
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিপটে কীভাবে আঁকা হয়েছিল তাঁর শিক্ষকদের ছবি?
লেখিকা মহুয়া দাশগুপ্তের কণ্ঠেও শুনে নিতে পারেন এই লেখা
তখন তাঁর কাঁচা বয়স। পাখির মতো হালকা দেহখানা যেন চাইলেই উড়ে যেতে পারত। শুধু ডানা ছিল না। ফেরিওয়ালা ডাকা দিনরাত্রি তখন ভরাট হয়ে থাকত বেহালার সুরে। কিশোরী চাটুজ্যে এসে শুনিয়ে যেতেন লবকুশের ছড়া। ছেলেটি ভাবতেন, যদি কোনো ছলে ভরতি হওয়া যেত পাঁচালির দলে, গান শুনিয়ে বেশ চলে যেতেন নতুন নতুন গাঁয়ে। তেপান্তরে পথহারা রাজপুত্রের মতো ঘরছাড়া মনের এক ছেলের লেখাপড়ার গল্প? সেও এক রূপকথা!
কৈলাশ মুখুজ্যের মনোরঞ্জক ছড়া শুনে তাঁর ছন্দে দোলায়িত মন একদিন স্কুলে যেতে চাইল। উচ্চস্বরে কেঁদে নিজের স্কুলে যাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাইছিলেন শিশু রবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! কান্নার জোরেই ভর্তি হলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। তারপর শুরু হল জীবনের এক অধ্যায়। স্কুল সম্পর্কে তাঁর যে স্মৃতির কথা জানা যায়, তা খুব একটা সুখকর ছিল না। সেইসময়কার স্মৃতিচারণার কথা বলেছেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশুনার জাঁতাকল চলতে থাকার রূপকল্পে। ঘর্ঘর শব্দে চলতে থাকা এই কলে দম দেওয়ার কাজ নাকি ছিল হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। মজা করে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘তম্বুরার তারে অত্যন্ত বেশি টান দিতে গেলে পটাং করে যায় ছিঁড়ে। তিনি আমাদের মনে যতটা মাল বোঝাই করতে চেয়েছিলেন তার অনেকটাই ডিঙি উলটিয়ে তলিয়ে গেছে একথা এখন আর লুকিয়ে রাখা চলবে না।’ সময় গড়িয়ে গেছে নিজের নিয়মে। সেদিনের মুখচোরা ছেলেটি বিশ্বজোড়া কবিখ্যাতি পেয়েছেন, সে গল্প আলাদা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিপটে যেভাবে আঁকা হয়েছিল, তাঁর শিক্ষকদের ছবি, তাঁর লেখাপড়ার চর্চা — আজ সেই কথকতাই করি।
নর্মাল স্কুলের হরনাথ পণ্ডিত এসে দাঁড়াবেন স্মৃতির বারান্দায়। যাঁর কুৎসিত ভাষার প্রয়োগের কারণে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ নিরুত্তর থাকতেন। বাংলায় বেশি নম্বর পেয়েছিলেন, সেই ‘অপরাধ’-এ হরনাথ পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথের আরেকবার পরীক্ষা নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেখানেও সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। নর্মাল স্কুলেরই নীলকমল ঘোষালের কথা ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায় প্রাণ পেয়েছে। সম্ভবত তাঁর শাসন তর্জনের কথা মনে করেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘মনুষ্যজন্মধারী ছিপছিপে বেত’ হিসাবে মনে রেখেছেন। সকাল ছটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত নীলকমল মাস্টারের কাছেই পড়তেন রবীন্দ্রনাথ। ইংরেজির গৃহশিক্ষক হিসেবে প্রথম নিযুক্ত হয়েছিলেন রাখালদাস দত্ত। অল্পদিন পড়িয়েই তিনি চলে যান। তারপর আসেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়। ছাত্রদের চোখ রগরানি, হাই এবং ঘুমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত তাঁর ফার্স্ট বুক পড়ানো। আপ্রাণ চেষ্টা করেও পাঠ্য বিষয়কে রবি ঠাকুরের কাছে আকর্ষক করে তুলতে পারেননি তিনি। তার উপর মেডিকেল কলেজের এই ছাত্র কাগজের