রাজভবন এখন জনতারও, ভেঙে গেল ঔপনিবেশিক মানসিকতার বেড়াজাল

‘হেরিটেজ ওয়াক’-এর মাধ্যমে রাজভবন ঘুরে দেখতে পারবেন সাধারণ মানুষ

রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে রাজভবন কলকাতার দ্বার। এতদিন পর্যন্ত রাজভবন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল বিস্তর দূরত্ব। প্রবেশাধিকার নিষেধ ছিল আমজনতার। তবে সেই বেড়া ভেঙে যাচ্ছে এই পয়লা বৈশাখে। এবার বঙ্গ সফরে এসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেন বাঙালির ঐতিহ্যের কথা, সোনালি ইতিহাসের কথা। সেই সুবাদেই তিনি রাজ্য সরকারকে জানান, রাজভবনের দরজা যেন খুলে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের জন্য। হয়ে যাচ্ছে জন-রাজভবন।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে গেল রাজভবনের দ্বার। এতদিন সাধারণ মানুষ দূর থেকে দেখতেন এই ভবন। ধারে কাছে যাওয়ার অনুমতি মিলত না। একেবারে হাতে গোনা কিছু মানুষের অনুমতি মেলে এই রাজভবনে যাওয়ার। তবে এবার সেই কলোনিয়াল কালচারে পড়েছে ইতি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে প্রতীকী চাবি তুলে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। ফলত রাজভবন থেকে জন-রাজভবন হয়ে ওঠার পথে চলা শুরু করেছে বাংলার রাজভবন।

রাজভবনের সদর দরজা

একইভাবে কয়েকদিন আগে দেখা গিয়েছিল সেকেন্দ্রাবাদে রাষ্ট্রপতি নিলয় খুলে দেওয়া হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্য। এই প্রসঙ্গে খোদ রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস তাঁর ট্যুইটের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতিকে। সেকেন্দ্রাবাদের সেই ঘটনাতে অনুপ্রাণিত হয়েই এবার রাজভবনের দরজাও খুলে দেওয়া হল সাধারণ মানুষের জন্য। ঘটনাচক্রে এটিই দেশের প্রথম রাজভবন যা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হল। বঙ্গ সফরে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে, রাজ্যপালের কাছ থেকে প্রতীকী চাবি নিয়ে তা মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। সেকেন্দ্রাবাদের রাষ্ট্রপতি নিলয় খুলে দেওয়ার ঘটনা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার রাজভবন খুলে দেওয়া হল বলে মনে করা হচ্ছে। রাজভবন আর শুধু রাজ্যপালের নয়, জনগণেরও। ভাঙতে চলেছে ঔপনিবেশিক মানসিকতার বেড়াজাল।

পাখির চোখে রাজভবন

এবার রাজভবনে প্রবেশাধিকার পেতে চলেছে আমজনতা। রাজভবন সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে এই মর্মে একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে রাজভবনের তরফ থেকে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এবার থেকে রাজভবনের ভেতরটাও ঘুরে দেখতে পারবেন সাধারণ মানুষ। একে ‘হেরিটেজ ওয়াক’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫ জনের একটি দলকে নিয়ে একজন গাইড ঘুরিয়ে দেখাবেন রাজভবন। রাজভবনের তরফে জানানো হয়েছে তারা একটি অ্যাপ তৈরি করছে যার মাধ্যমে মানুষ অনলাইনেই টিকিট কাটতে পারবেন। টিকিট মূল্য রাখা হতে পারে ৫০ টাকা। 

একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫ জনের একটি দলকে নিয়ে একজন গাইড ঘুরিয়ে দেখাবেন রাজভবন। রাজভবনের তরফে জানানো হয়েছে তারা একটি অ্যাপ তৈরি করছে যার মাধ্যমে মানুষ অনলাইনেই টিকিট কাটতে পারবেন।

ইতিহাসবিদদের মতে এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজভবনের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন সাধারণ মানুষ। এই প্রসঙ্গে শিল্প ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্ত বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “আমাদের প্রত্যেকটা সরকারি এস্টাব্লিশমেন্ট ভারতীয় সংস্কৃতির বাহক। পার্লামেন্ট, রাষ্ট্রপতি ভবন, রাজভবন- প্রত্যেকটি। এগুলো মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হলে তা অত্যন্ত ভালো একটি সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল ভবন তো কেবলমাত্র কারোর বাসভবন নয়, এর মধ্যে রয়েছে এক বিশাল সংস্কৃতির ভাণ্ডার। সংস্কৃতি শিল্প নমুনার বিপুল সম্ভার রয়েছে এর মধ্যে। এর সম্বন্ধে জানা উচিৎ সাধারণ মানুষের। এছাড়াও রাজভবনের যে ইতিহাস তা সম্বন্ধেও মানুষের জানা উচিত। রাজভবন সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তরজার বাইরে গিয়ে অন্য দরজা খুলে দেবে এই সিদ্ধান্ত।” 

