কলাপাতায় চিঠি লিখতেন সারদাসুন্দরী, সুযোগ পেলেই বসে পড়তেন বই নিয়ে

মাকে জড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের সব স্মৃতিই বালক বয়সের

রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতার সেই ছোট্ট ছেলেটাকে কে না ভালোবাসে! ভীতু, নরম, সুন্দর মাকে নিয়ে অনেক দূর পথে বেরিয়ে পড়েছে সেই ছেলেটা। ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করে মাকে অবাক করে দিয়েছে। আবার ‘নৌকাযাত্রা’ কবিতায় যে ছেলেটা বেরিয়ে পড়বে পথে, তার মাও ভীতু। মায়ের ভয় কাটাতে আশু আর শ্যামকে সঙ্গে নিতে হবে সেই ছড়ার খোকাকে। এখন এই যে ভয়কাতর মায়ের কনসেপ্ট, এটা গড়পরতা সব বাঙালি মায়ের সঙ্গেই মিলে যায়। তাই আমরাও এই কবিতার মায়েদের আড়াল থেকে ইচ্ছে হলেই খুঁজে নিতে পারি রবীন্দ্রনাথের মা সারদাসুন্দরীকে। আসলে মাকে জড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের সব স্মৃতিই বালক বয়সের। সারদাসুন্দরী যখন মারা যান, রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন তেরো বছর দশ মাস। মায়ের অসুখ, এইটুকুই জানতেন ছোট্ট রবি। কিন্তু মৃত্যু ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কাও তিনি করেননি। ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছিলেন, যে রাত্রে সারদাদেবীর মৃত্যু হয়, এক পুরাতন দাসী বিলাপ করে উঠেছিল, কিন্তু কাদম্বরীদেবী তাঁকে ঘরের বাইরে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ ভালো করে বুঝতে পারেননি কী হয়েছে! স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জেগে উঠে হঠাৎ বুকটা দমে গিয়েছিল। সকালে উঠে মায়ের সুসজ্জিত দেহ দেখে মৃত্যুর ভয়ঙ্কর কোনো রূপ তাঁর চোখে ধরা পড়েনি। বরং সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে রূপ দেখেছিলেন, তা সুখ-সুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। সারদাসুন্দরীর অসুস্থতার সময় দেবেন্দ্রনাথ বাইরে। সকলে ভেবেছিল, দুজনের দেখা বুঝি হবে না। কিন্তু  দেবেন্দ্রনাথ এসে পৌঁছলে তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় নিয়েই সারদাসুন্দরী অমৃতলোকে যাত্রা করেন। সারদাসুন্দরীর শয্যা চন্দন অভ্র দিয়ে সাজিয়ে দেবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ছয় বৎসরের সময় এনেছিলেম, আজ বিদায় দিলেম।’ তখন ১৮৭৫ সালের ১১ মার্চ। সারদাদেবীর বয়স মাত্র ৪৯। 

অতীত ইতিহাসের প্রাচীন পৃষ্ঠা উল্টে চলুন যাওয়া যাক ১৮৩৪ সালের মার্চ মাসে। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের বড়ো ছেলে দেবেন্দ্রনাথের জন্য সুন্দরী পাত্রী খোঁজা চলছে। এই খবর পেয়ে সারদাসুন্দরী নামের একটি ছয় বছরের বালিকার কাকা নাকি ভাইঝিকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে। তখন সারদাসুন্দরীর মা গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে মেয়ের বিচ্ছেদে কেঁদে কেঁদে তাঁর মৃত্যু হয়। যশোরের দক্ষিণডিহির রামনারায়ণ চৌধুরীর মেয়ে সারদা তথা শাকম্ভরীর জীবনের প্রথম পর্বের এই গল্পটি লিখেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। মেয়েটি অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন। যশোর থেকে ঠাকুরবাড়িতে পুত্রবধূ আসলেই নাকি তিনি আদরমাখানো কণ্ঠে বলতেন , ‘বেশ হয়েছে আমাদের বাড়িতে যশোরের মেয়ে এল।’ ছয়বছরের স্মৃতি না থাকলেও নিজের শিকড় তো মেয়েদের সবসময় মনে মনে ডাক পাঠায়। 

সারদাদেবী যখন ঠাকুরবাড়িতে আসেন, তখন দ্বারকানাথের ধন ঐশ্বর্য সকলের কাছে ঈর্ষার বস্তু। কলসীতে করে টাকা আসত ঠাকুরবাড়িতে। মেয়েদের অবস্থা কিন্তু হতাশাজনকই ছিল।  অনাত্মীয় পুরুষ অন্দরমহলে প্রবেশ করতে পারতেন না। মেয়েরা বাইরে বেরোতেন টকটকে লাল, হলুদ পাড়ের পালকির ঘেরাটোপে। 

