
বঞ্চনার শিকার, মেজিস্ট্রেটকে চটিয়ে ২০০ টাকা জরিমানাও হয়েছিল তাঁর
১
রমজান খান বললেন, ‘বাঙালি আপন দেশে বসে, এভারেস্টের গায়ে ফিতে না লাগিয়ে, চুড়োয় চড়তে গিয়ে খামকা জান না দিয়ে ইংরেজকে বাতলে দেয়নি, ওই দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়?’
আমি বললুক, ‘হাঁ, কিন্তু নাম হয়েছে ইংরেজের।’
আহমেদ আলি শুধালেন, ‘তাই বুঝি বাঙালি চটে গিয়ে ইংরেজকে বোমা মারে?’
আমি অনেকক্ষণ ধরে ঘাড় চুলকে বললুম, ‘সে-ও এক অতি সূক্ষ্ম কারণ বটে, তবে কিনা শিকদার এভারেস্ট সায়েবকে বোমা মারেননি।’
রমজান খান উষ্মা দেখিয়ে বললেন, ‘কিন্তু মারা উচিত ছিল।’
আমি বললুম, ‘হুঁ, কিন্তু একটু সামান্য টেকনিকল মুশকিল ছিল। নামকরণ যখন হয়, শিকদার তখন কলকাতায় আর মহামান্য স্যার জর্জ লন্ডনে পেনসন টানছেন। পাল্লাটা—’
পুরো পাঠান এবং নিমপাঠান একসঙ্গে হাঁ হাঁ করে উঠলেন। শুধালেন, ‘তার মানে? তবে কি ও লোকটার তদারকিতেও এভারেস্ট মাপা হয়নি?’
(সৈয়দ মুজতবা আলী, দেশে বিদেশে)
২
বিতর্কটা প্রথম উস্কে দিয়েছিল সিডনি জেরাল্ড বারার্ডের লেখা একটা বাক্য। ১৯০৪ সালের ‘নেচার’ পত্রিকায় ‘মাউন্ট এভারেস্ট: দ্য স্টোরি অব আ লং কনট্রোভার্সি’ নামে একটি নিবন্ধ লিখলেন বারার্ড। সেখানে তিনি জানালেন, ১৮৫২ সালে কলকাতার দপ্তর থেকে প্রধান গণক নাকি দেরাদুনে অবস্থানরত সার্ভেয়ার-জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াকে জানালেন, পিক নং XV ‘হ্যাড বিন ফাউন্ড টু বি হায়ার দ্যান এনি আদার হিদারটু মেজারড ইন দি ওয়ার্ল্ড’। কলকাতায় বসে থাকা ‘প্রধান গণক’ যে রাধানাথ শিকদার, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু, ‘হিস্টোরিক্যাল রেকর্ডস অব দ্য সার্ভে অব ইন্ডিয়া’-র পঞ্চম খণ্ডে (১৯৬৪) তো স্পষ্ট করে লেখা মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা গণনায় রাধানাথ জড়িত ছিলেন না। কারণ, এভারেস্টের উচ্চতা মাপার কাজ চলছিল দেরাদুনে আর রাধানাথ ততদিনে বদলি হয়ে চলে এসেছেন কলকাতায়। এ তো রীতিমতো পরস্পরবিরোধী কথা!
