া ধানখেতও আছে। সেই বরিশালের মতো, একেবারে গ্রামবাংলার পরিবেশ।”
জীবনানন্দ বললেন, “একবার তোর কাছে গিয়ে কয়েকদিন বেড়িয়ে আসব।”
“নিশ্চয়ই যাবে। কবে যাবে দাদা? আমি খুবই খুশি হব। ওখানে গেলে তোমার খুব ভালো লাগবে।”
“দেখি, সময় করে একবার বেড়িয়ে আসব।”
“এক কাজ কর, সমর ও বৌদিকে নিয়ে এসো।”
“তা হলে সবাই মিলে একসঙ্গে বেড়াতে যাব।”
*অংশটি নেওয়া হয়েছে দেশ পত্রিকা, তীর্থ সংখ্যায় (১৭ মার্চ, ২০২৩) প্রকাশিত মাসউদ আহমাদের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘কাঞ্চন ফুলের কবি’ থেকে।


এই হলো রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ঘিরে দাদা আর বোনের আলাপচারিতা। এখন রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রায় ২ হাজার ছাত্রী। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা আছে। স্কুলে বিজ্ঞান ও কলা বিভাগ একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার ব্যবস্থা আছে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, কম্পিউটার ও নিউট্রিশানের ভালো ল্যাবরেটরি আছে। আছে ভোকেশনাল পাঠক্রমের ব্যবস্থা।
কম্পিউটার ল্যাব
২০২২ সালে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিকে দশম স্থান পেয়েছিল এক ছাত্রী। তবে ২০২৩ সালের মাধ্যমিকে ৬৮০ সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে এই স্কুলের ছাত্রী স্বত্তিকা জানা (Sattwika Jana)। এছাড়া মোটামুটি সব ছাত্রীই ৬০০-র বেশি নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছে৷

স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা আদক জানালেন, “আমরা সবাই রিতাদি অর্থাৎ স্কুলের প্রতিষ্ঠাত্রী প্রধান শিক্ষিকা সুচরিতা দাশের আদর্শ মেনে চলি। এখনও রিতাদির সময়কার দুই ছাত্রী এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের আমরা অনুসরণ করি। নিজের জীবনটাই রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন রিতাদি। আমি ওনার পদে এখন কাজ করি। খুব শ্রদ্ধা মিশ্রিত একটা ভয় আমার মধ্যে কাজ করে। মনে হয় রিতাদির আত্মত্যাগের কাছে আমি তুচ্ছাতিতুচ্ছ, তাঁর নখের যোগ্যও আমি নই, তাঁর চেয়ারটায় বসতে ভয় করে৷ রিতাদির পরে আমি এই স্কুলের চতুর্থ প্রধান শিক্ষিকা।”

প্রধান শিক্ষিকার কথায় আরও জানা গেল, রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ্য ও অক্লান্ত পরিশ্রম করা, আন্তরিক শিক্ষিরা যেমন আছেন, তেমন আছে স্কুলের অত্যন্ত মেধাবী সব ছাত্রীরা। স্কুলে এই মুহূর্তে ৬০ জন শিক্ষিকা। অশিক্ষক কর্মচারীও ৬ জন আছেন। স্কুলে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে কেউ অকৃতকার্য হয় না। মেয়েরা অনেকেই খুব ভালো আঁকতে পারে, অনেকেই আবার নাচে খুব পারদর্শী। স্কুল লেভেলের প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয় স্কুলের মেয়েরা। স্কুলে কোনও ড্রপ আউট নেই, কন্যাশ্রী এক্ষেত্রে খুব সহায়কের ভূমিকা নিয়েছে।


পূর্ব মেদিনীপুরের অন্যতম খ্যাতনামা এই স্কুল এখনও প্রথম প্রধান শিক্ষিকা সুচরিতা দাশের আদর্শকে সামনে রেখে ছাত্রীদের শিক্ষাব্রতী করে তুলছে। শিক্ষিকা থেকে ছাত্রী সবার একটাই লক্ষ্য, সুচরিতা দাশের দেখানো পথ থেকে কখনও যেন চ্যুত না হই।
স্থানীয় মিউনিসিপালিটি এলাকা থেকে যেমন ছাত্রীরা পড়তে আসে, তেমনই ১০/১২ কিলোমিটার দূর থেকেও এই স্কুলে মেয়েরা পড়তে আসে। “প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের সঙ্গে সঙ্গে যাদের পরিবারে শিক্ষাগ্রহণের ধারাবাহিকতা আছে, তারাও ভর্তি হয় এই স্কুলে। স্কুলটা গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড, তাই ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা রাখতেই হয়। এসসি, এসটি, সংখ্যালঘু পরিবার থেকেও আমাদের স্কুলে মেয়োরা পড়তে আসে। এমনও হয়, আমরা অনেক সময় সবাইকে ভর্তি নিতে পারি না। স্কুলে জায়গার সমস্যা কিছুটা আছে। তাছাড়া শৌচালয়ের একটা সমস্যা আছে। আমাদের স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির প্রধান আমাদের এসডিও সাহেব। তাঁর কাছে আমরা স্কুলের তরফে এই সমস্যার কথা জানিয়েছি। আশা করছি কাজটা হয়ে যাবে। এতগুলো মেয়ে স্কুলে পড়ে, ভালো, পরিচ্ছন্ন টয়লেট ওদের খুব দরকার। এছাড়াও একটা খেলার মাঠ খুব দরকার। এখন এসডিও অফিসের মাঠই অনুমতি সাপেক্ষে স্কুলের অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। এগুলো ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের স্কুলে সবই আছে।” বলেন শর্মিষ্ঠা আদক।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাত্রী প্রধান শিক্ষিকা সুচরিতা দাশের আবক্ষ মূর্তি
পূর্ব মেদিনীপুরের অন্যতম খ্যাতনামা এই স্কুল এখনও প্রথম প্রধান শিক্ষিকা সুচরিতা দাশের আদর্শকে সামনে রেখে ছাত্রীদের শিক্ষাব্রতী করে তুলছে। শিক্ষিকা থেকে ছাত্রী সবার একটাই লক্ষ্য, সুচরিতা দাশের দেখানো পথ থেকে কখনও যেন চ্যুত না হই। কেন না তিনি জীবনের সব কিছু ত্যাগ করে, পরিবার ছেড়ে, সংসার-যাপন না করে এই স্কুলটাকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে দিয়ে গেছেন।
___________________________________
তথ্যসূত্র : শর্মিষ্ঠা আদক, প্রধান শিক্ষিকা, রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
দেশ পত্রিকা
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