সারদাসুন্দরী রত্নগর্ভা। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, তাঁর প্রায় প্রতিটি সন্তান ঠাকুরবাড়ির গর্ব। কিন্তু তিনি সহজ, সরল গৃহবধূই ছিলেন। তাঁর এবং তাঁর জা যোগমায়াদেবীর জন্য মাইনে করা বৈষ্ণবী রাখা হয়েছিল। রামায়ণ, মহাভারত, চাণক্যশ্লোক, কলাপাতায় চিঠি লেখা— সেসব করতেন সারদাসুন্দরী। শোনা যায়, সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসে যেতেন। কোনো বই না পেলে অভিধানই পড়তেন। থিয়েটার দেখতেও পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁর জীবনের কক্ষপথ ছিল স্বামীকেন্দ্রিক। অলকাসুন্দরী দেবী এবং দ্বিগম্বরী দেবীর কাছ থেকে দেব দ্বিজে ভক্তিও শিখেছিলেন সারদাসুন্দরী। অথচ দেবেন্দ্রনাথ তখনকার দিনে মূর্তিমান বিদ্রোহ। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ভেঙে বেরিয়ে এসে ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে তাঁর নির্দেশেই বন্ধ হল প্রতিমা পুজো। দেববিগ্রহ নিয়ে পৃথক হয়ে গেলেন গিরীন্দ্রনাথের বিধবা পত্নী  যোগমায়া দেবী। সারদাদেবীর বড়ো কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। দেবেন্দ্রনাথ নিজের কর্মের পথে পরিবারকে আসতে দেননি কখনও। অথচ, তাঁর স্ত্রী চরম একাকিত্বে শুধু তাঁকেই ভেবেছেন। প্রথম জীবনে ভরা শ্রাবণ মাসে দেবেন্দ্রনাথ বেরিয়ে পড়বেন দেশভ্রমণে। অনেক নিষেধের পর সারদাসুন্দরী আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন তাঁকেও সঙ্গে নিতে। স্বামীর নির্দেশ মেনে উৎসব মুখর দিনগুলি কাটাতেন একলা চিকের আড়ালে, ইচ্ছে থাকলেও উৎসবে যোগ দিতেন না। দেবেন্দ্রনাথ তো তখন মহর্ষি। বছরের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর কাটত জোড়াসাঁকো থেকে দূরে। সারদাসুন্দরীর কিন্তু আর কখনও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেশভ্রমণে যাওয়া হয়নি। জোড়াসাঁকোতে ফিরেও দেবেন্দ্রনাথ তেতলার ঘরে নিজের মতো করেই থাকতেন। সাধারণত সারদাসুন্দরী বালুচরি শাড়ি পরে তক্তপোশে বসে সকলকে নির্দেশ দিতেন। কিন্তু বহুদিন পর পর যখন দেবেন্দ্রনাথ আসতেন, তখন সারদাসুন্দরীর দিনলিপি বদলে যেত। হালকা সুতির শাড়ি পরে, গায়ে একটু আতর দিয়ে সকলে শুয়ে পড়লে দেবেন্দ্রনাথের কাছে যেতেন। সেই সব দিনে নিজে রান্নাঘরে গিয়ে মহর্ষির পছন্দের রান্না করাতেন। আবাল্য প্রতিমা পুজো করে আসা সারদাসুন্দরী স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করেননি। কিন্তু গোপনে স্বামীর মঙ্গলকামনায় মন্দিরে পুজো পাঠাতেন। গণৎকারেরা তাঁকে ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন করেছেন, এমন কথাও জানা যায় ঠাকুরবাড়ির পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিচারণ থেকে। সংসার করেছেন খুব মন দিয়ে। রাশি রাশি পান সাজা থেকে শুরু করে কোন ছেলে, ছেলের বৌয়ের গায়ের রং চাপা— সবদিকেই নজর ছিল তাঁর। দ্বিজেন্দ্রনাথের জন্য বিরাট পালঙ্ক বানিয়েছিলেন শখ করে। ইচ্ছে ছিল কাঠের শুকপাখি থাকবে সেই পালঙ্কে। এমনি কল্পনাপ্রবণ ছিলেন কবির মা। ঠাকুরবাড়ির সকলেই তাঁর স্নেহের স্পর্শ পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে মাকে রামায়ণ মহাভারত পড়ে শোনাতেন। ভৃত্যমহলে বড়ো হলেও মায়ের সান্নিধ্য থেকে একেবারে বঞ্চিত ছিলেন না তাঁরা। কিশোরবেলায় যে ছেলেটির মা হারিয়ে গিয়েছিল, তাঁর সাহিত্যের অনেক চরিত্রই মাতৃহারা, একলা অথবা কোনো কারণে মায়ের থেকে দূরে থাকে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভীতু মায়েদের মতন সারদাসুন্দরীও কখনও সিপাহী বিদ্রোহের কারণে আবার কখনও রাশিয়ান দ্বারা ভারত আক্রমণের ভয়ে ত্রস্ত থাকতেন। রবীন্দ্রনাথকে সারদাসুন্দরীদেবী রাশিয়ানদের খবর দিয়ে একটি চিঠি দেবেন্দ্রনাথকে লিখতে বলেছিলেন। 

১৯০৮ সালে এক শীতের রাতে মাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বপ্নে তিনি সেই ছোটো!স্বপ্নেই প্রণাম করেছেন মাকে। একবার প্ল্যানচেটে মাকে আহ্বান করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মায়ের বদলে নাকি মায়ের বান্ধবী চলে এসেছিলেন প্ল্যানচেটে। মায়ের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন  টান রবীন্দ্রনাথের ছিল।

একটি ছয় বছরের মাতৃহারা মেয়ের গল্প সময় সেইভাবে গুরুত্ব দেয় নি। আসলে ঠাকুরবাড়ির উজ্জ্বল নক্ষত্রদের ভিড়ে এই স্নিগ্ধ আলোর কাহিনি কেই বা মনে রেখেছে? সারদাসুন্দরী দেবী শুধু রবি ঠাকুরের মা নন, উনিশ শতকের মেয়েদের সহিষ্ণুতা এবং সহজ মনের প্রতীক । বিখ্যাত স্বামী পুত্রও তাঁর কথা সেইভাবে প্রচার করেননি কোনোদিন।

গ্রন্থঋণঃ
রবিঠাকুরের মা, প্রণবকান্তি মুখোপাধ্যায়
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির সাতকাহন, শান্তা শ্রীমানী ইত্যাদি।

Developed by DXDasia