মোড়কে করে মানুষের কণ্ঠনালি আনা বা ছাত্রদের শব ব্যবচ্ছেদের ঘরে নিয়ে গিয়ে হাজির করার মতো ভয়াবহ কাজ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ‘মানুষকে এমন টুকরা করিয়া দেখা এমন ভয়ঙ্কর, এমন অসংগত যে, মেঝের উপর পড়িয়া থাকা একটি কৃষ্ণবর্ণ অর্থহীন পায়ের কথা আমি অনেকদিন ভুলিতে পারি নাই। রবীন্দ্রনাথের সীতানাথ মাস্টারের নস্টালজিয়ায় আসে বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। সাতকড়ি দত্ত, গোবিন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের স্কুল জীবনের স্মৃতির অ্যালবামে ছিলেন। যে শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করে মনে রেখেছিলেন, তিনি হলেন ফাদার ডি পেনেরান্ডা। অনেক নিষ্করুণ শিক্ষকদের ভিড়ে এই স্নেহময় শিক্ষক এক পড়াবিমুখ, বিব্রত বালককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ট্যাগোর, তোমার কি শরীর ভালো নাই?' — এই শব্দকটি মায়া হয়ে জড়িয়েছিল রবি ঠাকুরের মনে। ফাদার হেনরির কথাও বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লন্ডনে থাকাকালীন আরেক ল্যাটিন শিক্ষকের কাছে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কথাও মনে করেছিলেন। হেরম্ব তর্করত্ন, হরিনাথ ভট্টাচার্য, রামসর্বস্ব বিদ্যাভূষণ ইত্যাদি পণ্ডিতদের কাছেও শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রামসর্বস্ব বিদ্যাভূষণ রবীন্দ্রনাথকে ব্যাকরণ শেখাবার চেষ্টা দূরূহ মনে করে শকুন্তলা পড়িয়েছিলেন। তাঁর সম্পাদিত ‘প্রতিবিম্ব’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘প্রকৃতির খেদ’ প্রকাশিত হয়। জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে রবিঠাকুর ‘কুমারসম্ভব’, ‘ম্যাকবেথ’ ইত্যাদির ব্যাখ্যা পড়েছিলেন। বিলেতে থাকাকালীন হেনরি মর্লির কাছে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এ তাঁর এক শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। হেনরি মর্লি তাঁর প্রবন্ধের প্রশংসা করেছিলেন যেদিন, সেদিন রবীন্দ্রনাথ ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বন্ধু লোকেন পালিতের কাছে শুনেছিলেন তাঁর প্রবন্ধের বিষয়ে হেনরি মর্লির মতামত। এক ল্যাটিন ও গ্রিক পণ্ডিত মিস্টার বার্কারও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের কাছ থেকেও জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। লেখাপড়া ছাড়া তাঁর আঁকা শেখার, সংগীত শেখার এবং জিমনাস্টিকের শিক্ষকের কথাও জানা যায়। পালোয়ান হীরা সিং-এর কাছে মাটি মেখে কুস্তি করা বা বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর কাছে গান শেখার কথা আমরা জানি। যদুনাথ ভট্টাচার্য নামে বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পীর কাছে গান শিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শ্রীকণ্ঠবাবু তো ছিলেনই।
প্রথাগত বিদ্যাচর্চা ভালো না লাগলেও বিদ্যাচর্চার সাবলীল ধারার মধ্যেই ছিলেন রবি ঠাকুর। উনিশ শতকের জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি বাঙালির সংস্কৃতিচর্চার পথনির্দেশক স্তম্ভের মতো ছিল। ফলে উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে বহুপাঠের সহজ এবং সাবলীল ধারাটি ছিল ঠাকুরবাড়ির মজ্জাগত বিষয়। রবীন্দ্রনাথও সেই পরিবারের ধারা মেনেই গ্রন্থকীট ছিলেন। ১৮৬৪ সালে ছিল রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাচর্চার