সিডনি জেরাল্ড বারার্ডের নিবন্ধটি বেরোনোর ঠিক আগের বছর শিবনাথ শাস্ত্রী ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বইতে রাধানাথের কথা লিখেছেন। কিন্তু এত বড়ো বঞ্চনার অভিযোগ আনেননি। সমকালীন অন্য কেউও এনেছেন বলে মনে পড়ছে না। এমনকি রাধানাথ নিজেও কিছু লিখে যাননি। অথচ বারার্ডের এই আপাত নিরীহ, ছোট্ট বাক্যটিই বিতর্কের ফুলকি তৈরি করল। ফুলকি থেকে দাবানল তৈরি হতেও সময় লাগল না। সেই আগুনের আঁচ এমনকি পৌঁছে গেল পাঠান মুলুকেও। যুক্তিটা সহজ, ফের একজন বাঙালি তথা নেটিভের সাফল্য খেয়ে নিয়েছে লালমুখো সাহেবরা। প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল, রাধানাথই এভারেস্টের আবিষ্কর্তা আর উচ্চতা নির্ণয়কারী।
কিন্তু, সত্যিই কি রাধানাথ এভারেস্ট আবিষ্কার করেছিলেন? কিংবা এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয় কি তাঁরই কৃতিত্ব? শৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয় বা জরিপ বিরাট কর্মযজ্ঞ। তা একা একা করাও যায় না। তার ওপর, এভারেটের উচ্চতা নির্ণয় আরোই কঠিন। তখন নেপাল-ব্রিটিশ শত্রুতা চরমে। অতএব, কাছে গিয়ে উচ্চতা মাপা অসম্ভব। দূর থেকে মাপতে গেলেও হাজার অসুবিধে। বাতাসের ঘনত্বের তারতম্য, পৃথিবীর বক্র ভূমিপৃষ্ঠ ইত্যাদিও মাথায় রাখতে হত মাপজোখের সময়। গণিত আর পদার্থবিদ্যায় অতুলনীয় পারদর্শী না হলে সেই নির্ভুল পরিমাপ সম্ভবই না। হিন্দু কলেজের ছাত্র রাধানাথ গণিত আর পদার্থবিদ্যায় সত্যিই অনন্য মেধার অধিকারী ছিলেন। পাননি। ‘গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিক্যাল সার্ভে’-তে তিনি যোগ দিয়েছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে। ব্যারোমিটারের ধাতব স্কেলের তাপজনিত প্রসারণ এবং পারদের নিজস্ব প্রসারণ-জনিত পরিমাপের ভুলত্রূটি বাতিল করার জন্য নিজস্ব সূত্র উদ্ভাবন করেছিলেন রাধানাথ। সেই সূত্র প্রকাশও পেয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটি অব জার্নালের একটি গবেষণাপত্রে। জর্জ এভারেস্ট থেকে অ্যান্ড্রু ওয়া তাঁর ওপর নির্ভর করতেন অনেকখানি। রাধানাথকে না দেখিয়ে কোনো বড়োমাপের গণনা গৃহীত হতও না।
অর্থাৎ, এভারেস্টের উচ্চতা গণনার কেন্দ্রেও নিশ্চিতভাবেই ছিলেন রাধানাথ। আশীষ লাহিড়ী ‘রাধানাথ শিকদার অ্যান্ড কলোনিয়াল সায়েন্স/ অ্যান ইন্ডিয়ান সার্ভেজ অ্যান আনচার্টেড টেরেন’ বইতে হাজারো তথ্য আর যুক্তি দিয়েছেন এই কথার স্বপক্ষে। কিন্তু রাধানাথই যে একার হাতে এভারেস্টের উচ্চতা মেপেছিলেন, এই তথ্যটিও অতি আরোপ। সেই মাপজোখ অবশ্যই সম্মিলিত উদ্যোগ ছিল, এবং যে উদ্যোগের মধ্যমণি ছিলেন রাধানাথ।
কিন্তু, তাঁকে এই সাফল্যের অংশীদার করা হল না কেন? সদুত্তর নেই। ‘ম্যানুয়াল অব সার্ভেয়িং ফর ইন্ডিয়া’-র তৃতীয় সংস্করণ থেকে রাধানাথের স্বীকৃতি লোপাট করে দেওয়া হল কেন, উত্তর নেই তারও। ঔপনিবেশিক প্রভুদের ঈর্ষা এর পিছনে ক্রিয়াশীল নিশ্চিতভাবেই। আরো কিছু ক্রিয়াশীল কি?