রাজভবনের ঐতিহাসিক কামান

রাজভবন খুলে দেওয়ার কারণে কি এক নতুন দর্শনীয় স্থান পেল বাঙালি? এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অধ্যাপক গুপ্ত বলেছেন, “ট্যুরিস্ট স্পট তো বটেই। এতদিন পর্যন্ত বন্ধ গেটের ওপার দিয়ে দেখা যেত, এখন সামনে থেকে ঘুরে দেখা যাবে। নিঃসন্দেহে পর্যটকরা আসবেন। তবে ট্যুরিস্টের কথা যদি ছেড়েও দিই, যারা স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের জন্যও খুব ভালো হলো। কলোনিয়াল সভ্যতার নিদর্শন রাজভবন। এর তোরণটা কেমন, কামানের ইতিহাস কী- এসব সম্বন্ধে গবেষণা করতে পারবেন গবেষকরা।”

যারা স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের জন্যও খুব ভালো হলো। কলোনিয়াল সভ্যতার নিদর্শন রাজভবন। এর তোরণটা কেমন, কামানের ইতিহাস কী- এসব সম্বন্ধে গবেষণা করতে পারবেন গবেষকরা।

লরাজভবনের আর্কাইভ যদি খুলে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের জন্য, তাহলে সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া যাবে। কত ঐতিহাসিক কেসের মীমাংসা হয়েছে রাজভবন থেকে। এগুলি সম্বন্ধে মানুষ জানবে। রাজভবনের আর্কাইভে কিন্তু এখন বেশ কিছু ঐতিহাসিক নথিপত্র রাখা রয়েছে যা ইতিহাসপ্রেমীদের নজর কাড়বে। বেলিয়াঘাটার হায়দার মঞ্জিলে গান্ধীজির অনশন নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। সেই লেখাটি সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। এছাড়াও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম গভর্নর চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারীর ডায়েরি, গান্ধীজিকে নিয়ে নির্মল বসুর কিছু লেখনী-সহ আরও অনেক অমূল্য নথিপত্র। 

রাজভবনের অন্দরসজ্জা

বর্তমানে আমরা যে রাজভবনটি দেখি, সেটি স্থাপিত হয় ১৭৯৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন দলিল দস্তাবেজ অনুযায়ী প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় করে তৈরি হয় এই লাট প্রাসাদ। যেহেতু লাটসাহেব বা গভর্নরের জন্য এই প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, তাই এর নাম স্থানীয়রা দিয়েছিলেন লাট প্রাসাদ। হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলকাতার সেকালের ও একালের’ বই থেকে জানা যায়, এই প্রাসাদটি যে জমির ওপর নির্মিত সেটি কিনতেই খরচ হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এছাড়াও প্রাসাদ সাজানোর জন্য সোফা, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, ঝাড়লণ্ঠন এবং অন্যান্য আসবাবপত্র এবং ঘর সাজানোর জিনিসপত্র কিনতে খরচ হয়েছিল আরও ৫০ হাজার টাকা।

চেষ্টা করা হয়েছিল এটির নির্মাণশৈলী এবং পরিবেশ যেন ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ারের ‘কেডেলস্টন হল’-এর মতো হয়। সেই হলের মতোই রাজভবনেরও উত্তরদিকে রয়েছে একটি সুদীর্ঘ সিঁড়ি, যার নাম ‘গ্র‍্যান্ড স্টেয়ার কেস’। মনে করা হয় এরকম সুদীর্ঘ সিঁড়ি গোটা কলকাতা শহরে আর একটাও নেই। এই সিঁড়ির ওপরেই রয়েছে লম্বা থামওয়ালা বারান্দা, যাকে বলে ‘পোর্টিকো’। রাজভবনটি এমনভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে যাতে সব সময় এর মধ্যে হাওয়া-বাতাস খেলা করে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা যেকোনো ঋতুতেই রাজভবনের ভেতরে অত্যন্ত আরামদায়ক পরিবেশ বিরাজ করে। এই পোর্টিকোর ওপর ভারত-সম্রাটের যে রাজচিহ্ন খোদাই করা আছে, তা নির্মাণ করেছিলেন খোদ লর্ড কার্জন।

রাজভবনের প্রথম তলায় তৈরি করা হয় ব্রেকফাস্ট রুম। আগেকার দিনে এই ঘরগুলিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হত। এছাড়াও রাজভবনের দোতলায় রয়েছে সুসজ্জিত বলরুম। রাজভবনের সম্মুখে, ওয়াই চ্যানেলের দিকে মুখ করে রয়েছে একটি কামান, যা কলকাতা শহরের ঐতিহ্য।

Post Tags
Developed by DXDasia