সূচনা পর্ব! মাধবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে প্রথম শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাচর্চার। তারও আগে ভৃত্যদের গুরুমশাইগিরির মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়ে গিয়েছে রামায়ণ, মহাভাতের সঙ্গে। সেই সময় ‘সচিত্র শিশুবোধক’ পড়েছিলেন তিনি। ১৮৬৬ সালে রবীন্দ্রনাথের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল হরিনাথ শর্মার রচনাবলী, নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘জ্ঞানাঙ্কুর’, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদিত ‘সদ্ভাবশতক’! এছাড়াও স্বল্প লেখাপড়া জানা কোনোবিশেষ ভৃত্য তাদের মাদুরপাতা আসরে, রেড়ির তেলের ভাঙা সেজের চারিদিকে ঠাকুরবাড়ির শিশুসদস্যদের বসিয়ে রামায়ণ, মহাভারত পড়ে শোনাতো। মা সারদাদেবীর কাছেও রামায়ণের গল্প শুনতেন শিশু রবি। মায়ের সখী শুভঙ্করী দেবীর মার্বেল কাগজ মণ্ডিত কোণ ছেঁড়া, মলাটওয়ালা বইটা কোলে নিয়ে পৌরাণিক, মহাকব্যিক বিষাদ ভর করতো শিশু রবির মনে! বৈদিক সাহিত্য, উপনিষদ —সব পাঠ্য ছিল। পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব বিশুদ্ধ উচ্চারণে ‘ব্রাহ্ম ধর্মগ্রন্থ থেকে উপনিষদের শ্লোক ব্যাখ্যা করে আবৃত্তি করতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত দল ‘সঞ্জীবনী সভা’র সদস্য হিসেবে বেদ ছিলো অবশ্যপাঠ্য।
বেদ পুরাণের চর্চার সঙ্গে উনিশ শতকের সদ্য প্রকাশিত রচনাগুলিও নিবিষ্ট মনে পাঠ করতেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তাঁর ছেলেবেলায় বাংলাসাহিত্যের কলেবর কৃশ ছিল। তাই পাঠ্য অপাঠ্য সব বই-ই তিনি পড়েছিলেন। এই সূত্রে বলা যায়— মেঘনাদবধ কাব্য, বিবিধার্থসংগ্রহ, আরব্য উপন্যাস , পারস্য উপন্যাস , রবিনসন ক্রুশো, সুশীলার উপাখ্যান , রাজা প্রতাপাদিত্য রায়ের জীবনচরিত, বেতাল পঞ্চবিংশতি প্রভৃতি তখনকার সময়ের বইগুলি তিনি আন্তরিকভাবে পড়ে ফেলেছিলেন। ‘অবোধবন্ধু’ পত্রিকাটিও রবীন্দ্রনাথ আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন। পাঠ্যতালিকায় ছিল বঙ্গদর্শন-ও। তখন বৈষ্ণবীরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বই দিতে আসত। পত্রিকা, যত কিছু নতুন বই ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের লাইব্রেরির কলেবর বাড়িয়ে যেতো। তত্ত্বকথার সঙ্গে মানভঞ্জন, প্রভাস মিলন, দূতীসংবাদ, কোকিলদূত, রুক্মিনীহরণ ইত্যাদি এই জাতীয় বইও নির্দ্বিধায় পড়ে ফেলতেন রবীন্দ্রনাথ। কিশোর বয়সে অক্ষয় চৌধুরীর প্রভাবে মঙ্গলকাব্য, রামপ্রসাদের শাক্তপদ, কবিওয়ালাদের কবির লড়াই, বৈষ্ণব পদাবলী সব পড়েছেন তার সঙ্গে চলেছে সমকালীন সাহিত্যিকদের সাহিত্যপাঠ। আজীবন এই পড়ুয়া রবীন্দ্রনাথ পড়ার অবসর খুঁজে নিতেন। তাছাড়া বিশ্বজোড়া পাঠশালা তো ছিলই। প্রতিটি বিদেশভ্রমণ নতুন নতুন শিক্ষা নিয়ে এসেছে রবীন্দ্রজীবনে।
অথচ রবীন্দ্রনাথ কোনোদিন ‘পণ্ডিত’ হতে চাননি। মাটির কাছাকাছি এক মর্ত্যের কবি হয়ে যেন লুকানো বাঁশিতে দিয়েছেন সুর আর তিনটি ভুবন মন্ত্রমুগ্ধের মতো আছড়ে পড়েছে একদা স্কুলপালানো ছেলেটির পায়ে।
সহায়ক গ্রন্থঃ
জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছেলেবেলা , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ-ছাত্র ও শিক্ষকের প্রবন্ধের আলোয়, পিনাকেশ সরকার, কোরক সাহিত্য পত্রিকা।