৩
বঞ্চনার প্রতিবাদ করে রাধানাথ বোমা মারতে শেখেননি। রমজান খান রাগ করলেও কিচ্ছুটি করার ছিল না। ঔপনিবেশিক বঞ্চনাকে গিলে নেওয়া বাঙালির দীর্ঘদিনের অভ্যেস। রাধানাথও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ছিলেন না। তবে, তাঁর জীবনকাহিনি জানলে অন্য ইঙ্গিতও চোখে পড়ে। তাঁর নিজের লেখাতেই রয়েছে শ্রেণী-বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ। হিন্দু কলেজে পড়াকালীন যে বৈষম্য তাড়িত করেছিল তাঁকে। তিনি দেখেছিলেন, “উচ্চশ্রেণিস্থ বালকেরা শিক্ষকের স্থলাভিষিক্ত হইয়া, বালকস্বভাবসুলভ অভিলাষ, অনভিজ্ঞতা, অথবা ক্রোধের বশবর্ত্তী হইয়া নিম্নশ্রেণিস্থ বালকগণকে নির্দয়রূপে প্রহার করিতেন; এবং প্রায় তাহারা কেহই তজ্জন্য শাস্তি পাইতেন না।” পরবর্তীকালে, এই বৈষম্য ও অন্যায়ের প্রতিবাদও করেছেন ‘তেজস্বী ও ন্যায়পরায়ণ’ রাধানাথ। যোগেশচন্দ্র বাগল জানিয়েছেন সেই ইতিহাস।
তখন কোম্পানির কর্মচারীরা গরিব মানুষদের ধরে ধরে বেগার খাটাতেন। এমনকি স্বয়ং মেজিস্ট্রেট সাহেবও একই দোষে দোষী। রাধানাথ তাঁর অধীনস্ত ভৃত্য ও কর্মচারীদের বলে দিলেন, কেউ যেন বেগার না খাটে। তাঁর তৎপরতায় মেজিস্ট্রেট সাহেবের কর্মে ‘ব্যাঘাত ঘটল’। এই অপরাধে রাধানাথের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল। সেই মামলায় ২০০ টাকা জরিমানাও হয়েছিল তাঁর। কুছ পরোয়া নেহি। তিনি তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই এইসব করছেন। সেই ‘অন্যায় প্রথা’ নিয়ে সত্যিই তোলপাড় পড়ে গেল চারপাশে। এরপর থেকে ‘নেটিভদের বেগার খাটানো’ অনেকটাই বন্ধ হল।
এই মানুষটাই ‘মাসিক পত্রিকা’-য় লেখালিখি করতেন সহজ, অনাড়ম্বর ‘স্ত্রীপাঠ্য’ গদ্যে। চাইতেন, তাঁর লেখা যেন সবাই বুঝতে পারেন। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “মাসিক পত্রিকাতে কোনও প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি স্বীয় পরিবারস্থ স্ত্রীলোকদিগকে পড়িয়া শুনাইতেন, তাঁহারা বুঝিতে পারেন কিনা।” শিবনাথ শাস্ত্রীর মতে, এ অনেকটা বাতিকে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু, এই চেষ্টার আড়ালে ছিল অন্য তাগিদ– লেখা হবে সর্বজনবোধ্য। রাধানাথ কিন্তু সত্যিই সব স্তরের মানুষের কথা ভাবতেন।
এমন মানুষই বঞ্চিত হলেন স্বীকৃতি থেকে। তবে, বাংলাদেশেরই অসংখ্য বিস্মৃত কৃতী মানুষদের মতো দুর্ভাগ্য তাঁর হয়নি। তাঁর স্বীকৃতি না পাওয়া নিয়ে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন একজন সাহেব। সেই বিতর্ককে জাপ্টে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি আদায়ে সরব হয়েছেন অনেকেই। লোকমুখে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, এভারেস্টের উচ্চতা মেপেছিলেন তিনিই। এই তথ্যেও যে ‘অতি আরোপ’ আছে, সেটাই আসলে বঞ্চিত জাতির প্রতিবাদ। বঞ্চনার উল্টোপিঠে অতি আরোপও যে স্বাভাবিক, তাই না?
